আজ বিশ্ব মশা দিবস

করপোরেশনের ব্যর্থতায় এডিসে কাবু দেশ

ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে সরকার। অবৈজ্ঞানিক পন্থায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কারণে এমন অবস্থার তৈরি হয়েছে বলে অভিমত কীটতত্ত্ব¡বিদদের। এ ছাড়া মশানিধনে সিটি করপোরেশনগুলো চরমভাবে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। বলা চলে এ কারণেই এডিস মশার কাছে কাবু হয়ে পড়েছে দেশ।

দেশের সর্বত্র ডেঙ্গু রোগীর খবর পাওয়া যাচ্ছে। আর ঢাকার সর্বত্র এখন এডিস মশার প্রজননের এক বড় উৎস তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত এডিস মশার কামড়ে প্রতিদিন অনেকে অসুস্থ ও মৃত্যুবরণ করছে। সরকারি হিসাব বলছে, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪৪৬ জন এবং আক্রান্ত হয়েছে ৯৭ হাজার ৮৬০।  এ অবস্থার মধ্যে আজ ২০ আগস্ট সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মশা দিবস। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচিত ১২৬ জন সাধারণ কাউন্সিলর রয়েছেন। পাশাপাশি ৪২ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর। এই ১৬৮ জন কাউন্সিলর সক্রিয় হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই মশার উৎসস্থলগুলো ধ্বংস করা সম্ভব। দুয়েক জন ছাড়া কেউই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আন্তরিকভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করেননি। তাদের নিষ্ক্রিতায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, মশক নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন দায়ী ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশ দায়ী অন্যান্য সেবা সংস্থা ও নগরবাসী। আদতে সিটি করপোরেশন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখে না। এমনকি এটা যে তাদের একটা দায়িত্ব, সেটাও তারা আমলে নিতে চাইছে না।

জানা যায়, ভারতীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্যার রোনাল্ড রস ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট প্রথম প্রমাণ করেন একমাত্র স্টúি মশা মানুষের দেহে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়ায়। এদের মধ্যে কিছু ক্ষতিকারক স্টúি মশা মানুষের রক্ত পান করে পুষ্টিপ্রক্রিয়া সাধন করে। তখনই মানুষের দেহে মারাত্মক জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। রোনাল্ড রসের (১৮৫৭-১৯৩২) প্রতি সম্মান জানাতেই যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন ১৯৩০ সালে দিবসটি পালন শুরু করেছিল। এই আবিষ্কারের জন্য পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান রোনাল্ড রস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বে মশক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা দিন দিন বাড়তে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে কখনো সরকার ও সিটি করপোরেশন মশক দিবস উপলক্ষে কোনো কর্মসূচি পালন করেনি। এবারও কোনো কর্মসূচি নেই। শুধু শনিবার কয়েকজন কীটতত্ত্ববিদ সিরডাপ মিলনায়তনে একটি সংবাদ সম্মেলন করে মশা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেছেন।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আবু ফয়েজ মো. আসলাম বলেন, ‘মশানিধনে আমরা কীটতত্ত্ববিদরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনেক ধরনের পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। বিটিআইয়ের চেয়ে আরও কার্যকরী কীটনাশক রয়েছে; যাতে মশা দ্রুত মরে। আজ বিটিআই আমদানি নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করলে এমন পরিস্থিতি হতো না; বিশেষ করে যারা মশা নিয়ে গবেষণা করছে, তাদের পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ করা উচিত। মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো সেসব থোড়াই কেরায় করছে।

কীটতত্ত্ববিদ ড. জি এম সাইফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে অবৈজ্ঞানিক পন্থায় কাজ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হলেও তাতে কর্ণপাত করছে না তারা। এতে করে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এডিস মশার কাছে কাবু হয়ে পড়েছে দেশ। ডেঙ্গুতে প্রতিদিনের মৃত্যু ও আক্রান্ত ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে।

এ প্রসঙ্গে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আবহাওয়া ও জলবায়ুগত বিষয় বিবেচনায় রেখে নতুন ওষুধ ও কর্মকৌশল নির্ধারণের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে সামছুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এডিস মশার প্রজনন বেশি হচ্ছে। এ জন্য নগরবাসীকেও এগিয়ে আসতে হবে।’