বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে ফের শপথ পাঠ করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা সব প্রকার সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থানকে সম্মিলিতভাবে রুখে দেওয়ারও শপথ নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার সামনে শিক্ষার্থীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গতকাল মঙ্গলবার এ শপথ পাঠ করেন। একইসঙ্গে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যায় আজীবন বহিষ্কৃত (উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পেয়েছে) আশিকুল ইসলাম বিটুর সঙ্গে ক্লাস-ক্যাম্পাস শেয়ার না করার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস (ইইই) বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী তাসমিয়া তাসমিন শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন। শপথে বলা হয়, ‘আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, আজ এই মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কল্যাণ ও নিরাপত্তার নিমিত্তে আমার ওপর অর্পিত ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক নৈতিক ও মানবিক সব প্রকার দায়িত্ব সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় আমার জ্ঞাতসারে হওয়া প্রত্যেক অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমি সর্বদা সোচ্চার থাকব।’
শপথে আরও বলা হয়, ‘আমি আরও প্রতিজ্ঞা করছি যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রকার সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থানকে আমরা সম্মিলিতভাবে রুখে দেব। নৈতিকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সব ধরনের বৈষম্যমূলক অপসংস্কৃতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার আমরা সমূলে উৎপাটিত করব। এই আঙিনায় যেন আর কোনো নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে না যায়। আর কোনো নিরুপরাধ যেন অত্যাচারের শিকার না হয় তা আমরা সবাই মিলে নিশ্চিত করব।’
শপথগ্রহণ শেষে শিক্ষার্থীরা বলেন, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির চরমতম রূপ বারবার আঘাত হেনেছে আমাদের বুয়েট ক্যাম্পাসে। ২০০২ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতির অন্ধকার অধ্যায় তার ভয়ংকর দাগ রেখে গেছে আমাদের এই ক্যাম্পাসে। কালের পরিক্রমায় নিজেরা আন্দোলন করে দাবি আদায় নিশ্চিত করে সব বাধা ডিঙিয়ে সব শিক্ষার্থী একতাবদ্ধ হয়ে যখন সুস্থ সুন্দর একটি পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করেছে, তখনই আবারও বুয়েট শিক্ষার্থীদের নিরপেক্ষ মনোভাবকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে অপপ্রচার চালাচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল।
তারা আরও বলেন, যেকোনো ছাত্ররাজনীতি এবং মৌলবাদ চর্চা বুয়েট ক্যাম্পাসে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। তা সে যে দলেরই হোক না কেন। এছাড়া সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়ে নাশকতার পরিকল্পনাকারী সন্দেহে বুয়েটের ২৪ জন শিক্ষার্থী আটকের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখে একটি সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার আশা করেন তারা।
বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী আশিকুল ইসলাম বিটুর ক্লাসে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তারা বলেন, গতকালের অবস্থান কর্মসূচিতে আমরা আবরার ফাহাদ হত্যার তদন্তে অসহযোগ এবং অন্যান্য র্যাগিং ঘটনার ইস্যুতে বুয়েটের আজীবন বহিষ্কৃত ছাত্র আশিকুল ইসলাম বিটুর ক্লাসে ফেরার বিপরীতে আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। এ রকম কুখ্যাত একজন এর সঙ্গে ক্লাস এবং ক্যাম্পাস শেয়ার করতে আমরা কোনোভাবেই রাজি নই এবং কর্তৃপক্ষকে আজকে এ বিষয়ে অবগত করা হয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ না আসলে আমরা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম এ অংশগ্রহণ না করার মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দ্বিধা করব না।
২০১৯ সালে আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ভয়ংকরতম অধ্যায়ের সাক্ষী হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এরপরই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েটে সব প্রকার সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পায় দুজন বুয়েট শিক্ষার্থী এবং সুনামগঞ্জে আটক শিক্ষার্থীদেরও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এরপর বুয়েটে ফের ছাত্ররাজনীতি ফেরানোর অপচেষ্টার অভিযোগ আনেন শিক্ষার্থীরা। যার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে ফের শপথ পাঠ করেন শিক্ষার্থীরা।