বালুর বাহন জলের দানব

সপরিবারে গত শনিবার পদ্মায় ঘুরতে বেরিয়েছিলেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার লতাব্দী ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত মানুষ। ঘোরাফেরা শেষে ফিরছিলেন তারা। রাত ৮টার দিকে তাদের নিয়ে ট্রলারটি যখন বালিগাঁওয়ের ডহরী খালে ঢুকছিল তখন হঠাৎ বেপরোয়া গতির বালুবাহী বাল্কহেড এসে ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ট্রলারটি ডুবে যায়। কেউ কেউ সাঁতরে পার হতে পারলেও আটজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে একজন নারী, চারজন শিশু ও তিনজন যুবক।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের পর সিরাজদীখান উপজেলার লতাব্দী ইউনিয়নের নারী-শিশুসহ কিছু ব্যক্তি ট্রলারে করে পদ্মা নদীতে পিকনিকে যান। পিকনিক শেষে ট্রলারটি তালতলা-গৌরগঞ্জ খাল দিয়ে লতাব্দীর দিকে যাচ্ছিল। রাত ৮টার দিকে ট্রলারটি লৌহজংয়ের রসকাঠি এলাকায় পৌঁছলে একটি বাল্কহেড ধাক্কা দিলে ট্রলারটি পানিতে তলিয়ে যায়।

ডুবে যাওয়া ট্রলারের উদ্ধার পাওয়া এক যাত্রী বলেন, ‘আমরা ৪৬ জন পদ্মায় ঘুরতে যাই। ঘোরাফেরা করে বালিগাঁওয়ের ডহরী খাল দিয়ে রাত ৮টার দিকে বাসায় যাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ বেপরোয়া গতির বালুবাহী বাল্কহেড ট্রলারে ধাক্কা দেয়। ট্রলারটি ডুবে যায়। আমরা কেউ কেউ অনেকে সাঁতরে পাড়ে চলে যাই। তবে বেশ কয়েকজন এখনো নিখোঁজ রয়েছে।’

গত মাসে ঢাকার সদরঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতে বালুবোঝাই বাল্কহেডের ধাক্কায় অর্ধশতাধিক যাত্রীসহ একটি ওয়াটার বাস ডুবে যায়। ওই ঘটনায় তিনজন মারা যায়। ওয়াটার বাসটি সদরঘাটের শ্যামবাজার ঘাট থেকে তেলঘাটে যাচ্ছিল।

একসময়ের নিরাপদ রুট নৌপথ ইদানীং অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। একের পর মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কপথের মতো নৌপথেও মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। নৌপথে বাল্কহেডের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি ঘটছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বরাত দিয়ে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি জানায়, দেশে নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা ১৫ হাজার হলেও সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের অন্তত ৮৫ হাজার নৌযান রয়েছে। অর্থাৎ ৭০ হাজার নৌযানই অবৈধ। এর মধ্যে অন্তত ছয় হাজার বাল্কহেড।

সংগঠনটির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ৫৪টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছে ৫৭ জন। আহত ৫০ জন। নিখোঁজ ৩৪ জন। নিহতদের ৭০ শতাংশই বাল্কহেড-দুর্ঘটনার কারণে হয়েছে।

কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাল্কহেডগুলো অবাধে রাতে চলাচল করে। বিআইডব্লিউটিএ বা সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’

বালুবোঝাই বাল্কহেডের বেশিরভাগ অংশ পানির নিচে থাকে। রাতে চলাচল-নিষিদ্ধ এ নৌযানে আলোও থাকে না। ফলে নৌকা, লঞ্চ প্রভৃতির চালকরা বাল্কহেডকে সহজে দেখতে পায় না। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করেন নৌপরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সূত্র জানায়, দেশে ১১ হাজারেরও বেশি বাল্কহেড জাহাজ রয়েছে। অনুমোদন আছে প্রায় ছয় হাজারের। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে রাতে বাল্কহেডের চলাচল নিষিদ্ধ করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কিন্তু বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ প্রভৃতি নদনদীতে বেপরোয়াভাবে চলছে এ নৌযান।

