মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় ১৬ বছরে ১০ বার প্রশ্ন ফাঁস

দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে এবার প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক ও বিএনপি-জামায়াত নেতাদের সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি, যাদের মধ্যে সাতজনই চিকিৎসক। রয়েছেন এক চিকিৎসক দম্পতিও। তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন মেডিকেল ভর্তি কোচিং সেন্টারের মালিক বা প্রাইভেট পড়ানোর সঙ্গে যুক্ত।

সিআইডি বলছে, চক্রটি গত ১৬ বছরে ১০ বার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করেছে। আর ওই প্রশ্নপত্রে অসংখ্য প্রার্থী মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। তাদের অনেকে চিকিৎসকও হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে বলে সিআইডি জানিয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন ডা. ময়েজ উদ্দিন আহমেদ প্রধান, ডা. সোহেলী জামান, ডা. মো. আবু রায়হান, ডা. জেড এম সালেহীন শোভন, ডা. মো. জোবাইদুর রহমান জনি, ডা. জিল্লুর হাসান রনি, ডা. ইমরুল কায়েস হিমেল, জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া মুক্তার, রওশন আলী হিমু, আক্তারুজ্জামান তুষার, জহির উদ্দিন আহমেদ বাপ্পী ও আবদুল কুদ্দুস সরকার। গত ৩০ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও বরিশালে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করেছে সিআইডির সাইবার টিম।

গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান সিআইডিপ্রধান অ্যাডিশনাল আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া। তিনি বলেন, ২০২০ সালের ২০ জুলাই মিরপুর মডেল থানায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একটি মামলা হয়। মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, চক্রের অন্তত ৮০ জন সক্রিয় সদস্য প্রায় ১৬ বছরে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে অবৈধভাবে মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি করিয়ে শতকোটি টাকা আয় করেছে। যাতে কেউ ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করতে সাহস না পায়, এজন্য তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে সিআইডিপ্রধান বলেন, ডা. ময়েজ উদ্দিন মেডিকেল প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ফেইম নামক কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে এই চক্রে জড়ান তিনি। তিনি চিহ্নিত ছাত্রশিবির নেতা এবং পরে জামায়াতের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত। তার স্ত্রী জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. সোহেলী জামান প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম সদস্য। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ফেইম কোচিং সেন্টার ও স্বামী ময়েজের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস চক্রে জড়ান। ডা. মো. আবু রায়হান ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ছাত্র ছিলেন। ২০০৫ সালে প্রশ্ন পেয়ে ঢাকা ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হন এবং এই চক্রে জড়িয়ে পড়েন। প্রাইমেট কোচিং সেন্টার চালাতেন তিনি। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্মরত তিনি। ডা. সালেহীন শোভন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে থ্রি-ডক্টরস নামের কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস চক্রে জড়ান। তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। ডা. শোভন ২০১৫ সালে র‌্যাবের হাতে একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের পদধারী নেতা ছিলেন তিনি।

সিআইডিপ্রধান আরও বলেন, ডা. জোবাইদুর রহমান জনি মেডিকো ভর্তি কোচিং সেন্টারের মালিক। ২০০৫ সাল থেকে এই চক্রে জড়িত। নামকরা বিভিন্ন চিকিৎসকের সন্তানদের মেডিকেল কলেজ ভর্তির সুযোগ পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। প্রশ্ন ফাঁসের মাস্টারমাইন্ড জসীমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তিনি। ডা. জোবাইদুর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য সম্পাদক হয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে যুবদলের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক। ডা. জিল্লুর হাসান রনি জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালের (নিটোর) চিকিৎসক। ২০০৫ সাল থেকে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। ২০১৫ সালের মেডিকেল পরীক্ষার সময় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে রংপুর থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। রংপুর মেডিকেলে পড়াকালে ছাত্রদল নেতা ছিলেন। বর্তমানে বিএনপি সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের সঙ্গে জড়িত এবং আহত বিএনপি নেতাদের চিকিৎসায় গঠিত দলের একজন সদস্য। ডা. ইমরুল কায়েস হিমেল ময়মনসিংহের বেসরকারি কমিউনিটি ব্যাজেড মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেন। ২০১৫ সালে টাঙ্গাইলের আকুরটাকুরপাড়ায় নিজ শ্বশুরবাড়িতে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পড়িয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে অবৈধভাবে মেডিকেলে ভর্তি সুযোগ করে দেন।

জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া মুক্তার মেডিকেল প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মাস্টারমাইন্ড জসীমের বড় ভাই ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যুরো প্রেসের মেশিনম্যান সালামের খালাতো ভাই। রওশন আলী হিমু জসীমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং পুরনো সহযোগী। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ২০০৬ সাল থেকে মেডিকেলের প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। আক্তারুজ্জামান তুষারও জসীমের ঘনিষ্ঠ সহচর। জহির উদ্দিন আহমেদ বাপ্পী মেডিকেল প্রশ্ন ফাঁস চক্রের অন্যতম হোতা এবং জসীমের পুরনো সহযোগী। ঢাকার ফার্মগেটে ইউনিভার্সেল নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সহায়তা কেন্দ্র চালাতেন। ২০০৫ সাল থেকে এ চক্রে জড়িত। প্রাইমেট, থ্রি-ডক্টরসসহ বিভিন্ন মেডিকেল কোচিং সেন্টারে ফাঁসকৃত প্রশ্ন সরবরাহ করতেন রাজনৈতিকভাবে যুবদলের কর্মী। জহিরের পুরো পরিবার বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আবদুল কুদ্দুস সরকার টাঙ্গাইলের মিন্টু মেমোরিয়াল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসরে গেছেন। তিনিও মেডিকেল প্রশ্ন ফাঁসের মাস্টারমাইন্ড জসীমের ঘনিষ্ঠ সহচর। ২০০৬ সালে মেয়ে কামরুন নাহার কলিকে ভর্তির মাধ্যমে এই চক্রে জড়ান। এরপর ছেলে ইমরুল কায়েস হিমেলকে সঙ্গে নিয়ে টাঙ্গাইল এবং ময়মনসিংহে গড়ে তোলেন এক সিন্ডিকেট। জসীমের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল কুদ্দুসের। জসীমও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিয়মিত টাঙ্গাইল আসতেন।

সিআইডিপ্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, ২০০১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি যত মেডিকেল কলেজ আছে, তার ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এই চক্রটি ফাঁস করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আটজন তাদের অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের জবানবন্দিতে শতাধিক শিক্ষার্থীর নাম উঠে এসেছে, যারা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পেয়ে মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। অনেকে পাস করে চিকিৎসক হয়ে গেছে। তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার কাজ প্রক্রিয়াধীন।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের দেওয়া বিপুলসংখ্যক ব্যাংকের চেক এবং প্রবেশপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া চক্রের মাস্টারমাইন্ড জসীম উদ্দিন ভূঁইয়ার কাছ থেকে একটি গোপন ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা তার চক্রের অন্যান্য সদস্যের নাম রয়েছে। সেসব সদস্যকে ধরতে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চক্রের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ২০২০ সালে প্রথমে সানোয়ার হোসেন নামে একজনকে মিরপুর থেকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন জসীম, পারভেজ খান, জাকির হোসেন ওরফে দিপু ও মোহাইমিনুল ওরফে বাঁধন।