দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক জনগণকে পেনশনের আওতায় আনার উদ্দেশ্যে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। ১৭ আগস্ট এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এই স্কিমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রবাসীদের স্কিমের নাম ‘প্রবাস’। তবে এই স্কিমের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে, উঠেছে নানা প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আয়ের ভারসাম্য ও প্রবাসকালীন স্কিম বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য বলছে, প্রবাস স্কিমের মাসিক চাঁদার হার ধরা হয়েছে ৫ হাজার, সাড়ে ৭ হাজার ও ১০ হাজার টাকা করে। এই তিন পরিমাণের যেকোনো পরিমাণ চাঁদা দিয়ে স্কিমে যুক্ত হওয়া যাবে। একজন প্রবাসী ১৮ বছর বয়সে এ স্কিমে যুক্ত হয়ে ৪২ বছর ধরে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিলে ৬০ বছর বয়স পর তিনি সরকারি তহবিলে মোট ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকার চাঁদা দেবেন। এরপর ৬০ বছর থেকে ন্যূনতম ৭৫ বছর পর্যন্ত মাসিক ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫৫ টাকা করে পাবেন। ফলে তার মোট পাওয়া পেনশনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬ কোটি ২০ লাখ ৩৭ হাজার ৯০০ টাকা, যা মোট চাঁদার প্রায় ১২ দশমিক ৩১ গুণ। একই স্কিমে যোগ দিয়ে কেউ ৪২ বছর ধরে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিলে তিনি ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে ১ লাখ ৭২ হাজার ৩২৭ টাকা পেনশন পাবেন। আবার একই মেয়াদে প্রতি মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা চাঁদা দিলে প্রবাসীরা মাসিক ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৯১ টাকা করে আজীবন পেনশন পাবেন। তবে যদি কেউ এই স্কিমের আওতায় সর্বনি¤œ ১০ বছর ধরে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা দেন, তাহলে তিনি মোট জমা দেবেন ৬ লাখ টাকা। বিনিময়ে ৬০ বছর বয়সের পর থেকে তিনি প্রতি মাসে ৭ হাজার ৬৫১ টাকা করে মোট ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ১৮০ কোটি টাকার পেনশন পাবেন। এ ক্ষেত্রে মোট চাঁদার তুলনায় ২ দশমিক ৩০ গুণ বেশি পেনশন পাওয়া যাবে।
সৌদি আরবপ্রবাসী আবৃত্তিশিল্পী বাছির দুলাল বলেন, ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাংলাদেশ সরকারের একটি অসাধারণ উদ্যোগ। উন্নত দেশগুলোতে এ রকম স্কিম চালু রয়েছে। আমাদের দেশে প্রথমবারের মতো এই সেবা চালু হচ্ছে। যেহেতু এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এখানে মানুষের সেবায় ও কার্যক্রমে যেন ত্রুটি না হয় তা সরকারের কাছে আশা করছি।’
লক্ষ্মীপুরের বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়নের আবদুস সাত্তার ৭ বছর থেকে সৌদি আরবে বসবাস করছেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি দেশের একাধিক ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে প্রায় ১০ লাখ টাকা জমা রেখেছেন। পেনশন স্কিম নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সরকারের ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তাদের আয় সব সময় সমান থাকে না। এ জন্য প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা জমা দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন। এ ছাড়া প্রবাসকালীনও নির্দিষ্ট করা থাকে না। অধিকাংশ সময়ে প্রবাসীরা দেশে ফেরার পর আয় বন্ধ হয়ে যায়। ওই স্কিম চালানো দুরূহ হয়ে যায়। পাশাপাশি টাকারও দরকার হয়। ব্যাংকে টাকা রাখলে আমি তো যেকোনো সময় টাকা ওঠাতে পারব। কিন্তু স্কিমের টাকা ওঠাতে জটিলতা তৈরি হবে কি না? যদি টাকা ফেরত পেতে জটিলতায় না পড়তে হয় তাহলে অনেক প্রবাসীই এই স্কিমে যুক্ত হব।’
