যোগ্য জনশক্তির কর্মবণ্টনে রাসুলের নির্দেশনা

একজন মুমিনের দায়িত্ব কী? জবাব, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার সব উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু যে অস্বীকার করেছে, সে ছাড়া। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! কে অস্বীকার করবে? হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যে আমার আনুগত্য করল; সে জান্নাতে যাবে আর যে আমার অবাধ্য হলো সে অস্বীকার করল।’ সহিহ বোখারি

সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে অনুসরণীয় আদর্শ। মহান আল্লাহ তার কাছে হজরত জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে পবিত্র কোরআন পাঠিয়েছেন। কোরআন মজিদের আলোকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দিকনিদের্শনার আদর্শ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর গোটা জীবন। তিনি আদর্শ শুধু প্রচারই করেননি, বাস্তবায়ন করেও দেখিয়েছেন।

সময়ের পরিবর্তনে মানুষের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু জীবন-জীবিকার এবং মৌলিক জীবনধারণ প্রক্রিয়ার এমন কিছু দিক আছে, যা কোনোকালেই পরিবর্তন হবে না। যেমন মানুষের নানাবিধ কর্ম ও অন্যান্য জীবনধারণমূলক প্রাত্যহিক কার্যাদি। এসবেও অনুসরণ করতে নবীর আদর্শের, নবীর শিক্ষার।

বর্তমানে দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে নানা সেক্টরে নন-টেকনিক্যাল ও অযোগ্য লোককে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। আর অযোগ্যদের দায়িত্ব পাওয়ার কারণ হিসেবে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাবকে দায়ী করা হয়। অযোগ্যদের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে যোগ্যতার মূল্যায়ন হয় না, সেই সঙ্গে কাজটিও যথাযথভাবে আর হয়ে উঠে না।

একটি পরিবার, সমাজ, সংগঠন ও দেশের জনশক্তিদের যোগ্যতা বুঝে সঠিক কাজে লাগানোর ওপর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভরশীল এ কথা নিয়ে বিতর্ক নেই। এ কর্মবণ্টনে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত পদ্ধতিই সর্বশ্রেষ্ঠ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কর্মবণ্টন পদ্ধতি আলোচনা করলে দেখা যায়, যোগ্যতা ও সামর্থ্যরে ভিত্তিতেই তিনি তা নির্ধারণ করেছিলেন। তার জীবনের নানা দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে সাংগঠনিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ক্ষেত্রে সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি ছিল সুষ্ঠু কর্মবণ্টন। এটাই ইসলামের অনুসৃত পথ। যেখানে স্বজনপ্রীতি কিংবা মুখ চিনে, গোত্র ও সম্পর্ক ইত্যাদি দেখে দায়িত্ব দেওয়ার কোনো নজির নেই। কারণ এগুলো সমাজ ও জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

স্বজনপ্রীতি মানে নিজের মানুষের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা, নিজের দলের লোককে অগ্রাধিকার দেওয়া। গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি ও দায়িত্ব নিজের আত্মীয় এবং আদর্শের মানুষকে দেওয়া। বর্তমানে এটা অনেকটা রীতিতে পরিণত হয়েছে। যদিও স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা ইসলামের অন্যতম একটি অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বিষয়। কিন্তু আলোচ্য দলপ্রীতি ও স্বজনতোষণ অত্যন্ত ন্যক্কারজনক কাজ। এটা এমন একটা দুরারোগ্য ব্যধি, যার কারণে সমাজ থেকে ইনসাফ নির্বাসিত হয়ে যায়। ইসলাম এটাকে প্রতিরোধ করার শিক্ষা দিয়ে কোরআন মজিদে ঘোষণা করেছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হোক বা বিত্তহীন হোক আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। কাজেই তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হইয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল বা পাশ কাটিয়ে যাও তবে তোমরা যা করো আল্লাহ তো তার সম্যক খবর রাখেন।’ সুরা নিসা : ১৩৫

কোরআন মজিদের এই আদেশ মামুলি কোনো বিষয় নয়। স্বজনপ্রীতি প্রতিরোধে এটি একটি মহানিয়ামক। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) সূত্রে বর্ণিত। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি স্বজনপ্রীতির প্রতি লোকদের ডাকে, নিজেও স্বজনপ্রীতি করতে গিয়ে যুদ্ধ করে এবং স্বজনপ্রীতির সমর্থনে মারা যায়, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়।’ সুনানে আবু দাউদ : ৫১২১

উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, কোনো মুসলমান স্বজনপ্রীতি করতে পারে না। নিজের দলীয় লোকজন, পরিচিতজন বা আপনজনকে যোগ্যদের ওপর প্রাধান্য দিতে পারে না। ইসলামের শিক্ষা হলো, যেকোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া। কারণ, অযোগ্য লোকের হাত ধরে কাজটি সূচারুরূপে সম্পাদিত হওয়া তো দূরের কথা, বরং তা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে নানাবিধ স্বার্থের কারণে এই নীতিকে পদদলিত করা হচ্ছে। আত্মীয়তার টান, আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার লোভ বা দলীয় স্বার্থে অযোগ্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। হাদিসে আছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘অযোগ্য ব্যক্তির হাতে যখন দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে, তখনই কেয়ামতের জন্য অপেক্ষা করো।’ সহিহ বোখারি : ৬৪৯৬

মানুষের অভ্যাস হলো, নিজের লোকজন কোনো বড় অন্যায় করলেও তা চোখে পড়ে না। ধরা পড়লেও তেমন অপরাধ মনে হয় না। তাই এর বিচারও হয় না। কিন্তু অন্য কেউ ছোটখাটো অন্যায় করলেও তা অনেক বড় মনে হয়। তার বিচার করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়। এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বস্তুর প্রতি ভালোবাসা তোমাকে বিবেচনাহীন করে দিতে পারে।’ অর্থাৎ যে যাকে ভালোবাসে, সে তার দোষ দেখতে পায় না। সুনানে আবু দাউদ : ৫১৩০

নবী করিম কখনো কোনো অযোগ্যকে কোনো পদে বসাননি। হজরত আবু জর (রা.) একবার নবী করিম (সা.)-এর কাছে প্রাদেশিক গভর্নর হওয়ার আবেদন জানান। নবী করিম (সা.) হাত দিয়ে তার বুকে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে বললেন, ‘আবু জর! তুমি দুর্বল, আর এটি মানুষের আমানত। কেয়ামতের দিন এটি (দায়িত্বভার) মানুষের লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ হবে। হ্যাঁ, দায়িত্বটা যে ভালোভাবে গ্রহণ করবে এবং অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।’ সহিহ মুসলিম

ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘পদের আকাক্সক্ষা থেকে বেঁচে থাকার জন্য এটি অনেক বড় মূলনীতি। বিশেষত দায়িত্ব আদায়ে যাদের দুর্বলতা আছে, তাদের জন্য এখানে রয়েছে অনেক শিক্ষা।’ এ জন্য দায়িত্বশীল মহলের এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। দায়িত্ব প্রদান আমানতের বিষয়। এ বিষয়ে অবহেলা করলে খেয়ানতের অপরাধে অভিযুক্ত হতে হবে। এ ছাড়া এ নীতি পালন না করার ক্ষতি বহন করতে হবে সবাইকে।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক

muftianaet@gmail.com