চ্যাম্পিয়নের হার!

পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গত মঙ্গলবারের ওই ঘোষণার ফলে, আগামী পাঁচ বছর তিনি আর নির্বাচন করতে পারবেন না। তার সংসদ সদস্য পদও থাকবে না। এদিকে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল বুধবার দেশটির সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। গতকাল রাত থেকেই সেটি কার্যকর হওয়ার কথা। এর ফলে আগামী তিন মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন করবে দেশটির নির্বাচন কমিশন। ধারণা করা হচ্ছে, সাজার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আপিল করলেও অবধারিতবাবেই ওই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না ইমরান। শুধু আগামী নির্বাচনেই নয়, পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ইমরান খানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই পড়েছে চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

বিবিসি জানাচ্ছে, গত শনিবার তোশাখানা মামলায় তিন বছরের কারাদণ্ড হয় ইমরানের। রায় ঘোষণার কিছু সময় পরেই গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। কিন্তু এবার গ্রেপ্তারের পর পাকিস্তানের পরিস্থিতি ছিল আগেরবারের তুলনায় পুরো উল্টো। গত মার্চে তাকে যখন আল-কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তখন তার সমর্থকদের বিরোধিতা ও বিক্ষোভে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে অন্তত দশজন নিহত হয়েছিল। বিবিসি বলছে, চলতি বছর ৯ মে এবং গত ৫ আগস্টের মধ্যে বিশাল বৈপরীত্য দেখা গেছে। ইমরান খানের প্রথম দফা গ্রেপ্তারের ফলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাস্তায় নেমে আসা কর্মী-সমর্থকদের মুখে ছিল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সেøাগান। কিন্তু দ্বিতীয় গ্রেপ্তারের পর তার কিছুই ছিল না। গ্রেপ্তারের পর তাকে নেওয়া হলো কুখ্যাত এক কারাগারে। দেওয়া হলো দ্বিতীয় শ্রেণির বন্দির সুবিধা। তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হলো। কিন্তু তার দল পিটিআইর কর্মীরা এখনো নিরুত্তাপ।

সম্প্রতি বিবিসি নিউজের পাকিস্তান সংবাদদাতা ক্যারোলাইন ডেভিসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের নজরদারির ভয়ে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই চেয়ারম্যান ইমরান খানের ভাষণের ভিডিও এড়িয়ে চলছেন তার অনেক সমর্থক। অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় পিটিআই নেতা নিয়ে পোস্ট করা বন্ধ করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তারা পুরনো পোস্টও মুছে ফেলছেন।

বিবিসি বলছে, ইমরান খানের দলের উচ্চপর্যায়ের অনেক নেতা, যারা এ বছরের শুরুর দিকেও তাকে ঘিরে থাকতেন, তারা দল ছেড়ে চলে গেছেন। দলে আরও যারা নেতা রয়েছেন তারা গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য লুকিয়ে রয়েছেন। ফলে ইমরান খানের দল পিটিআইর পক্ষে কার্যকর একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে যাওয়া সহজ হবে না।

ওয়াশিংটনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, খান (ইমরান) বলেছিলেন যে, তিনি নির্বাচিত হতে পারেন কি না পারেন, তার দল পিটিআই টিকে থাকবে এবং উন্নতি করবে। তবে এটি এখন বাস্তব পরিস্থিতি থেকে অনেক দূরে। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচন সামনে রেখে পিটিআইর অবশিষ্ট নেতৃত্ব এখন দলটিকে কীভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা করবে? তারা কি তাদের সমর্থকদের রাজপথে নামানোর চেষ্টা করবেন? সেটা কি সফল হবে? এটা হবে বেশ বড় পরীক্ষা।

আসলে ইমরান খানকে কেন্দ্র করেই পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই গড়ে উঠেছে। তিনিই এই পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এমনকি ব্যালট পেপারে এই দলের যে লোগো ছাপা হয়, তাতেও ক্রিকেট ব্যাটের ছবি যা ইমরান খানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনের কথাই তুলে ধরে। কিন্তু ক্রিকেটের চ্যাম্পিয়ন ইমরান এবার হয়তো রাজনীতির মাঠে পরাজিত এক খেলোয়াড় হিসেবেই মিশে যাবেন কালের অতলে।

যদিও ইমরান বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন। আর পাকিস্তান সরকার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচন কমিশনের এই ঘোষণার আগে পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব বিবিসিকে বলেছেন, আইন অনুযায়ী আপনি আপনার কর্মের জন্য দায়ী থাকবেন। এখানে রাজনীতির কিছু নেই। আদালত একজন ব্যক্তিকে দোষীসাব্যস্ত করলে তাকে গ্রেপ্তার তো হতেই হবে।

৭০ বছর বয়সী ইমরান খান ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু গত বছর শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার পর সংসদে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান। গত বছর এপ্রিলে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ইমরান খান আগাম নির্বাচনের দাবি তুলে আন্দোলন করে যাচ্ছিলেন। তিনি সরকার এবং পাকিস্তানের খুবই ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রাখেন এবং তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করেন।

গত বছর নভেম্বরে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নেওয়ার সময় ইমরান খানের প্রাণনাশের চেষ্টার সময় তার পায়ে গুলি লাগে, সেই ঘটনার জন্যও তিনি উচ্চপদস্থ সরকারি এবং সেনা কর্মকর্তাদের দায়ী করেন।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ইমরান খানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হয়েছে। পাকিস্তানে বিরোধী রাজনীতিকদের প্রায়ই এ ধরনের মামলার মুখে পড়তে হয়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, সে দেশে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে সরকার আদালতকে ব্যবহার করে।