যুগোপযোগী সাইবার আইন

কোনো রাষ্ট্রে অবাধ তথ্য প্রকাশ-প্রচারের অধিকার তখনই থাকে, যখন সচেতন এবং শিক্ষিত মানুষ নিজেকে সংযত এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। পাশাপাশি সেই মানুষ যথেষ্ট মেধা রাখেন, কোন বিষয়টি সমষ্টিগতভাবে ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেতে পারে। ফলে প্রচারমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সেই ব্যক্তি, সংবাদটি প্রচার-প্রকাশে সেল্ফ সেন্সর করতে পারেন। এই সেন্সরের বিষয়টি মেধা এবং যোগ্যতার বিষয়। একই সঙ্গে এটি দ্রবীভূত হয়, নিজস্ব চেতনা এবং পারিপাশির্^কতার সঙ্গে। ফলে প্রকাশিত সংবাদটি হয়ে ওঠে সর্বজনীন। সেখানে থাকে না কোনো ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক আক্রোশ। সংবাদমাধ্যমকে কখনোই উন্নত দেশে অন্যায়-অত্যাচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। যে কারণে দেখা যায়, পৃথিবীর অনেক দেশে গণমাধ্যমকে উন্মুক্ত স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের নির্বাহীরা জানেন, সেই দেশের সংবাদমাধ্যম ব্যক্তির আদর্শগত বা সম্পাদকীয় নীতিমালার বাইরের কোনো বিষয় প্রচার বা প্রকাশ করবেন না। ইউরোপ বা আমেরিকার প্রচারমাধ্যমের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব, তারা কী ধরনের সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার করছেন। এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে তো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের পক্ষেও যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। আমাদের সেই সমস্ত যুক্তি প্রচার বা প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হোক। অথবা যেহেতু অবাধ সংবাদ প্রচারের সুযোগ রয়েছে, সেহেতু হিটলারের নাৎসি বাহিনীর জয়গান করে কেন আমরা লিখতে পারব না? প্রশ্নটা এখানেই। ভারতে অনেকেই বলতে পারেন, নাথুরাম গডস ইচ্ছে করে মাহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেননি! কেউ বলতেই পারেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা, ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করা, রাজীব গান্ধীকে হত্যা করার অবশ্যই কারণ রয়েছে। আমরা এই বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা চাই। যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যাবে তা ছিল ন্যায়সংগত! তাহলে কি এই ধরনের কথাও, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যেই পড়ে!

যে কারণে এই বিতর্কের সূচনা, এর আগে সেই বিষয়ে আলোচনা করা দরকার। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন নিয়ে অনেক বছর ধরেই তর্কবিতর্ক হচ্ছিল। বিতর্কের মূল বিষয় ছিল, সেই আইন মূলত সাংবাদিকদের গলা টিপে ধরার মতো। কোনো প্রকৃত তথ্যই প্রকাশ বা প্রচারের সুযোগ সেই আইনে নেই। অতঃপর সেই আইন সংশোধন করা হয়েছে। মূলত সাংবাদিক নেতাদের আন্দোলনের কারণেই এসেছে পরিবর্তন। এখন তার বদলে নতুন আইন করা হয়েছে। নামকরণ করা হয়েছে, ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’। নতুন আইনে মোট ধারা ৬০টি। এটি আগামী সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হবে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সেটি সাংসদদের কণ্ঠভোটে পাসও হবে।

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি বাতিল করা হয়নি। সেই আইনেরই কিছু ধারার পরিবর্তন করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী জানাচ্ছেন ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের যে খবর জানা গিয়েছিল সেটি সত্য নয়। আসলে, পরিবর্তন করা হয়েছে (ডিএসএ), বাতিল করা হয়নি। নামটা নতুন করে দেওয়া হয়েছে, কিছু ধারায় পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে। পরিবর্তন এতটাই করা হয়েছে, যাতে কোনো দ্বিধা তৈরি না হয়। সেজন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নাম রহিত করে তার পরিবর্তে, ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ করা হয়েছে। ব্যাপারটা হচ্ছে, আইনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, নামে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনেক জায়গায় সাজার পরিমাণ বেশি ছিল, সেটা কমানো হয়েছে। যেখানে উপধারা দিয়ে পুনরায় অপরাধ করলে সাজা ডবল হয়ে যেত, সেটা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। কোনো সংশয় যাতে তৈরি না হয়, সেই কারণে রহিতকরণ ও  হেফাজতকরণের বিধান রেখে সাইবার নিরাপত্তা আইন করছি। তবে ডিএসএ-এর অধীনে যেসব মামলা করা হয়েছিল, সেগুলো চলবে। কিন্তু মামলার কার্যক্রম সাইবার নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী হবে।’

