অভিজ্ঞতায় উতরে গেল আর্জেন্টিনা

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০২:১১ এএম

‘আর্জেন্টাইন হওয়ার মানেই হলো ধুঁকতে থাকা, ভুগতে থাকা।’

কেপ ভার্দের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই শেষে সংবাদ সম্মেলনে কথাটি যখন বলছিলেন আলবিসেলেস্তে কোচ লিওনেল স্কালোনি, তখন তার কণ্ঠে স্বস্তির চেয়েও বেশি ছিল এক চরম বাস্তবতার স্বীকারোক্তি।

মায়ামির তীব্র গরম আর প্রতিপক্ষের অতিমানবীয় প্রতিরোধের মুখে পড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা যেভাবে নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচে (রাউন্ড অব ৩২) জয় ছিনিয়ে এনেছে, তাকে ফুটবলীয় দক্ষতার চেয়ে ‘অভিজ্ঞতার জয়’ বলাই শ্রেয়। ৩-২ ব্যবধানের এই রুদ্ধশ্বাস জয় আর্জেন্টিনাকে শেষ ষোলোর টিকিট এনে দিয়েছে সত্যি, কিন্তু একই সঙ্গে বড় এক সতর্কবার্তাও দিয়ে গেছে। আগামী মঙ্গলবার আটলান্টায় অপেক্ষমাণ মিশরের বিপক্ষে যদি এই পারফরম্যান্সেরই পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ওখানেই থমকে যেতে পারে।

ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার খেলায় সেই চেনা গতি আর ধার ছিল না। গ্রুপপর্বের খাপছাড়া ভাবটা এই ম্যাচেও স্পষ্ট ছিল। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরো রক্ষণ থেকে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করলেও মিডফিল্ডে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ছিলেন বড্ড ধীরগতির। লিভারপুলের এ তারকা গতি বাড়ানোর চেয়ে পজিশন ধরে রাখতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন, যার ফলে মাঝমাঠের সেই চেনা সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়।

ম্যাচের ২৯তম মিনিটে এক জাদুকরী মুহূর্তে ডেডলক ভাঙেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। লিসান্দ্রোর বাড়ানো নিখুঁত লং বল বাঁ পায়ের অসাধারণ টাচে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কেপ ভার্দে গোলরক্ষক ভোজিনহার মাথার ওপর দিয়ে চিপ করেন ৩৯ বছর বয়সী এ ফুটবল জাদুকর। এটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ২০তম এবং চলতি আসরের সপ্তম গোল। কিন্তু এই গোলের পরও আর্জেন্টিনা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দে হাই-প্রেস করতে শুরু করলে এলোমেলো হয়ে পড়ে স্কালোনির রক্ষণ। এনজো ফার্নান্দেজের ট্র্যাকিং ব্যাকের অভাব এবং লিসান্দ্রোর ধীরগতির সুযোগ নিয়ে ডেরয় দুয়ার্তে দারুণ এক শটে ম্যাচে সমতা ফেরান (১-১) ।

নির্ধারিত সময়ে ৪০ বছর বয়সী আফ্রিকান গোলরক্ষক ভোজিনহা মেসির তিনটি নিশ্চিত সুযোগ নসাৎ করে দিলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই লিসান্দ্রো মার্তিনেজ বক্সে বল পেয়ে স্ট্রাইকারের মতো জোরালো শটে দলকে এগিয়ে নেন (২-২)। কিন্তু নাটকের তখনো বাকি ছিল। বেনফিকায় নিকোলাস ওতামেন্দির ক্লাব সতীর্থ সিডনি লোপেস কাব্রাল বাঁ পায়ের অবিশ্বাস্য এক বাঁকানো শটে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়ালে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো স্টেডিয়াম।

যখন মায়ামির গ্যালারিতে পেনাল্টি শুটআউটের শঙ্কা জাগছে, ঠিক তখনই আবারও ত্রাতা হয়ে আসেন মেসি। তার নিখুঁত কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলে মাথা ছুঁইয়ে জয়সূচক গোলটি করেন ‘কুটি’ রোমেরো।

