আজও খালি পায়ে হান্নান ফকির

যে কোনো বার্ষিকী, আমাদের পুরনো ঘটনা আর মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতি বছর যখন তারিখগুলো ঘুরে আসে, আমাদের মনে পড়ে কী ঘটেছিল সেই দিন। আমরা জানি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিপথগামী দল বঙ্গবন্ধুর ধানম-ি ৩২-এর বাসভবনে গিয়ে তাকে হত্যা করে। আমরা যা জানি না তা হলো, সেদিন স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের মনের সংক্ষুব্ধতা অথবা হতবিহ্বলতা। ইতিহাসের এই মহানায়কের জন্মস্থান এবং যেখানে তিনি সমাধিস্থ রয়েছেন সেই গোপালগঞ্জবাসী কীভাবে এই শোক বহন করেছিলেন, তা জানতে ইচ্ছে করে। শুনেছি কেউ কেউ অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

গোপালগঞ্জ শহরের আদি বাসিন্দারা এখন বিরল। যাও দুই/তিনজনকে পাই, তারা এমন চরিত্রের কথা শুনেছেন, কেউ কেউ দেখেেেছন কিন্তু মনে করতে পারেন না। তবে, শহরের পুরনো বাসিন্দাদের স্মৃতিতে ১৫ আগস্ট কেমন ছিল? তারা জানান, নির্দিষ্ট এই দিনটিতেই শহরে চোখে পড়ত বিশেষ কিছু চরিত্র। যারা বছরব্যাপী বিস্মৃত হয়ে থাকতেন নিজেদের ‘পাগলামি’ নিয়ে। এদের কেউ হয়তো বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর থেকে ভাত খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ মাংস খান না, কেউ কেউ খালি পায়ে হাঁটেন, কেউ সেদিনের পর থেকে আর চুল কাটেন না... ইত্যাদি ইত্যাদি, এই লোকগুলো তাদের অভ্যাসের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদের এক নীরব ভাষা জারি রেখেছেন অনেক দিন ধরে। সারা বছর ভুলে থাকা ওই প্রান্তিক নাম না জানা লোকগুলো বিশেষ হয়ে উঠতেন বা চোখে পড়ত। এ সবই ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর কুখ্যাত ইনডেমনিটি বিল বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়েরের আগের ঘটনা। ফলে ওই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিচার আদৌ হবে কি না, হলেও তা নিয়েও সারা দেশের মানুষের মতো সংশয়ের মধ্যে ছিল গোপালগঞ্জবাসীও।

আমরা ওই শোকাহত মানুষদের খোঁজ করতে থাকি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হওয়ার পর, মুজিব শতবর্ষ পার করে কেমন আছেন সেই লোকগুলো। শহরের লঞ্চঘাটা এলাকায় একটা চায়ের দোকান পাই যেখানে বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনার দুটি ছবি বাঁধাই করে টাঙানো। ছবি দুটিতেই মালা পরানো। দোকানিকে চায়ের অর্ডার দিয়ে আলাপ জমাতে জানতে চাই ছবি দুটি সম্পর্কে। সে জানায় তার বড় ভাই তুহিন এই দোকান শুরু করে, সে এখন সৌদি প্রবাসী। দিন-তারিখ না জানতে পারলেও যা বুঝি আশির দশকের শেষ দিকে এই দোকান চালু হয়। তখন আওয়ামী লীগ অফিস ছিল দোকানটির উল্টো দিকে। তুহিন ছিল মুজিবভক্ত। সে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি টানিয়ে  দোকান শুরু করে। বড় ভাই বিদেশ চলে যাওয়ার পর সে দোকানটি চালাচ্ছে। এটুকু বলতে বলতে সে ছবি দুটির দিকে তাকায়, হয়তো প্রবাসী বড় ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। ছবি দুটি নামিয়ে মালা খুলে ধুলো মুছতে থাকে তুহিনের ছোট ভাই। তাকে হালকা করতে জানতে চাই, বঙ্গবন্ধু তো মারা গেছেন, দেখেছি যে মৃত ব্যক্তির ছবিতে মালা পরায় স্বজনরা। কিন্তু শেখ হাসিনার ছবিতেও মালা কেন? সে বলে- সে তো হিন্দুরা করে, আমার ভাই ভালোবেসে মালা দিয়ে গেছে বঙ্গবন্ধু আর তার মেয়ের ছবিতে। এরপর আর কথা আগায় না।