মজার বিষয় হচ্ছে, অনেকেই জানেন না, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে কী ছিল আর এই আইনে কী রয়েছে? বর্তমানে ওয়েবসাইট হ্যাকিং প্রবণতা বাড়ছে। একইসঙ্গে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতাও বাড়ছে। এখন সুস্থ মস্তিষ্কের, দেশপ্রেমিক কেউ কি চাইবেন, এসব চলুক? দেশের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে না! এটা শুধু সাংবাদিকদের জন্য হুমকি, এইভাবে বিবেচনা করার যুক্তি আসলে সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে বিস্তারিত না জানারই ফল। কারণ সাংবাদিক নির্যাতনের যে ধারাগুলো ছিল, নতুন আইনে তা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। 

দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকবার সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে, আইসিটি বা অন্য আইনে যা নেই, সেটিই নতুন আইনে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশের জন্য, আইনিভাবে প্রমাণিত সেই ব্যক্তি অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর ক্ষতি করলে অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন আইনে। অর্থাৎ এখানে হ্যাকিংয়ের শাস্তি ১৪ বছর কারাদণ্ড বা কমপক্ষে এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। নতুন আইন অনুযায়ী, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণœ করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে।

আইনের ২১ ধারার প্রস্তাব অনুযায়ী, ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রপাগান্ডা বা মদদ দিলে অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এর আগে ৫৭ ধারায় কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ও সাংবাদিকদের কারাগারে নেওয়ার একাধিক ঘটনা তৈরি করেছিল তীব্র সমালোচনা। সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের তরফ থেকে এটি নিবর্তনমূলক আখ্যা দিয়ে আইসিটি আইন বাতিলের দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হলেও নতুন আইনে আগের মতো হয়রানির আশঙ্কা থাকবে কি-না, এমন প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী বলেন, অযথা হয়রানি যাতে না হয় সেজন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?

আগে এই আইন সম্পর্কে ভালোমতো জানতে হবে। এরপর সমালোচনা করতে হবে। তাও যেন সেই সমালোচনা হয় যৌক্তিক। কিন্তু কোনোভাবেই এই আইন বাতিলের প্রশ্নই ওঠে না। এরপরও যদি পরিকল্পিতভাবে কোনো সংবাদ প্রকাশিত বা প্রচারিত হয়, তাহলে আইনানুযায়ী তার অবশ্যই শাস্তি পাওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, যেহেতু ডিজিটাল মাধ্যমকে এই আইনের টার্গেট করা হয়েছে, ফলে এটি একেবারেই যৌক্তিক। কারণ ফেসবুকে যে হারে ধর্মান্ধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের দলবদ্ধ সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা দমন করা স্বাধীনতার সপক্ষের সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। এখন এই বিষয়টিও যিনি অস্বীকার করতে চাইবেন, তাকে স্বাধীনতার পক্ষের, সুস্থ-রুচিশীল এবং মানবিক মানুষ হিসেবে কীভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে? এটা তো কোনো দলীয় বিষয় নয়! রাষ্ট্র আর একটি রাজনৈতিক দলকে একই পাল্লায় বিবেচনা করলে বড় ধরনের ভুল হতে পারে। যার দায় নিতে হবে আমাদেরই। যদি আমরা সুখী, সমৃদ্ধ, নিরাপদ এবং স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির রাজনৈতিক দর্শনকে বিশ^াস করি তাহলে কোনোভাবেই এই আইনের বিরোধিতার কারণ নেই। আর সংবাদকর্মীদের ভয় পাওয়া একেবারেই অমূলক।

মোদ্দা কথা, দেশটা আমাদের। আমরাও আমাদের। এখানে রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকতে পারে। রুচির ভিন্নতা থাকতে পারে। চিন্তা-চেতনার ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু তার অর্থ তো এই নয়, সাবেক রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীকে সবকিছুতেই তাচ্ছিল্য করে, নিজের বিকৃত পছন্দমতো না হলেই, সরকারের সমালোচনা করতে হবে! ভালোকে ভালো বলা, সুন্দরকে সুন্দর সবাই বলতে পারেন না। তার জন্য একটা সুন্দর মন লাগে। চিন্তায় শুদ্ধতা থাকতে হয়। রাজনৈতিক আদর্শগত বিরোধিতা কখনোই যেন শত্রুতায় পরিণত না হয়। ভালোকে ভালো বলতে যতটুকু যোগ্যতা লাগে ততটুকু অর্জন করাই মনুষ্যত্ব। আমরা যেন সেটি ভুলে না যাই। রাজনৈতিক দলীয় আদর্শবাদী হওয়ার চেয়ে, নিজেকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা ভীষণ প্রয়োজন। তা হলেই কেবল আমরাই হতে পারব আমাদের। আর না হতে পারলে, ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধ্বংস হবো আমরাই। এই কথা যেন, কখনো ভুলে না যাই।   

লেখক: সাংবাদিক

tapas.raihan@gmail.com