রক্তঋণ কোনোদিন শোধ হয় না

সুদীর্ঘ আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে, বাঙালিকে নিজস্ব একটি পরিচয় দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজকের ‘বাংলাদেশ’ তারই রক্তধোয়া। কী ভয়ংকর কৃতঘœ আমরা! তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করেছি! কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে বেঁচেছিলেন, দুই কন্যা। ইতিহাসের চক্রব্যূহে তারই কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে খুনিচক্রের অধিকাংশকেই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে, মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়েছে। তাদের অনেককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয়েছে মৃত্যুদন্ড। যারা বেঁচে আছেন, তারা দেশের বাইরে। অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালে, মৃত্যুদ-ের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে অস্থির সময় কাটছে তাদের। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকার কারণে, দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভবও হচ্ছে না খুনিদের। আবার কোনো কোনো দেশে মৃত্যুদ-ের নিয়ম থাকলেও, ‘ফাঁসি’ সমর্থন না করার কারণে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না।

কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো? এটা নিছকই একদল বিভ্রান্ত সামরিক কর্মকর্তা দ্বারা সংঘটিত হত্যাকান্ড এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে, দেশ-বিদেশের গভীর ষড়যন্ত্র। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর, দুই যুগের সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালে চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এ সংগ্রামে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে গণতন্ত্র, শোষণ-বৈষম্য, ধর্মনিরপেক্ষতা, ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি যোগ করে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত করায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু। অসামান্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে বিশ্বখ্যাত ‘নিউজ উইক’ ম্যাগাজিন ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে ‘পয়েট অব পলিটিকস’ অভিধায় ভূষিত করে। তার গতিশীল নেতৃত্বের কারণে ব্রিটেনের শীর্ষ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ বলা হয় ‘শেখ মুজিব এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশপ্রেম, দৃঢ়চেতা মনোভাব এবং শোষণহীন সমাজব্যবস্থার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ও বিশ্বাস, দেশ-বিদেশের অনেকেরই ছিল গাত্রদাহের কারণ। যে পাকিস্তানের দীর্ঘ শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল মহাকালের বজ্রকণ্ঠ, তাকে স্তব্ধ না করা পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বশক্তি যেন শান্তি পাচ্ছিল না। এর সঙ্গে যোগ হয় সেই রাষ্ট্র, যার নাড়ি ছিঁড়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ‘বাংলাদেশ’। ঠিক তখনই দেশি-বিদেশি চক্রান্তে দেশকে অস্থির করে তোলা হয়। একদিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি আর অন্যদিকে মানুষের নিত্য আহারে সংকট সৃষ্টি করে, পটভূমি তৈরি করা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার। এর ফলে কী হারিয়েছে বাংলাদেশ, তার সঠিক উপলব্ধি একদিন ঠিকই হবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যে মোশতাক, মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যে মোশতাক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন সেই তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর, হত্যাকারীদের বিচার না করার বিধান রেখে জারি করেন দায়মুক্তি অধ্যাদেশ। লাভ হয়নি। এসব অন্যায়-অবিচার ইতিহাসের অমোঘ বিচারের সামনে ধুলোয় উড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অপরাধীর বিচার হয়েছে, অধিকাংশেরই শাস্তি হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমাদের কাছে প্রবল শক্তিশালী এক নাম। এ নামের মধ্যেই যেন আমরা খুঁজে পাই অমিত তেজ, শক্তি, দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা নিয়ে দেশের গণমানুষকে ভালোবাসার তীব্র প্রেরণা। তাকে হত্যা করে, আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বাঙালির হৃদয়। হৃদয়ের গহিনতম যে আসনে তিনি প্রোথিত রয়েছেন, তা থাকবে অনন্তকাল। এ বেঁচে থাকা, জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়েও কোটি গুণ শক্তিশালী। তিনি রয়েছেন শানিত চেতনায়। এই বঙ্গবন্ধু কোনো দিন মরবে না।

যে কারণে বলতেই হয় বাঙালিকে দেশ দিলো, এক মহাপ্রাণ/ হারাবে না কোনোদিন তার জয়গান/ রক্তঋণ কোনোদিন শোধ হয় না/ না, কোনোদিন না বঙ্গবন্ধু মরে না। আজকের এই দিনে, সতত শ্রদ্ধা বঙ্গবন্ধুর প্রতি। গভীর শ্রদ্ধা রইল তাদের প্রতি, যাদের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেগে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে। এই বাংলাদেশই একদিন গড়ে উঠবে শোষণহীন সমাজব্যবস্থায়। যে স্বপ্ন দেখতেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান।