আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) একটি নতুন প্রতিবেদনে সৌদি আরবের সীমান্তরক্ষীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের সীমান্তে গণহারে অভিবাসীদের হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি সীমান্তরক্ষীরা শত শত মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে; যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের ভেতর দিয়ে সৌদি আরবে গিয়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। ‘তারা বৃষ্টির মতো আমাদের ওপর গুলি চালিয়েছে’ শিরোনামে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের পর্বত-সঙ্কুল উত্তর সীমান্তে সৌদি পুলিশ এবং সৈন্যরা অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করে গুলি চালিয়েছে।
সৌদি আরব অবশ্য অভিবাসীদের পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্য দিকে বিশ্লেষকরাও বলছেন, হুতি বিদ্রোহীদের দমনে ইয়েমেন সীমান্তে এমনিতেই কড়া পাহাড়া দেয় সৌদির সীমান্তরক্ষীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হুতিদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে গুলি চালাতে বাধ্য হয় তারা। সে সময় হয়তো অবৈধভাবে সৌদিতে প্রবেশ করতে গুলির মুখে পড়েন অভিবাসীরা।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, তাদের পথ চলার সময় অনেকেই কারাভোগ করেন এবং মারধরের শিকার হন। সমুদ্র পারাপারও যথেষ্ট বিপজ্জনক। গত সপ্তাহে জিবুতির উপকূলে এক জাহাজডুবির ঘটনায় ২৪ জনেরও বেশি অভিবাসী নিখোঁজ হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
বিবিসি বলছে, ইয়েমেনের ভেতরে প্রধান অভিবাসী রুটগুলোর পথের দুপাশে ছড়ানো রয়েছে প্রাণ হারানো অভিবাসীদের বহু কবর। উত্তর ইয়েমেনের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে হুতি বিদ্রোহীরা। রাজধানী সানায় তাদের পরিচালিত একটি আটক কেন্দ্রে আগুন লেগে দুবছর আগে কয়েক ডজন অভিবাসীর মৃত্যু হয়। কিন্তু এইচআরডব্লিউর সর্বশেষ এই রিপোর্টে যেসব অন্যায়-অত্যাচারের বর্ণনা রয়েছে তার মাত্রা এবং প্রকৃতি একেবারেই ভিন্ন। ওই প্রতিবেদনের প্রধান লেখক নাদিয়া হার্ডম্যান বিবিসিকে বলেছেন, আমরা যেসব ঘটনা নথিভুক্ত করতে পেরেছি তা মূলত পাইকারি হত্যা। লোকেরা এমন সব জায়গার বর্ণনা করেছেন যেগুলো মূলত মৃত্যু উপত্যকার মতো শোনাচ্ছেÑ সমস্ত পাহাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু মৃতদেহ। প্রতিবেদনটিতে ২০২২ সালের মার্চ থেকে এ বছরের জুন মাস পর্যন্ত সময়কালকে তুলে ধরা হয়েছে। এতে আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে জড়িত ২৮টি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা এবং কাছ থেকে চালানো ১৪টি গোলাগুলির বিবরণ রয়েছে।
নাদিয়া হার্ডম্যান বলেন, আমি শত শত ছবি এবং ভিডিও দেখেছি যেগুলো আমাকে জীবিত অভিবাসীরা পাঠিয়েছেন। সেগুলোতে ভয়ংকর আঘাত এবং বিস্ফোরণের ক্ষত দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা সর্বনিম্ন ৬৫৫ জনের কথা বলছি, তবে এই সংখ্যা হাজার হাজার হতে পারে। আমরা বাস্তব প্রমাণ পেয়েছি যে এসব নিপীড়নের ঘটনা সংখ্যায় ব্যাপক এবং সুপরিকল্পিত, এবং এগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সমান।
ইয়েমেনের সীমান্তে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে সংঘটিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের রিপোর্টটি সম্পর্কে প্রথম জানা যায় গত অক্টোবর মাসে, রিয়াদ সরকারের কাছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পাঠানো একটি চিঠিতে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া কামানের গোলা এবং ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বড় মাপের নির্বিচার আন্তঃসীমান্ত হত্যাকাণ্ডের একটি পদ্ধতিগত প্যাটার্ন বলে মনে হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ ও প্রতিবেদন নিয়ে সৌদি আরবের সরকার বলছে, অভিযোগগুলোকে তারা গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডগুলো পরিকল্পিত কিংবা বড় মাত্রায় ছিল বলে জাতিসংঘ যেভাবে বর্ণনা করেছে, তারা সেটাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। তারা বলছে, ‘প্রাপ্ত সীমিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন করা হয়েছে। অভিযোগগুলো নিশ্চিত বা প্রমাণ করার মতো কোনো তথ্য বা প্রমাণ রাজ্য কর্র্তৃপক্ষ খুঁজে পায়নি।’