সোশ্যাল মিডিয়ায় গতানুগতিক পোস্ট বা ছবির থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে (সবসব) ‘মিম’। মাত্র তিন দিন আগে বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি ‘মিম’ ভাইরাল হয়। এতে দেখা যায়, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ লেখা একটি বোতল থেকে লালপানীয় ঢালা হচ্ছে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ লেখা বোতলে।
অনেক বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনা, অনুরোধ ও সবশেষে বিদেশিদের ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার অমোঘ চাপে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে নতুন একটি আইন এনেছে। নতুনটির নাম ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’। উল্লিখিত মিমটিতে এই বিষয়টিই উঠে এসেছে।
আগের দিনে মানুষের দাবি-দাওয়া ও রাজনীতি বুঝতে দেয়াললিখন পড়ার পরামর্শ দেওয়া হতো। সেই দেয়াললিখনের সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে গেছে। তা ছাড়া, নানা বাস্তবতায় রাজনীতি ও মতপ্রকাশও অনেকটা ইন্টারনেটভিত্তিক হয়ে উঠেছে। তাই বলা চলে, মিম এখন হয়ে উঠেছে হাল আমলের ভাষা বোঝার এক অনন্য মাধ্যম।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) অপব্যবহার রোধ করার জন্য এই আইন পরিবর্তন করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ওই আইনে কিছু অপব্যবহার হয়েছে। যেটুকু জানা যাচ্ছে, সাইবার নিরাপত্তা আইনে শুধু শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার বিধান হচ্ছে। দেশের আইন বিশ্লেষকদের মতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মূল সমস্যা ছিল এতে বর্ণিত অপরাধগুলোর সংজ্ঞায়। এ সংজ্ঞা এত ব্যাপক ও জেনারেলাইজডভাবে দেওয়া ছিল যে এতে যে কাউকে ফাঁসানো সম্ভব বলে মনে করেন তারা। সাইবার নিরাপত্তা আইনে অপরাধগুলোর সংজ্ঞা সুনির্দিষ্টকরণ করা না হলে, সেখানে পরিবর্তন না এলে নতুন আইনে শুধু শাস্তি কমিয়ে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, যা ছিল তাই আছে। শুধু নামের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। আর সাজা, জামিন এসব ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। গত চার বছরে আমরা দেখেছি সাংবাদিক এবং সুশীলসমাজ কোনো মন্তব্য করার ক্ষেত্রে অনেকটাই দ্বিধাগ্রস্ত থেকেছেন, কোনো মন্তব্য করে আবার ডিজিটাল আইনের ফ্যাসাদে পড়তে হয় এই ভেবে।
নতুন আইনে মানহানি মামলায় সাংবাদিকদের কারাদণ্ডের বিধান থাকবে না বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এটা তো ভালো। তবে এটি শুধু সাংবাদিক কেন, সবার ক্ষেত্রে হওয়া উচিত। এ ছাড়া, মানহানির অপরাধ ফৌজদারি হয় কীভাবে, সে প্রশ্নও রয়েছে। আইনমন্ত্রী এও জানিয়েছেন ডিএসএর অধীনে যেসব মামলা করা হয়েছিল সেগুলো চলবে। কিন্তু মামলার কার্যক্রম সাইবার নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী হবে। খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে হয়রানিমূলক মামলাগুলো চলবে কেন? আইনমন্ত্রী যদি নিজেই মনে করেন ডিএসএ অপব্যবহার হয়েছে তবে ওই আইনে মামলাগুলো ত্বরিত সমাধান হওয়া উচিত।
এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরার কথা বারবার ফিরে আসছে। অনলাইনে সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রচারসহ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণে্নর অভিযোগে ২০২০ সালের অক্টোবরে খাদিজা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর দেলোয়ারের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়। গত বছর ২৮ আগস্ট খাদিজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। খাদিজা কি ছাত্রজীবন ফেরত পাবেন?