এক পর্যায়ে আমরা জেলা আওয়ামী লীগ অফিসে যাই ১৫ আগস্টে শোকাহত, হতবিহ্বল মানুষের খোঁজ করতে। সেখানে কথা হয় গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুব আলী খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর শোকে শোকাহত সেকেন্দার ভাইকে দেখেছি। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে তাকে বঙ্গবন্ধুর কবরের কাছে পড়ে থাকতে দেখেছি। সে বঙ্গবন্ধুকে বলত বাপজী। সে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিচার চেয়ে, প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তৃতা দিতে দিতে শহরের রাস্তায় বঙ্গবন্ধুর ছবি গলায় ঝুলিয়ে, খালি পায়ে হাঁটত। 

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আরও বলেন, এছাড়া হান্নান ফকিরকেও শোকাহত হতে দেখেছি। কিন্তু সেকেন্দারের মতো তার শোক ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায়নি। সেকেন্দার বঙ্গবন্ধুর ছবি বুকে জড়িয়ে হাঁটত। সেই সময় তো বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়াই কঠিন। ওই পরিস্থিতিতে সে অপ্রকৃতিস্থই হয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারেনি। পরিবার, সংসার সব ত্যাগ করেছে। রাস্তাঘাটে সব জায়গায় সে চিৎকার করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করত, বিচার চাইত। 

আমাদের আরও বিস্তারিত জানতে ইচ্ছে করে এই দুই চরিত্র সম্পর্কে। একজনকে পেয়ে যাই, তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হাবিবুর রহমান। অর্থনীতির এই প্রফেসরের কাছ থেকে জানতে পারি- ‘সেকেন্দার নেতাজী সেকান্দার নামে পরিচিত ছিলেন। ওনার পুরো নাম হচ্ছে শেখ সেকান্দার আলী। জন্ম ১৯৩৪ সালে, কোটালীপাড়ার উত্তর পাড়া গ্রামের শেখ বংশে। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাবা বলতেন। তিনি বিএম কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই সেকান্দার ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী এবং বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরে তার জীবনের সবকিছুই ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়ে যায়। মূলত অনেকের কাছে তিনি তখন থেকে পাগল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাকে বলা হতো বঙ্গবন্ধুর পাগল। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরে উনি যে পোশাক পরা ছিলেন দীর্ঘদিন ওই একই পোশাকে ছিলেন। চুল কাটতেন না। সবসময় বঙ্গবন্ধুর ছবি বুকে ধরে রাখতেন। যতক্ষণ বঙ্গবন্ধুর ছবি ওনার কাছে থাকত, ততক্ষণ তিনি কোনো স্যান্ডেল-জুতা পায়ে দিতেন না। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি বিছানাতেও ঘুমাতেন না। তিনি কোটালীপাড়ার সিকিরবাজারে, যেটাকে পাবলিক ইনস্টিটিউট বলে সেই হাইস্কুলের বেঞ্চেই রাতে ঘুমাতেন। ঝড়, বৃষ্টি-বাদল যাই হোক না কেন তিনি আর নিজের ঘরে ফেরেননি। আর সবসময় তিনি বঙ্গবন্ধুর কথা বলতেন। আর তিনি কখনো কারও কাছে কিছু চেয়েছেন এমন শুনিনি, দেখিনি। ক্ষুধা পেলেও খাবার চাইতেন না। তবে তাকে সবাই চিনত, তাই অনেকেই তাকে খাবার দিত, যে যা দিত সেটাই খেতেন তবে চাইতেন না। সারাক্ষণই তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবনী, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন, ছাত্রলীগ, মানুষের মুক্তি কীভাবে আসবে এসব নিয়ে কথা বলতেন। আমরা যখন থেকে তাকে দেখে আসছি এসবের বাইরে কোনো আলাপ তিনি করতেন না। আর বঙ্গবন্ধুর একটা বড় ছবি সবসময়ই তার কাছে থাকত। তিনি মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। স্কুল, কলেজ, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের জন্য সংগঠিত হওয়ার কথা বলতেন। উনি যা কিছুই খেতেন সেটা প্রথমে হাত দিয়ে ধরে বঙ্গবন্ধুর ছবিতে স্পর্শ করতেন পরে নিজের মুখে তুলতেন। প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওই দিনের বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার খবর শুনতেন রেডিওতে। ওই সময় তো গ্রামের দোকানে রেডিও চলত। প্রতিদিনের খবর তিনি রেডিও থেকে শুনে ডিটেইলস বলতে পারতেন। ইংরেজি জানতেন খুব ভালো, বলতেও পারতেন। এছাড়া যে কোনো বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি সে বিষয়টি বড় ক্যানভাসে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। তা সে ইতিহাস হোক কিংবা দর্শন। পরে যাচাই করে দেখেছি যে তিনি অথেনটিক কথা বলেছেন।’