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাসার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রবাসীদের অনেকের চাকরি এবং আয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকে না। এ ক্ষেত্রে তারা ওই পেনশন স্কিমের কিস্তি সচল রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এমন পরিস্থিতিতে কী হবে তা এখনো উল্লেখ করা হয়নি। পেনশন স্কিম চালু হলে বলা যাবে তা কতটুকু কার্যকর করা যাচ্ছে। তবে যদি কার্যকর করা যায় তাহলে সাধারণ প্রবাসীরা উপকৃত হবেন।
প্রবাস স্কিম বাস্তবায়ন বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তকে বলেন, এই স্কিম যদি বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে প্রবাসীরা বিনিয়োগের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য জায়গা পাবেন। কিন্তু পেনশনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য সরকার কাদের দায়িত্ব দেবে, তা-ও দেখতে হবে। যদি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাছে এই দায়িত্ব না দেওয়া হয় তাহলে এই অর্থ সরকারের বাজেট বাস্তবায়নে খরচ হবে। এ ক্ষেত্রে ১০-২০ বছর পর কোনো সরকার ক্ষমতায় থাকবে বা তারা এই অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা মনোযোগী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। আবার এসব অর্থের দিকে কোনো সুবিধাভোগীর চোখ পড়বে কি না বা পড়লে সেটি ঠেকাতে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, তা-ও দেখতে হবে। কারণ একটি মহল দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের তাদের পেনশনের অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ওই সময় এটি সমাধানে কী ব্যবস্থা হবে, তাও স্পষ্ট করতে হবে সরকারকে। তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা বিদেশে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করার সুযোগ থাকে। সে ক্ষেত্রে দেশের সরকারি কাজে যে ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সেটিতে তারা পড়তে চাইবেন না। এ ছাড়া পেনশন স্কিমে একজন প্রবাসী কয়েক বছর অর্থ দিয়ে দেশে ফিরে আসার পর তার জমা দেওয়া অর্থের কী হবে তার ব্যাখ্যা নেই। সাধারণত প্রবাসীরা দেশে ফিরলে ৫-১০ হাজার টাকার স্কিমের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা হারান। এ ক্ষেত্রে তারা এই প্রশ্নের সঠিক জবাব না পেলে এ স্কিমে বিনিয়োগ করবেন না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (নিয়ন্ত্রণ) বিলকিস জাহান রিমি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো প্রবাসী যদি দেশে ফিরে আসেন, তাহলে তিনি আবেদনের মাধ্যমে অন্য স্কিমে চলে যেতে পারবেন; অর্থাৎ তিনি প্রবাস স্কিমে আগে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করতেন। এখন আয় কমে যাওয়ায় তিনি সুরক্ষা স্কিমে গিয়ে ১ হাজার টাকা পরিশোধ করবেন। নির্দিষ্ট সময় পর তিনি যেই পরিমাণ অর্থ জমা দিয়েছেন তার ওপর মুনাফা পাবেন।
পেনশন স্কিমের টাকায় কোথায় বিনিয়োগ করা হবে এবং এই টাকা বাজেট বাস্তবায়নে চলে যাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষের টাকা বাজেট বাস্তবায়নে যাওয়ার সুযোগ নেই। মানুষ যে টাকা জমা দেবেন, সেগুলো সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের অধীনে আসবে। এরপর সেই অর্থ আমরা প্রাথমিকভাবে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করব। এরপর ভবিষ্যতে সময় অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
পেনশনে অর্থ উত্তোলনে মানুষ হয়রানির স্বীকার হবে কি না জানতে চাইলে এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশনে আগে যেসব অভিযোগ ছিল, সেগুলো এখন অনেকটাই কমে গেছে। আর ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সর্বজনীন পেনশন বাস্তবায়ন হবে বিধায় এখানে মানুষের ইন্টারভেনশন কম থাকবে। সুতরাং দীর্ঘসূত্রতার যেই চিন্তা করা হচ্ছে, তা হওয়ার আশঙ্কা নেই। কারও স্কিমের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই অটোমেটিকভাবে তার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়া শুরু হবে।