লেখক মুশতাক আহমেদের কথাও সবার মনে আছে। ২০২০ সালের ৪ মে লালমাটিয়ার বাসা থেকে মুশতাককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রমনা
থানায় করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় লেখক মুশতাক, কার্টুনিস্ট কিশোর, ‘রাষ্ট্রচিন্তার’ সদস্য দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে গুজব, রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়। ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কারাগারে মুশতাকের মৃত্যু হয়।
শুরুতে উল্লিখিত মিমের স্মরণে ইতালো কালভিনোর ছোটগল্প শেয়ার করা যাক। ‘মেকিং ডু’ শিরোনামের গল্পটি ‘ডাংগুলি’ নামে বাংলায় ভাবান্তর করেছেন নাসরিন জে রানি :
“একটি শহর ছিল, যেখানে সবই ছিল নিষিদ্ধ, শুধু একটি বিষয়ই নিষিদ্ধ ছিল না, আর তা হলো ডাংগুলি, ফলে সবাই শহরের পেছনের বড় মাঠে জড়ো হতো, আর দিন পার করে দিত ডাংগুলি খেলেই।
এভাবে বহু বছর কেটে গেল। এক দিন শহর-প্রশাসনের মনে হলো, সবকিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রাখার আর কোনো প্রয়োজন নেই। এরপর তারা এই নিত্যদিন সংবাদ প্রচার শুরু করে দিল ‘অধিবাসীরা ইচ্ছে হলে অথবা যে কেউ চাইলে যা কিছু করতে পারে’।
এই সংবাদ প্রচারের জন্য শহরের প্রশাসনের সকল কর্মকর্তারা ছুটে গেল শহরের সেইসব স্থানে, যেখানে সবাই সমবেত হতো ডাংগুলি খেলতে। আর বলতে শুরু করল ‘শোনো শোনো, শোনো সবাই, এখন থেকে কোনো কিছুই আর নিষিদ্ধ নয়।’
কিন্তু ডাংগুলি খেলায় মগ্ন কেউই তার কথা শুনল না। তারা আবারও চিৎকার করে বলল ‘বুঝতে পারছ? তোমরা তোমাদের ইচ্ছামতো যা কিছু করতে পার।’
এবং লোকজনকে জোর করে তাদের কথাগুলো শুনিয়েই ছাড়ল।
কিন্তু এরপরই তারা প্রত্যুত্তর পেল। সবাই বলে উঠল, ‘ভালো সংবাদ কিন্তু আমরা তো ডাংগুলি খেলছি।’
এই ধরনের প্রতিক্রিয়া পেয়ে অস্থির হয়ে উঠল ওই কর্মকর্তারা। আর ত্বরিত গতিতে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে লাগল, সেইসব চমৎকার ও কার্যকর কাজ সম্পর্কে, যেসবে তারা ব্যস্ত ছিল একসময়। তারা বোঝাতে থাকল যে, এখন আবারও সেই সব কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ এসেছে।
কিন্তু শহরের অধিবাসীদের কেউই তাদের কোনো কথা শুনল না, পাত্তাই দিল না। তারা শুধু একমনে ডাংগুলি খেলতে লাগল, খেলতেই লাগল...। অবশেষে সব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে বুঝতে পেরে কর্র্তৃপক্ষের কাছেই ফিরে গেল সংবাদ-প্রচারকরা। ‘এর সমাধান তো খুব সহজ’ সব শুনে শহরের কর্র্তৃপক্ষ বললেন ‘তাহলে এই শহরে ডাংগুলি খেলাটাই নিষিদ্ধ করা হোক’।
(এটা সেই সময় ছিল, যখন মানুষেরা বিদ্রোহ করেছিল, আর তাদের কাউকে কাউকে অদ্ভুত অপরাধে অভিনব শাস্তি দিয়েছিল কর্র্তৃপক্ষ।) এরপর কোনো সময় নষ্ট না করেই তারা সকলে ফিরেছিল যে যার ডাংগুলি খেলতে।”
আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে বিতর্কিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে এই সাইবার সিকিউরিটি আইন হওয়ায় ঘটনাটি একটি ধারাবাহিকতার ভেতর দিয়ে দেখা যাক। ২০১৮ সালের ৫ আগস্ট আইসিটি আইনে গ্রেপ্তার শহিদুল আলমকে। ১০৭ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। ওই বছরের অক্টোবরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়। মামলাটি এখনো তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। সমালোচনার মুখে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারাসহ চারটি ধারা বাতিল করে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করে সরকার। আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫৭ ধারার অপরাধের যেসব উপাদান, সেটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চারটি ধারায় (২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১) সুকৌশলে অনুপ্রবেশ করানো হয়।
দেখা যাচ্ছে বিতর্কের মুখে যে ৫৭ ধারা বাতিল করল সেই ধারারই উপাদান ঢুকিয়ে দিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। আবার দেশ-বিদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সমালোচনার মুখে সেটি পরিবর্তন করে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট করা হলো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা বহাল রেখে নতুন সাইবার আইন করা হলে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। নতুন আইনে বিতর্কিত সেসব ধারা রাখার কৌশল ওই ডাংগুলি খেলার মতোই। আর সরকার যেহেতু ডাংগুলি খেলছে, পাবলিকও খেলছে। বিক্ষুব্ধ নেটিজেনরাও মিম বানিয়ে যাচ্ছেন।
মিম হাস্যরসাত্মক হওয়ার পাশাপাশি, ব্যঙ্গাত্মক, চিন্তামূলক এমনকি প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সামাজিক বা রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে বানানো মিমগুলোর স্থায়িত্ব বেশি হয় একটা কারণে, সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই মিমে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হয়েছে। প্রশ্নগুলোর সমাধান যত দিন না হচ্ছে অন্তত তত দিন মিমগুলো টিকে থাকবে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
jubarysayeed@gmail.com