প্রফেসর হাবিবুর রহমান জানান, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার সরকার গঠন করলেন তখন তিনি অনশনে গেলেন। তার দাবি ছিল বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে টাকা ছাপতে হবে। পরবর্তী সময়ে তিনি অনশনরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে গেলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এবং শুনেছি তখনো নাকি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন যে যতক্ষণ পর্যন্ত বাবার ছবি টাকায় না আসবে ততক্ষণ অনশন ভাঙবেন না। পরে তো বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ টাকা ছাড়া হয়েছে কিন্তু সেকেন্দার প্রথম এই দাবি জানিয়েছিলেন।

তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দেখে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি মারা যান। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পর তার প্রতিক্রিয়া আমি দেখতে পাইনি। তবে জেনেছি যে ১৫ আগস্টের ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি করেছিলেন। দেশ স্বাধীনের পরপরই কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফর রহমান আদর্শ কলেজ প্রতিষ্ঠার তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসেই তাকে সমাহিত করা হয়।

তিনি বলেন, ‘মুজিবভক্ত বলতে যেটা বোঝায় সেটা ছিলেন নেতাজী সেকান্দার। কাশিয়ানীর আরেকটা লোককে আমি দেখেছি গোপালগঞ্জে, যিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনার পর থেকে খালি পায়ে হাঁটতেন। তবে তার নাম এখন মনে করতে পারছি না।’ বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যাপক যার নাম ভুলে গিয়েছেন তার উল্লেখ পাই আমরা আওয়ামী লীগের সভাপতির মুখে। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হান্নান ফকির। এবার তার খোঁজ করি বিভিন্নজনের কাছে। শহরে তেমন লোক খুব বেশি নেই। অবশেষে যাই গোপালগঞ্জের সিনিয়র সাংবাদিক মনোজ সাহার কাছে। তিনি হান্নান ফকিরকে প্রথমেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে জানান, তার সঙ্গে আমার একাধিকবার দেখা ও কথা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও তিনি পান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পরপর তিনি অনেকটা উন্মাদের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় নানা স্থানে বিভিন্নভাবে বিক্ষিপ্ত কথাবার্তা বলতেন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চেয়ে।

তিনি জানান, ‘তার বাড়ি মুকসুদপুর উপজেলার পাইকদিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম শামসুদ্দিন ফকির ওরফে আলহাজ উদ্দিন ফকির। ১৯৭৫ সালে আব্দুল হান্নান ফকির ফরিদপুরের ভাঙ্গা ডিগ্রি কলেজে বিকম পড়তেন। ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার খবর পরের দিন। অর্থাৎ ১৬ তারিখ সকালে।

তিনি কলেজ ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর বেতারের মাধ্যমে জানতে পারেন। খবর শুনে তিনি মুষড়ে পড়েন। তারপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যতদিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না হবে ততদিন তিনি জুতা পরবেন না। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট থেকেই তিনি জুতা-স্যান্ডেল পরা ছেড়ে দেন। তাকে নগ্ন পায়ে হাঁটতে দেখেছি ছোটবেলা থেকেই। এভাবেন তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। এবং ঘুরে ঘুরে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি করতেন। ইনডেমনিটি বাতিলের দাবি করেছেন বারবার। তার স্ত্রীর নাম চায়না বেগম। আব্দুল হান্নান ফকির এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। ছেলে আমির হোসেন নৌবাহিনীতে চাকরি করেন। মেয়ে রিনা বেগমের বিয়ে দিয়েছেন মুকসুদপুর উপজেলার প্রসন্নদি গ্রামে।’

