ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ এবং মানবাধিকারকর্মী। সাউথ এশিয়ান ফর হিউম্যান রাইটসের সদস্য। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এই বরেণ্য আইনজীবী সাইবার সিকিউরিটি আইন, নারী নির্যাতন ও শিশু অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে
কথা বললেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান
দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের পরিবর্তে নতুন একটি আইন হয়েছে। তার নাম দেওয়া হয়েছে সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : মাত্র ৪ দিন আগে এ আইনের একটা ড্রাফট দেখলাম। এখানে আইনের মৌলিক পরিবর্তন বলতে, দুটো ধারায় পরিবর্তন লক্ষ করেছি। কিছু ধারায় পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে। আর কিছু ধারা অবিকৃত রয়েছে। আগে শাস্তির পরিমাণ বেশি ছিল। এখন কমানো হয়েছে। নারী-শিশুদের প্রটেকশনের কোনো বিষয়ই তো নেই। তারাই তো অনলাইনে বেশি ভিকটিম। আবার সাংবাদিকদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে যে হয়রানির বিষয়টি ছিল ডিজিটাল আইনে, তা অবিকৃতই রয়েছে।
নতুন আইনের মাধ্যমে মানুষকে হয়রানির বিষয়টি যে বন্ধ হবে, তা কোনোভাবেই আমার মনে হয় না। জামিনযোগ্য ধারাতেই যে আপনি জামিন পাবেন, সেই গ্যারান্টি কিন্তু এখন আর নেই।
কেন এমন কথা বলছি? ফৌজদারি আইনের যে পরিস্থিতি ৫৩ বছরে দাঁড়িয়েছে, তার একটা লিগেসি আছে। সেটা হচ্ছে, জামিনযোগ্য ধারা মানে ১৯৭ ধারা অনুযায়ী জামিন দেওয়া। জামিন না দেওয়া না। জামিন অযোগ্য থাকলেও আমি জামিন দেব, তবে বুঝেশুনে দেব। তখন অনেক কিছু বিশ্লেষণ করতে হয়।
কোনো ঘটনার পরিস্থিতি, পারিপার্শি¦কতা বিবেচনায় নিতে হয়। সেইটি বিবেচনা করে জামিন দেওয়া হয়। জামিন অযোগ্য মানে কিন্তু জামিন না দেওয়া নয়। এক্ষেত্রে কিছু কন্ডিশন বিবেচনায় নিতে হয়। অল্প কথায় এটি পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। তবে এই আইন বাতিল করতে হবে। না হলে আগের মতোই সব থাকবে। কোনো পরিবর্তন হবে না। বর্তমান আইনের কোনো সংশোধনেই কাজ হবে না। আইনের ফর্মটা পরিবর্তন করতে হবে। না হলে কোনো লাভ নেই।
দেশ রূপান্তর : আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, আইন থাকতে পারে। তবে কিছু ধারার পরিবর্তন করতে হবে?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : না , তা না। এটা যদি আগামী নির্বাচনের কোনো প্রচার কৌশল হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। তবে আইনের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
দেশ রূপান্তর : কোন উদ্দেশ্যে এই আইন করা হলো?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : ২০১৮ সালেও একটা আইনের পরিবর্তন হয়েছে। আবার ২০২৪ থেকে যদি এই আইনের পরিবর্তন করে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সামনে আনা হয়, সেটা জনগণ মেনে নেবে বলে মনে হয় না।
এখানে একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, আইন করা হয় জনগণের প্রয়োজনে। আমার যৌক্তিক কথাই আইন। আমার প্রতিনিধিরা সেটাই বানাবে। যেহেতু জনগণের প্রয়োজনে সব কিছু হবে- সুতরাং তাদের চাহিদা মতোই আইন করতে হবে। সংবিধান তো তাই বলছে। সেখানে সমস্ত ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু সরকার শুধু তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে ক্ষমতার চর্চা করবে। তাহলে ক্ষমতাটা কে চর্চা করছে, সেই তো জনগণ! তাহলে? এখন জনগণ বলছে, আমরা এই ধরনের আইন চাই না। নাগরিক হিসেবে আমার অধিকার থাকতে হবে তো।
দেশ রূপান্তর : তাহলে এই আইন বাতিল বা পরিবর্তন করতে হবে?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : কোনো বিকল্প নেই। যদি জনগণের মতামতকে আপনি গুরুত্ব দেন, তাহলে পরিবর্তন করতেই হবে। এখন একই বিষয় থাকবে, শুধু নামের পরিবর্তন হবে এটা কেমন হলো?
