দেশে ডেঙ্গুতে আরও একজন চিকিৎসক মারা গেছেন। ডা. বায়েজিদ আহমেদ নামে এই চিকিৎসক গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি এই কলেজের পঞ্চম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।
হাসপাতাল পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, ডা. বায়েজিদ আহমেদ রাজধানীর জাপান বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তাকে সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেখান থেকে গত মঙ্গলবার রাতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আইসিইউতে আনা হয়। সেখানে তার মৃত্যু হয়। তিনি ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
এ নিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে পাঁচ চিকিৎসক ও একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী মারা গেলেন। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া পাঁচ চিকিৎসক হলেন ডা. এম আরিফুর রহমান, ডা. শরীফা বিনতে আজিজ, ডা. আলমিনা দেওয়ান মিশু, ডা. ফাতেমা-তুজ-জোহরা রওনক ও ডা. বায়েজিদ আহমেদ এবং একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী হলেন সৈয়দা সাদিয়া ইয়াসমিন রাইসা।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ২ হাজার ২০১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে এ বছর রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৩০ জনে। এ সময় ডেঙ্গুতে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ বছর মারা গেল ৫১৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, নতুন রোগীদের মধ্যে ৯২৬ জন ঢাকায় এবং ১ হাজার ২৭৫ জন ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭ হাজার ৯৪২ রোগী ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৩ হাজার ৭৬৩ জন ও ৪১৭৯ জন ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার।
মারা গেলেন পাঁচ চিকিৎসক, এক মেডিকেল শিক্ষার্থী : ডা. বায়েজিদ আহমেদকে নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন পাঁচ চিকিৎসক। তাদের মধ্যে মাত্র ২৭ বছর বয়সী ডা. শরীফা বিনতে আজিজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১১ আগস্ট ভোর ৫টার দিকে মারা যান। তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছিলেন এবং মৃত্যুর সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজে এফসিপিএস পার্ট-২ করছিলেন। ডা. শরীফা দোহার উপজেলার লটাখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল আজিজের একমাত্র মেয়ে। এক ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়।
এর ঠিক তিন দিন আগে গত ৭ আগস্ট রাত ১টা ১৫ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ৪৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. আলমিনা দেওয়ান মিশু। তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইসিএমএইচ) গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগে রেসিডেন্ট (৩৯ ব্যাচ) হিসেবে অধ্যয়নরত ছিলেন।
এই চিকিৎসকের মৃত্যুর ব্যাপারে আইসিএমএইচের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ মান্নান জানান, ডা. মিশু সেখানে এমএস কোর্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। আসছে জানুয়ারিতে তার চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। জুনের পর থেকে বিএসএমএমইউতে পড়ালেখা করছিলেন তিনি, সেখানে তার প্লেসমেন্ট ছিল। গত ২৪ জুলাই তার জ্বর আসে, ডেঙ্গু ধরা পড়লে প্রথমে বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। অবস্থা খারাপ হলে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে এভারকেয়ার থেকে তার পরিবারকে জানানো হয় তিনি অলরেডি ব্রেইন ডেড। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে আসেন তার পরিবারের সদস্যরা। রাতে সেখানেই মারা যান।
১৫ মাসের সন্তান রেখে মারা গেছেন ডা. ফাতেমা-তুজ-জোহরা। গত ২২ জুলাই সন্ধ্যার দিকে সাভারের সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই চিকিৎসক রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ডা. রওনক ছিলেন সমাজভিত্তিক মেডিকেলের এমবিবিএস ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৩২ বছর। তিনি ১৫ মাস বয়সী একটি শিশু ছেলে রেখে গেছেন।
গত ২২ জুন ভোর সাড়ে ৫টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ডা. এম আরিফুর রহমান। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) কর্মরত ছিলেন। ডা. এম আরিফুর রহমান বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের ৩৯তম ব্যাচের কর্মকর্তা জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক মেডিকেল অফিসার ছিলেন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন ডা. আরিফুর রহমান। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনে এমডি ফেইজ-এ-তে অধ্যয়নরত ছিলেন।
ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী মারা গেছেন। রাজধানীর ধানম-িতে অবস্থিত আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী সৈয়দা সাদিয়া ইয়াসমিন রাইসা গত ২৫ জুলাই সকালে আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি এমবিবিএস শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।