হতাশা থেকে গেছেন খেলোয়াড়রা

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলার কে? এ নিয়ে তর্কটা বহুদিনের। তবে ঘুরেফিরে আসে দুটি নাম। একজন বাংলাদেশের প্রথম বিদেশি লিগে খেলা কাজী সালাউদ্দিন। আরেকজন স্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোলদাতা এনায়েতুর রহমান। ২০২২ সালে ২৮ বছর পর দেশে এসেছিলেন এনায়েত। সেই ১৯৯৪ সালে কানাডা পাড়ি জমিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন পর দেশে এসে অনেকটা সময় কাটিয়ে আবার ফিরে গেছেন। দেশে আসার পর অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে নিয়েছেন অর্থসহায়তা। তারপর আবার ফিরে গেছেন প্রবাসজীবনে।

ফুটবল মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, রুম্মন বিন ওয়ালী সাব্বির, কায়সার হামিদরা এ দেশেই থেকে গেছেন। রাষ্ট্র তাদের দিয়েছে যোগ্য সম্মান। সেই সম্মানটা পেতে পারতেন এনায়েতও। তারপরও কেন প্রবাসের কঠিন জীবন বেছে নেওয়া?

শুধু ফুটবলাঙ্গন নয়, তালিকা করলে দেখা যাবে হাজারো ক্রীড়াবিদ পাড়ি জমিয়েছেন নানা উন্নত দেশে। এক মার্কিন মুল্লুকেই মিলবে শত শত খেলোয়াড়। কেউ গিয়েছেন বৈধপথে। কেউবা কোনো ক্রীড়া আসরে অংশ নিতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। এই না ফেরার সলুকসন্ধান করতে গিয়ে বের হয়ে এলো কঠিন বাস্তব চিত্র। মোটা দাগে হতাশা থেকেই দেশ ছেড়ে গেছেন অনেকে। উন্নত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেকে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার আগেই পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে।

ফুটবল অঙ্গন থেকে বিদেশে বসত গড়া তারকা সংখ্যা নেহাত কম নয়। দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় বসবাস করেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রিজভী করিম রুমি, ফুটবলার মামুন জোয়ার্দার, মিজান। তারকা গোলকিপার ও বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ শাহিদুর রহমান চৌধুরী শান্টু, শামসুল আলম মঞ্জুর বসবাস যুক্তরাষ্ট্রে। কিংবদন্তি অ্যাথলেট সাইদুর রহমান ডন, ১৯৮৫ ঢাকা সাফ গেমসে পাঁচটি স্বর্ণপদকজয়ী সাঁতারু মোশাররফ হোসেন খানের স্থায়ী নিবাস এখন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৯৯ কাঠমান্ডু সাফ গেমসে সোনাজয়ী বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জুয়েল রানা একটু দেরিতে হলেও সপরিবারে চলে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় জাতীয় ফুটবল দলে প্রতিনিধিত্ব করা আবুল, বেলাল, মারুফ, তকলিছ আহমেদ, ওয়াহেদরা সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় মাঠ ছেড়ে চলে গেছেন প্রবাসে। অতিসম্প্রতি নারী ফুটবল দলের ক্যাম্প ছেড়ে চীন চলে গেছেন ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন। তবে তার দাবি, খেলার লক্ষ্যেই গেছেন।

প্রবাসজীবনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত যে সবসময় সঠিক হয়, তা কিন্তু নয়। দেশের অন্যতম সেরা গোলকিপার মোহাম্মদ মোহসিনের কথাই ধরুন। দীর্ঘদিন কানাডায় বসবাস করেও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে না পেরে দেশে ফিরে আসেন অসুস্থ অবস্থায়। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে খুইয়েছেন সব সঞ্চয়। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগব্যাধি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিয়েছে তার চিকিৎসার দায়িত্ব। আবার বিদেশের চাকচিক্যময় জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে নিজেকে সঁপে দেওয়ার উদাহরণও আছে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাবেক ফুটবল তারকা আব্দুল গাফফার। তবে দেশের টানে ঠিকই ফিরে এসে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে। 