দেশ রূপান্তর : আপনি কি নতুন ফর্মের কোনো আইন চাচ্ছেন?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : আমাদের অলরেডি একটা আইন রয়েছে। আইসিটি অ্যাক্ট-২০০৬। সেটা বাতিল হয়নি। সেই আইনের ৫টি ধারা, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ৬১-এর ১ এর উপধারা অনুযায়ী বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া আইনে তো আগের মতো সবই আছে।
দেশ রূপান্তর : নতুন আইনের কোনো দরকার তাহলে ছিল না?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : এটা তো আমরা শুুরু থেকেই বলছি। ঐ আইনেই প্রয়োজনীয় স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সমাধানে যাওয়া যেত।
দেশ রূপান্তর : এমনটি কি মনে হচ্ছে, এই আইন উদ্দেশ্যমূলক?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : আমি তা বলছি না। হতে পারে, এটা একটা নির্বাচনী কৌশল। তবে অধিকাংশ মানুষ কিন্তু এটার ওপর বিরক্ত।
এখনো কিন্তু অনেক সাংবাদিক, শিশু জেলে রয়েছে। অনেকেই এই আইনের মাধ্যমে নিপীড়িত হয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমার কথা বলার অধিকার থাকতে হবে।
দেশ রূপান্তর : এর সমাধান কী?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে, সর্বসম্মতভাবে আইন করতে হবে। কোনো কিছু চাপিয়ে দিলে হবে না। আমরা কিন্তু বলছি না যে, এই আইন লাগবে না। অবশ্যই লাগবে। আমি চাই, আরও ভালোমতো আইনটা হোক, এটি যাতে আমাকে নিরাপদ করে। তবে এটা হতে হবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমাকে অনিরাপদ করে, এরকম বিধিবিধান বাদ দিতে হবে। আলটিমেটলি উদ্দেশ্য যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে তো মুশকিল।
দেশ রূপান্তর : আপনি কি আলোচনার মাধ্যমে এই আইন চূড়ান্ত করার কথা বলতে চাচ্ছেন?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : এ ছাড়া তো অন্য কোনো পথ নেই। নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়। শুধু শুধু এই সরকারের এমন দায়িত্ব নেওয়ার কোনো প্রয়োজন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তাহলে কেন বিতর্কের সুযোগ দেব? সাংবাদিকরা যে সমস্ত বিষয়ে নিউজ করে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তা কি ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল? তাতো নয়। ফলে সবাই যা চায়, সেটাই করা উত্তম। মানুষের চিন্তাচেতনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সমাজের কোনো অংশের আপত্তি বা সংশয়ের মধ্যে এমন আইন চূড়ান্ত করা ঠিক হবে না।
মনে রাখতে হবে, আমার সমস্ত কাজের মধ্যে যেন, গণমানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিষয়টিই আসল হয়। তখন আর কোনো সমস্যা থাকবে না। জোর করে কিছু করা ঠিক হবে না। মানুষের জন্যই তো আইন। ফলে আলোচনার বিকল্প নেই। সেখান থেকে অবশ্যই একটা সমাধান বের হয়ে আসবে। ওটাই হবে সর্বজনগ্রাহ্য। আমি আশাবাদী। ঐ রকম কিছু একটা হলে অবশ্যই ভালো হবে। তখন আর মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের আতঙ্ক কাজ করবে না। এটাই ভালো পথ। আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। সমাধান আসবেই।
দেশ রূপান্তর : এ বিষয়ে সর্বশেষ কী বলবেন?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যারা আসবে, তারাই এই আইনটি চূড়ান্ত করুক। অন্য কেউ তা করলে সমস্যা হবেই। জনগণ সব তো মেনে নাও নিতে পারে।
দেশ রূপান্তর : আমাদের দেশে শিশু ও নারী নির্যাতন বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া : নির্যাতনের ধরন পাল্টেছে। কিন্তু নির্যাতনের মাত্রা কমেছে বলে মনে হয় না। তবে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই উন্নতি করেছি। এসিড সন্ত্রাস, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের উত্তরণ হয়েছে। কিন্তু নারীর কর্মপরিবেশ এবং নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আছি। এদিকে নজর দিতে হবে। তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।