মনোজ সাহা জানান, হান্নান ফকির বনেদি কৃষক পরিবারের সন্তান। সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধ এই তিনটি ক্ষেত্রে কখনোই কারও সঙ্গে আপস করেননি। এসব নিয়ে যেখানেই তিনি বিতর্কে জড়িয়েছেন সেখানে তিনি কারও সঙ্গেই হার মানতেন না। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনি কোনো কটু কথা, বিতর্ক পছন্দ করতেন না। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কোনো বাজে কথা, মন্তব্য শুনতে চাইতেন না, শুনলেই তিনি সেটার প্রতিবাদ করতেন, প্রতিহত করতেন।  এই সিনিয়র সাংবাদিক আরও জানান, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রায় কার্যকর হওয়ার পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আমি তখন অবশ্য যেতে পারিনি। যতটুকু জানি এখন তিনি গ্রামের বাড়িতে আছেন। ৭৩ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধা এখনো সুস্থ সবল। তিনি মানুষকে খাওয়াতে ও সম্মানিত করতে পছন্দ করেন। তাই মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা, জমির ফসল, পুকুরের মাছ বিক্রির টাকা মানুষের পেছনে খরচ করেন। সংসারের পেছনে তিনি এক পয়সাও ব্যয় করেন না। থাকেন একটি ছোট টিনের ঘরে। ওনার সঙ্গে আমার যতবার কথা হয়েছে, তিনি প্রতিবারই জানিয়েছেন যে কোনো স্বীকৃতি বা কিছু পাওয়ার জন্য তিনি বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর খালি পায়ে থাকা শুরু করেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ভক্ত। বঙ্গবন্ধু দ্বারা তিনি এত বেশি আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে কোনো স্বীকৃতি এখানে বিবেচনায় আসে না। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা সবাই তাকে চিনতেন। কিন্তু তিনি দলীয় নেতাদের দ্বারা তেমন মূল্যায়িত হননি। তিনি তার নিজের মতো করে বঙ্গবন্ধু হত্যার শোক ও প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। তাছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত আসলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদেরই অনেকে মুখ খুলতেন না তেমন, সেখানে তাকে মূল্যায়ন করবে কীভাবে? কিন্তু এই হান্নান ফকিরের মতো লোকজন যারা, তারাই কিন্তু কথা বলেছেন, শোক প্রকাশ করেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারাই বিস্মৃত সময়ে বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করেছিলেন।’

সাংবাদিক মনোজ সাহার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আমরা এবার বঙ্গবন্ধুর ভক্ত হান্নান ফকিরের সঙ্গে দেখা করতে যাই। গোপালগঞ্জ থেকে বাসে জলিরপাড় বাসস্ট্যান্ডে নামি। জলিরপাড় বাজারের ব্যবসায়ী কার্তিক ভক্ত তার মোটরসাইকেলে পিচঢালা পথ বেয়ে নিয়ে যান পাইকদিয়া গ্রামে। পথের দু’ধারে মহিলা ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ পাটকাঠি থেকে আঁশ ছাড়াচ্ছিলেন। তিন দফা বৃষ্টিতে ভিজে বিকেল ৪টার দিকে হান্নান ফকিরের বাড়িতে পৌঁছাই। তিনি তখন বাড়ি ছিলেন না। মোবাইলও সঙ্গে নেননি। তাই তাকে খুঁজে পেতে দুই ঘণ্টা দেরি হয়। অবশেষে মুকসুদপুর উপজেলার বনগ্রাম বাজারে গিয়ে আব্দুল হান্নান ফকিরকে পাওয়া যায়। আমরা মুখোমুখি হলাম তার। দেখলাম নগ্ন পায়ে পথ চলছেন। মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। মিানুষকে চা দিয়ে আপ্যায়ন করছেন।

হান্নান ফকির এখনো সুস্থ আছেন। তিনি কোনো কাজ করেন না। আওয়ামী লীগের সমাবেশ, মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। আড্ডা দিয়েই কাটিয়ে দেন দিনের অধিকাংশ সময়। সারা দিন তিনি মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও যুদ্ধের বীরত্ব কথা নিয়ে অনর্গল কথা বলেন। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ইন্ডিয়ার নীলগঞ্জ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে এসে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীনের পর তিনি ভাঙ্গা ডিগ্রি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৭৬ সালে তিনি বিকম পাস করেন।

হান্নান ফকির বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার একাধিকবার দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে মাত্র দুবার।’ এরমধ্যে একদিন মিরপুরে আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান শেখের বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হান্নান ফকিরের। তখন বঙ্গবন্ধু তাকে মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেন। সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকার উপদেশ দেন। তিনি নেতার আদেশ মেনে এখন পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়ের পথে পথ চলছেন।

আব্দুল হান্নান ফকির বলেন, আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ও শোক জানিয়ে ৪৮ বছর ধরে পায়ে জুতা পরছি না। বিচার হওয়ার পরও জুতা না পরার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদেশে পালিয়ে থাকা তিন খুনিকে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করতে হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে এটি আমার একমাত্র চাওয়া। তার কাছে আমার আর কোনো দাবি-দাওয়া নেই। বিদেশে পালিয়ে থাকা তিন খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর করা হলেই আমি জুতা পরব।