ম্যাচশেষে নিজের এবং দলের পারফরম্যান্স নিয়ে চরম ক্ষোভ ও আত্মসমালোচনা লুকিয়ে রাখেননি অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ম্যাচের কৌশলগত ত্রুটিগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা ম্যাচের সবচেয়ে কঠিন কাজটা প্রথমে করেছিলাম প্রথম গোলটি পাওয়া। ভেবেছিলাম এরপর শান্ত হয়ে নিজেদের ছন্দে খেলব, কিন্তু হয়েছে ঠিক উল্টোটা। আমরা বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি, দলগত লাইনের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি ছিল। যার ফলে ডিফেন্সিভ পিভট থেকে সেন্ট্রাল ব্যাকরা ওপরে উঠে প্রেস করতে বড্ড বেশি সময় নিচ্ছিল। ওরা মাঠে একজন বাড়তি খেলোয়াড়ের সুবিধা পাচ্ছিল।’

তবে ম্যাচে সেট-পিস থেকে দুটি গোল পাওয়াকে বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন মেসি। পাশাপাশি নাম দেখে কোনো দলকে ছোট করার মানসিকতার বিরুদ্ধে সতীর্থদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ আমাদের এটাই শেখাচ্ছে যে এখানে প্রতিটি দলই সমানে সমান। আমরা সবসময় প্রতিপক্ষের নাম দেখে তাদের খাটো করে ফেলি, কিন্তু এই ম্যাচ প্রমাণ করেছে কিছুই সহজ নয়।’

যারা ভেবেছিলেন বিশ্বকাপ ড্রর পর আর্জেন্টিনার পথটা সহজ হবে, তাদের উদ্দেশ্য করেই যেন ম্যাচশেষে তোপ দাগলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি বলেন, ‘যারা বলেছিল আমাদের ড্র সহজ হয়েছে, এই ম্যাচ তাদের জন্য উত্তর। সবাই ভেবেছিল এটা পার্কের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো সহজ হবে, কিন্তু আমরা জানতাম লড়াইটা কতটা কঠিন।’

দলকে অতিমাত্রায় মেসির ওপর নির্ভরশীল দেখানোর প্রশ্নে স্কালোনি ডিফেন্সিভ মোড নিলেও মাঠের চিত্র বলছে ভিন্নকথা। দলের প্রতিটি আক্রমণই আবর্তিত হয়েছে ৩৯ বছরের মেসির পা ধরে। স্কালোনি যোগ করেন, ‘কেপ ভার্দে তাদের ২০০ শতাংশ দিয়ে খেলেছে। তবে এ জার্সির একটা আলাদা শক্তি আছে। ছেলেরা বুটে হৃদয় ঢেলে খেলেছে।’

ম্যাচ জয়ের আনন্দের চেয়েও আর্জেন্টিনার থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বড় উদ্বেগের কারণ এখন খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা। মায়ামির তীব্র গরম আর ১২০ মিনিটের ক্লান্তিকর লড়াইয়ে ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার প্রায় প্রতিটি খেলোয়াড়কে মাঠে ক্র্যাম্পের (পেশির টান) শিকার হতে দেখা গেছে। জুলিয়ান আলভারেজ, লিসান্দ্রো, কুটি রোমেরো, এনজো, নিকো গঞ্জালেস, মেদিনা ও ডি পল সবাই ম্যাচ শেষ করেছেন সম্পূর্ণ নিঃশেষিত হয়ে।

বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে যেখানে বিশ্রামের সময় খুবই কম, সেখানে এই মাত্রার শারীরিক ও মানসিক ধকল পরের ম্যাচে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। স্কালোনির হয়তো আরও আগে বেঞ্চের খেলোয়াড়দের নামিয়ে দলকে অক্সিজেন দেওয়া উচিত ছিল, যা তিনি করেননি।

মায়ামির গ্যালারিতে নীল-সাদা জার্সি উড়িয়ে সমর্থকরা হয়তো উৎসব করছেন, কিন্তু আলবিসেলেস্তেরা ভালো করেই জানে পরবর্তী রাউন্ডে ভুল শুধরে গতি না বাড়ালে, পরের সতর্কতাটাই হতে পারে এই বিশ্বকাপে তাদের শেষ যাত্রা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত