শ্রীলঙ্কার কাছে পাওনা ২০ কোটি ডলার অনিশ্চিত

তিন মাসের কিস্তিতে ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও ২৪ মাসেও বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ঋণের কোনো অর্থ পরিশোধ করতে পারেনি আর্থিক সংকটে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা। এরই মধ্যে আর্থিক দেউলিয়াত্ব কাটাতে বকেয়া ঋণ পরিশোধ না করেই নতুন করে ২৫ কোটি (২৫০ মিলিয়ন) ডলার ধার চেয়েছে দেশটির সরকার। যদিও দেশটির এই আবেদন গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ঋণের অর্থ ফেরতের বিষয়ে বারবার বাড়ানো হচ্ছে মেয়াদ। সর্বশেষ মেয়াদও চলতি মাসে শেষ হচ্ছে। ঋণের মেয়াদ আবারও বাড়ানো হতে পাবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে শ্রীলঙ্কাকে ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট ৫ কোটি ডলার, ৩০ আগস্ট ১০ কোটি ডলার ও ২১ সেপ্টেম্বর পাঁচ কোটি ডলার ছাড় করে। প্রথম কিস্তি পরিশোধ করার জন্য শ্রীলঙ্কাকে লন্ডন ইন্টার বাংক রেটের (লাইবর) সঙ্গে অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদহারে ঋণ দেওয়া হয়। তিন মাসের ঋণ শোধ করতে না পারলে দেশটিকে দ্বিতীয়বারের মতো একই হারে বাড়তি সময় দেওয়া হয়। তবে ছয় মাস পার হলে সুদের হার নির্ধারণ করা হয় লাইবরের সঙ্গে বাড়তি ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের চাপেই শতভাগ ঝুঁকির পরও শ্রীলঙ্কাকে রিজার্ভ থেকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। দেশটি কিস্তি পরিশোধের অবস্থাতে নেই জেনেও এই ঋণের ছাড় করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার চলমান আর্থিক পরিস্থিতিতে ঋণের অর্থ নিকট ভবিষ্যতে তো নয়, দীর্ঘকালে ফেরত নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংকট উত্তরণে আইএমএফের তৈরি গাইডলাইন অনুসরণ করলে, শ্রীলঙ্কা সংকট থেকে অর্থনীতি স্থিতিশীল পরিবেশে ফিরতে ১০ বছরের অধিক সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক এবং আইএমফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক টু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ সাধারণত খোয়া যায় না। তবে দেশ যদি দেউলিয়া হয় তাহলে তো ভিন্ন ইস্যু। সেক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের হস্তক্ষেপ দেখা দেয়। তখন সুদ বাদ দিয়ে সেটেল করা হয়। কোনো কোনো দেশের ক্ষেত্রে আসলের কিছু বাদ দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে অর্থ ফেরত পেতে দেশটিকে স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত সময় দিতে হয়।’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র মো. সরওয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার কাছে থেকে ঋণের অর্থ আদায় নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। ঋণ আদায়ে সব তৎপরতা চলমান রয়েছে।’

গত বছর শেষে শ্রীলঙ্কার মোট ৯ হাজার ৭০০ কোটি (৯৭ বিলিয়ন) ডলার ঋণের মধ্যে বিদেশি ঋণ ৫ হাজার ১০০ কোটি (৫১ বিলিয়ন) ডলার। মোট ঋণ জিডিপির ১১৯ শতাংশ। বিদেশি ঋণের মধ্যে আন্তর্জাতিক সভরেন বন্ডের (আইএসবি) ১ হাজার ১৮০ কোটি ডলার (৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ৪৬০ কোটি ডলার (১৪ দশমিক ৩ শতাংশ), জাপানের ১৮০ কোটি ডলার (১০ দশমিক ৯ শতাংশ) এবং চীনের ১৭০ কোটি ডলার (১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং তলানিতে পড়া বাংলাদেশের ২০ কোটি ডলার (দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ প্রায়)। এছাড়া ভারত, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘসের কয়েকটি দেশ ও সংস্থার কাছে ঋণী শ্রীলঙ্কা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘টাকা ফেরত আসবে না, এটা ভুল। তবে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েই চলছে। শ্রীলঙ্কাকে বুঝাতে হবে রিজার্ভ থেকে ঋণ দিয়ে নিজেদের সমস্যা হচ্ছে। বারবার তাগাদা দিতে হবে। যদিও দেশটি ঘুরে না দাঁড়ালে ঋণ শোধ করতে পারবে না। ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টা এখন বলা মুশকিল।’

জানা গেছে, লাইবর হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিম-লে স্বল্পমেয়াদে ঋণের প্রচলিত সুদের হার। বর্তমানে তিন মাস মেয়াদি লাইবর হার ৫ দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি। যা ঋণ বিতরণের সময় ছিল শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ। আর ছয় মাস মেয়াদে সেই হার ছিল শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হওয়ার পর শ্রীলঙ্কার অনুরোধে ঋণের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়।