ক্রিকেটাঙ্গনেরও অনেক তারকা বেছে নিয়েছেন প্রবাসজীবন। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল এসিসি ও আইসিসির চাকরি সুবাদে অনেক দিন ধরেই আছেন দেশের বাইরে। চাকরিস্থল দুবাই হলেও তিনি সপরিবারে বসবাস করেন অস্ট্রেলিয়ায়। গোলাম নওশের প্রিন্স থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। ওপেনার আল শাহরিয়ার রোকন খেলোয়াড়ি জীবনেই পাড়ি জমান নিউজিল্যান্ডে। হালিম শাহ, তাপস বৈশ্য, মেহরাব জুনিয়র, জাতীয় দলের সাবেক পেসার মোহাম্মদ শরীফ, আবুল হাসান, ওপেনার জুনায়েদ সিদ্দিকীরা আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। অনেকে সেখানে নিয়মিত খেলাধুলাও করছেন। একসময়ের ঢাকার মাঠ কাঁপানো হকি খেলোয়াড় আবদুল সাদেক কানাডায় থাকেন অনেক দিন।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে খেলতে গিয়ে ফিরে না আসা ক্রীড়াবিদের সংখ্যাও কম নয়। ১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিক খেলতে গিয়ে ফেরেননি এক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানব বিমল চন্দ্র তরফদার। কৃতী সাঁতারু কারার মিজানুর রহমানও সেবার থেকে যান যুক্তরাষ্ট্রে। দাবার বোর্ড ছেড়ে ইউরোপে স্থায়ী নিবাস গড়েছেন মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার লিজা। অলিম্পিকের বৃত্তি নিয়ে ফ্রান্সে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন সাঁতারু আরিফুল ইসলাম। তবে প্রশিক্ষণের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ফ্রান্সে থেকে যান তিনি। ২০০২ সালে ওয়ার্ল্ড কাপ শুটিংয়ে অংশ নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরেননি দুই শুটার আফজাল ও রুবেল।

প্রবাসে বসত গড়া খেলোয়াড়দের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের দেশ ছাড়ার অন্যতম কারণ দেশের অনিশ্চিত জীবন থেকে নিস্তার পাওয়া। ফুটবলার-ক্রিকেটারদের তারপরও কিছু আয়-রোজগার হয়, যা অন্য খেলায় একেবারেই নেই। তাই তো অন্য খেলার ক্রীড়াবিদ, সংগঠক, কোচদের বিভিন্ন গেমস থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বারবার কলঙ্কিত হয়েছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন। পালিয়ে গিয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করলেও নিজেদের ভবিষ্যৎটা তো নিশ্চিত করে ফেলেছেন তারা।

সাবেক তারকা ফুটবলার শেখ মোহাম্মদ আসলাম খোঁজার চেষ্টা করেছেন প্রবাসজীবন বেছে নেওয়ার কারণ, ‘হয়তো তারা মনে করেন দেশ সেভাবে নিশ্চয়তা দিতে পারবে না তাদের। তাছাড়া ফুটবলাঙ্গনের কথা যদি বলি, বর্তমানে কয়জন ফুটবলার ভালো পারিশ্রমিক পাচ্ছে বলেন! সংখ্যাটা একেবারেই নগণ্য। বাকিদের অবস্থা বড্ড নাজুক। ফুটবল খেলে যখন জীবিকা নির্বাহ করাই কঠিন হয়ে পড়ে, তখন পরিবারের কথা ভেবে হতাশা থেকেই অনেকে একসময় বেছে নেয় প্রবাসজীবন। প্রবাসে সম্মান থাকুক আর না থাকুক, কোনোমতে টিকে তো যাওয়া যায়।’

খেলোয়াড়ি জীবনে আসলাম নিজেও পেয়েছিলেন জার্মানিতে নিবাস গড়ার প্রস্তাব। তবে দেশের মায়া ছাড়তে পারেননি তিনি, ‘আমার নিজেরও জার্মানির হামবুর্গে খেলার আর থাকার প্রস্তাব এসেছিল। তবে সে সময় আমি ছিলাম আবাহনীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। তাছাড়া আমার আম্মাও চাননি আমি বিদেশে চলে যাই। আমার বাবা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাই এই দেশটাকে ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছেও জন্মায়নি কখনো।’ ফুটবলের বাইরের অন্য খেলার অনেকে অবৈধভাবে দেশ ছাড়াটা একেবারেই সমর্থন করেন না আসলাম, ‘সুযোগ সন্ধানী কিছু লোক থাকে তারা পালিয়ে গিয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। তাদের বোঝা উচিত দেশের পতাকার প্রতিনিধিত্ব করতেই তারা বিদেশ খেলতে যায়। এভাবে পালিয়ে যাওয়া মোটেই ঠিক নয়।’

খেলাকে পুঁজি করে দেশের সম্মান নষ্ট করে অবৈধপথে প্রবাসজীবন বেছে নেওয়াকে সমর্থন করবেন না অনেকেই। তবে দেশের জন্য ঘাম ঝরানোর প্রতিদান যখন ক্রীড়াবিদরা পান না, তখন দীর্ঘশ্বাস সঙ্গী করে অনেকে বেছে নেন প্রবাসের কঠিন জীবন। যে জীবনে নেই তারকাখ্যাতি। আছে শুধুই কঠিন বাস্তবতা আর সুন্দর ভবিষ্যতের হাতছানি।