অভিযোগ রয়েছে, নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর এবং নৌ-পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রভাবশালীরা চালাচ্ছে অবৈধ এসব নৌযান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসন জানে বাল্কহেড জাহাজ রাতে চলাচল করে। বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে এগুলো চালান মালিকরা। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘাটে তাদের চাঁদা দিতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘একটা বাল্কহেড জাহাজের যখন অনুমোদন দেওয়া হয় তখন নৌপরিবহনের সার্ভেয়ারদের জাহাজে উপস্থিত থেকে যাচাই করে অনুমোদন দেওয়ার কথা। কিন্তু তা প্রায় হয়ই না। অফিসে বসেই বড় অঙ্কের টাকা বিনিময়ে সার্ভে সনদ দেওয়া। জাহাজের ডিজাইন কী, জাহাজে লজিস্টিক ইকুইপমেন্ট আছে কি না, কে চালাচ্ছেÑ কিছুই খতিয়ে দেখা হয় না। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে।’

দেশের বেশিরভাগ নৌপথ অরক্ষিত। বিশেষ করে ঢাকার বুড়িগঙ্গা থেকে মেঘনা নদীর বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার কালীগঞ্জ পয়েন্ট পর্যন্ত নৌপথ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। মুন্সীগঞ্জ মোড় থেকে মোহনপুর পর্যন্ত দিনে-রাতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল করায় লঞ্চচালকরা বেশ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

এসব নৌরুটে দিকনির্দেশক বাতি ও বয়া নেই। নৌপথে শৃঙ্খলা রাখতে যে পরিমাণ নৌ-পুলিশ থাকা দরকার তা নেই। নৌ-পুলিশকে দৈনন্দিন কাজের জন্য কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেওয়া হলেও তা দিয়ে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

বড় নৌ-দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি হয়। সব তদন্ত কমিটিই দুর্ঘটনা রোধে গুচ্ছ গুচ্ছ সুপারিশ করে। কিন্তু এসব সুপারিশ কার্যকর করা হয় না। দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির নজির বিরল।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক ড. এনএম গোলাম জাকারিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীতে চলা নিবন্ধিত বাল্কহেডের চেয়ে অনিবন্ধিত বাল্কহেডের সংখ্যাই বেশি। এসব নৌযানের নকশা কোনোভাবেই নৌপথে চলাচলের উপযোগী নয়। যারা এসব নদীতে নামায় তারা নিজেদের মতো একটা কাঠামো তৈরি করে নামায়। একটা শিপের মিনিমাম যে নকশা থাকা দরকার, তার কিছুই নেই বাল্কহেডগুলোতে। কর্তৃপক্ষ কীভাবে এগুলোর অনুমোদন দেয়! এসব একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে। না হলে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাল্কহেডের ডিজাইন অবশ্যই আমাদের বিশেষজ্ঞদের অনুমোদিত। না হলে তো এগুলো নদীতে চলাচল করতে পারত না। তবে অনেকেই অনুমোদন নিয়ে আকার-আকৃতি পরিবর্তন করে থাকে। সেটা আমাদের অগোচরে। লোকবল কম থাকায় সঠিকভাবে আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি না।’

তিনি বলেন, ‘বাল্কহেড রাতে চালানো নিষিদ্ধ। অনেকেই আইন অমান্য করে। প্রতিদিনই আমাদের অভিযান হয়। মামলাও হয়। বর্ষায় নদনদীতে পানি বেড়ে যায়। তখন এরা ফাঁকফোকর দিয়ে চালায়। তখন দুর্ঘটনা বাড়ে। অবৈধ নৌযানের বিরুদ্ধে বড় অভিযান চালাতে চাই কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের পর্যাপ্ত লোকবল নেই।’