ভূমিহীন রেখেই উপজেলাকে ভূমিহীনমুক্ত ঘোষণা

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের বড়জোড়া গ্রামের মরহুম হরমুজ আলীর বাড়িতে তিন সন্তান নিয়ে থাকেন বিধবা ছোলেমা বেগম। উপজেলা সদরের বাসাবাড়িতে ঘুরে ঘুরে কাজ করেন। বিনিময়ে টাকার পাশাপাশি চেয়ে নেন পুরনো কাপড়। সেই কাপড়গুলো ভালোভাবে ধুয়ে, পরিষ্কার করে পুটলি বেঁধে ছোটেন গ্রামগঞ্জে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাপড়গুলো বিক্রি করেন। তা থেকে যা আয় হয় মূলত তাতেই চারটি মুখের আহার জোগাড় করেন তিনি। খাওয়া-পরা নিয়ে তাই তেমন আক্ষেপ নেই ছোলেমা বেগমের। তবে স্থায়ী একটা থাকার জায়গার ভীষণ আক্ষেপ তার। এক দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর পর মানুষের বাড়িতে ‘আশ্রিত’ তারা। কারও বাড়িতে দুই বছর, কারও বাড়িতে তিন বছর, তারপর অন্য কোনো বাড়ি...

ছোলেমার মতো আবেদন করেও ঘর পাননি আরও অনেকে। পরের বাড়িতে আশ্রিত হিসেবেই দিন কাটছে তাদের। এর মধ্যেই গত বুধবার উপজেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আর এরপরই শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে কয়েকটি জায়গায় আশ্রয়ণের ঘর খালি পড়ে থাকার বিষয়টি সামনে এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় সূত্র মতে উপজেলায় ইতিমধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ৩৫০টি ঘর উপহার দেওয়া হলেও এখনো অনেকেই অন্যের বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে থাকছেন।

ছোলেমা বেগম জানান, ২০২১ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরের জন্য ইউএনর কাছে আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো ঘর বরাদ্দ পাননি। মাইজবাগ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মহিলা সদস্য মঞ্জিলা খাতুন বলেন, ছোলেমা আমার প্রতিবেশী ভাগনি হয়। তার কোনো জমি-জমা নেই। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে থাকে। সে আবেদন করার পরেও পায়নি ঘর। ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম অবশ্য বলেছেন, ছোলেমা যদি আবার ঘরের জন্য আবেদন করেন তবে তিনি নিজে তাকে নিয়ে যাবেন ইউএনওর কাছে।

আবেদন করেও ঘর পাননি আরেক ভূমিহীন কাজল চন্দ্র সরকার (৩৮)। পেশায় ইজিবাইক চালক কাজল দুই ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ পৌর এলাকার কালিবাড়ি রোডে থাকেন। তার সামান্য আয়ের থেকে বাসা ভাড়া দিয়ে আর সংসার চালানোর সামর্থ্য থাকে না। বাধ্য হয়ে স্ত্রী পদ্ম পাল মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বামীর সামান্য আয়, তার থেকে বাসা ভাড়া দিয়ে চলে না সংসার। যদি একটা ঘর পাইতাম তাহলে ভাড়া দেওন লাগত না। সেই টাকা দিয়া ছেলে-মেয়েদের ভালোভাবে পড়াশোনা করাইতে পারতাম।

কথা হয় আরেক ভূমিহীন মোছা. ইনসান বানুর সঙ্গে। বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, হাঁটাচলাও তেমন করতে পারেন না। স্বামী নূরুল হক প্রয়াত হয়েছেন অনেক আগেই। একমাত্র মেয়ে সালেমা খাতুনকে নিয়ে ঠাঁই হয়েছে উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের এনায়েতনগর গ্রামের এনায়েত উল্লার বাড়িতে। ইনসান বানু বলেন, পরের জায়গা ও পরের ঘরে থাকি। এক বেলা খাইলে দুইবেলা উপোস থাকি। হুনছি সরকার জায়গাসহ ঘর দিতাছে। একটা ঘর পাইলে শেষ বয়সে অন্তত নিজের ঘরে শান্তিতে মরতে পারতাম। কেমনে কী করে জানি না। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা খোঁজখবর নেয় না।

ইনসান বানুর আশ্রয়দাতা এনায়েত উল্লাহ বলেন, তারা আসলেই ঘর পাওয়ার যোগ্য লোক। আমাদের বাড়িতে থাকে। নিজের কোনো জমি নেই। তাদের দেখাশোনা করার মতোও কেউ নেই।

আরেক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভূমিহীন বিধবা মনোয়ারা (৫৬)। স্বামীর ভিটেমাটি না থাকায় জায়গা হয়েছে ছোট ভাই আজিজুলের বাড়িতে। ছোট ভাই আজিজুল উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নারায়ণপুর গ্রামে থাকেন। দুটি মেয়ে নিয়ে তিনি পড়েছেন বিপাকে। মনোয়ারা বলেন, আমার স্বামী নেই, তার কোনো জমিও নেই। ভাইয়ের বাড়িত নানান কথা সহ্য করে কষ্টে থাকি। একটা ঘরের লাগি মেম্বার কাছে গেছিলাম, তিনিও ফিরায়ে দিছেন। জায়গাসহ একটা ঘর পেলে মাইয়াগুলো নিয়া থাকতে পারতাম।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. হাফিজা জেসমিন বলেন, যারা আবেদন করেছেন তাদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মধ্যে ঘর প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে পরামর্শ করে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। তারপরও কেউ বাদ পড়লে পঞ্চম ধাপে বিবেচনা করা হবে। 

জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, প্রতিটি উপজেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত উপজেলা ঘোষণা করেছি। কমিটিতে জনপ্রতিনিধিরা আছেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা এমন ঘোষণা দিয়েছি। এর মধ্যে কেউ যদি এখনো ভূমিহীন বা গৃহহীন থাকেন তবে সে দায় অবশ্যই সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের।