জুলাই হত্যা মামলায় হ-য-ব-র-ল

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০২:১৩ এএম

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত নিয়ে চলছে তুঘলকি কাণ্ড। গণহারে আসামি করা, মিথ্যা অভিযোগ, মামলা বাণিজ্য, বাদী-বিবাদীর পরিচয় জটিলতাসহ নানামুখী জটিলতায় দিশেহারা পুলিশ। তদন্তে নেমে দেখা যাচ্ছে অনেক মামলার বাদী আসামিদের নাম-পরিচয় পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারছেন না। আবার মৃত ব্যক্তিসহ ঘটনাস্থলের ত্রি-সীমানাতেও না থাকা অসংখ্য ব্যক্তির নাম রয়েছে এজাহারে। মামলার আসামি করা নিয়ে ‘বিপুল বাণিজ্যের’ অভিযোগও জোরদার হচ্ছে। থানার পাশাপাশি পুলিশের কয়েকটি ইউনিট এসব মামলার তদন্ত করছে। একজন তদন্তকারী কর্মকর্তার কাঁধে গড়ে ১০টিরও বেশি মামলা দায়িত্ব থাকায় হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এর মধ্যে দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশ তৈরি হয়েছে দিশেহারা অবস্থা।

ইতিমধ্যে মিথ্যা মামলা করায় ১০২ জন বাদীর বিরুদ্ধে উল্টো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে এসব মামলার অভিযোগের কোনো ভিত্তিই নেই। এমনকি জীবিতকে মৃত দেখিয়ে মামলা করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। অনেক মামলার বাদী ও আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের গুলিতে সাড়ে ৮০০-এর মতো মানুষ প্রাণ হারান বলে সরকারি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে। এসব ঘটনায় সারাদেশে ৮০০-এর মতো হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত তদন্ত শেষ হয়েছে ৩৫৪টির। আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে ১১৫টি মামলার। বাকি মামলার তদন্ত কবে শেষ হবে সে ব্যাপারে কিছুই বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, ঘটনার প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ মামলা এবং পুলিশের কাঠামোগত দুর্বলতায় অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ওপর বহুমুখী চাপ, রাজনৈতিক তদবিরও তৈরি করছে বাড়তি জটিলতা।

৬৪ শতাংশ মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ নেই : আদালতে দায়েরের পর পিবিআইর কাছে পাঠানো ২৭২টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলোর মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশের ক্ষেত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ১৪২টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর আদালতে তা নিষ্পত্তি হয়েছে। মাত্র ৯০টি মামলার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পিবিআইর কাছে আসা মামলাগুলোর মধ্যে মিথ্যা মামলার সংখ্যা ১৪টির মতো। বাদীর অসহযোগিতা ও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব রয়েছে তিনটিতে। অন্যদিকে থানা থেকে পিবিআইর কাছে আসা ৭৭টি মামলার মধ্যে ৩৭টিই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ৪০টির তদন্ত চলমান। ঢালাও আসামি থাকায় এসব মামলার সুরাহা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এ ধরনের মামলা নিয়ে প্রচণ্ড হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঢালাওভাবে প্রতিটি মামলায় শত শত ব্যক্তিকে আসামি করায় জটিলতায় পড়ছে তদন্ত। বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামিদের ধরতে সারা দেশে অভিযান চলছে। এসব অভিযানে নিরপরাধ লোকজনও গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকারও হচ্ছেন। অনেক জায়গায় আসামি ধরার নামে গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগের কারণে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ছে পুলিশ।

আসামির নাম-ঠিকানা জানতেই দুই বছর : ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে গুলিতে নিহত হন ইমন হোসেন আকাশ। ওই বছরের ২৭ আগস্ট ৬৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০০-৬০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তার মা। নাম উল্লেখ করা আসামিদের ঠিকানা ও পরিচয় খুঁজতেই কেটে গেছে প্রায় দুই বছরের মতো। তদন্তে তাদের মধ্যে ৫৪৯ জনের বিরুদ্ধে দূরবর্তী কোনো সংশ্লিষ্টতাও মেলেনি। আবার বাদী ও সাক্ষীদের জবাববন্দিতে এসেছে দুই ধরনের তথ্য। এ ধরনের মামলার তদন্ত শেষ করে কবে অভিযোগপত্র দেওয়া যাবে সে ব্যাপারে তদন্তকারী সংস্থার কোনো ধারণা নেই।

বাদীর সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশ : অভিযোগ উঠেছে, এখনো নানাভাবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলা করার চেষ্টা চলছে। এমনকি টার্গেট করেও হয়রানিমূলক মামলা হচ্ছে। থানা পুলিশের বিরুদ্ধে বাদীর সঙ্গে যোগসাজশ করে বাণিজ্যের অভিযোগ উঠছে। বিএনপি নেতাকে আওয়ামী লীগ নেতা বানিয়ে মামলা করার মতো ঘটনাও ঘটছে। চট্টগ্রামের বাকলিয়ার সাকিব হত্যায় যুবদল ও ছাত্রদলের ১৫ নেতাকর্মীকে যুবলীগ নেতা সাজিয়ে আসামি করা হয়েছে বলে স্থানীয় বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আনিস সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ তুলেছেন। পুলিশও বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেয়েছে। মামলাটি করেছিলেন সাকিবের মা ফিরোজা বেগম।

আবার সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের টার্গেট করেও অনেক মামলা হয়েছে। এসব মামলা থেকে রেহাই পেতে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন নিরপরাধ ব্যক্তিরা। পুলিশ সদর দপ্তর অবশ্য বলছে, কোনো মামলার তদন্তে পুলিশ ‘বেআইনি’ কিছু করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১০২ বাদীর বিরুদ্ধে ভুয়া মামলার অভিযোগ : আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় আল-আমিন নামে এক ব্যক্তির নিহত হওয়ার তথ্য দিয়ে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন তার স্ত্রী কুলসুম বেগম। তবে পুলিশের একটি সংস্থা তদন্ত করে নিশ্চিত হয়, আল-আমিন মারা যাননি। একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তির প্ররোচনায় কুলসুম বেগম মিথ্যা মামলাটি করেন। এ মামলার আসামিদের তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে অনেকের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন কুলসুম। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এখন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজধানীর উত্তরায় ছাত্র আন্দোলনের সময় মারা যান মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ নামে একজন গাড়িচালক। এ ঘটনায় আসাদুল্লাহর মা মামলা করেন। তবে পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে, যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা ঘটনার সময় সেখানে ছিলেন না। আসাদুল্লাহর স্ত্রী ফারজানা পুলিশকে জানিয়েছেন, মামলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

মৃত ব্যক্তিদের নাম এজাহারে : পুলিশ সদর দপ্তর ও সিআইডির উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েকটি মামলায় জীবিত ব্যক্তিকে শহীদ দেখিয়ে হত্যা মামলা করা হয়। এসব মামলার বাদীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করে একটি তদন্ত সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশির ভাগ মামলাই হয়েছে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করতে। ঘটনার সময় দেশের বাইরে থাকা অনেকের নামও আছে হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলায়। কোনো কোনো মামলায় মৃত ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বরিশালে একটি মামলার তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছি, সেখানে আওয়ামী লীগের ২৪৮ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলায় মৃত চার নেতাকর্মীর নামও আছে। মামলাটি করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আলোচিত সাবেক নেতা মারজুক আব্দুল্লাহ। এজাহারের ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর মারা যান ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি। ১৯৮ নম্বর আসামি আবুল ফারুক মারা যান ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর মারা যান ২২৫ নম্বর আসামি হাফিজুর রশিদ এবং একই বছরের ২৬ জুলাই মারা যান ১৯৫ নম্বর আসামি আলী হাওলাদার। এভাবেই মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হচ্ছে।’

মিথ্যা মামলার অজস্র প্রমাণ : পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের তদন্তে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট ঢাকার দোহার থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। তদন্তে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকার পরেও প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ীকে এতে আসামি করা হয়েছে। ওই ব্যবসায়ী ঢাকা থেকে গত ১০ বছরেও তার গ্রামের বাড়িতে যাননি। জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুর ছিলেন।

পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ মামলার বাদী শাজাহান মাঝি। আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি বলেছেন, আসামিদের অধিকাংশকেই চেনেন না। আওয়ামী লীগবিরোধী স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা যাদের নাম দিয়েছেন তাদেরই আসামি করা হয়েছে। এখন আর ওই বাদীকেও আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।’

তদন্তে পুলিশের নাভিশ্বাস : জুলাই হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন থানায় বহু মামলা হয়। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আসামি করা হয়েছে। তবে মামলার সংখ্যার তুলনায় তদন্তকারী কর্মকর্তার সংখ্যা সীমিত। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, থানাগুলোতে কর্মরত একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) বা পরিদর্শককে (ইন্সúেক্টর) গড়ে ১০ থেকে ১২টি পর্যন্ত হত্যা মামলার তদন্ত করতে হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নেওয়াসহ নিবিড় কাজের প্রয়োজনের বেশি সময় লাগছে। তাছাড়া এজাহার থেকে নাম সরানোর তদবিরে জড়িয়ে পড়েছে একশ্রেণির দালাল চক্র। অপরাধী না হয়েও আসামি হওয়ায় অনেকে লাখ টাকা খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩-এ ধারা অনুযায়ী মামলার অভিযোগ থেকে আদালত কাউকে অব্যাহতি দিতে পারে। মিথ্যা মামলা করে কাউকে হয়রানি করলেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমার সময় প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলাম।’

 মামলা বাণিজ্য ও হয়রানির ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সব জায়গায়ই ভালোমন্দ মিলেই আছে। আমরা কেউ ফেরেশতা না। তবে স্পেসিফিক্যালি পুলিশের লোক জড়িত থাকলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যথাসম্ভব শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বিষয়টি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্র-আন্দোলনের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরপরাধ কেউ যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন সেদিকে আমরা খেয়াল রাখছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত