প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলনরত মাঠের বিরোধী দল বিএনপি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে কি না জানতে চেয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইস। জবাবে আওয়ামী লীগ তাকে জানিয়েছে, দলটি আশাবাদী যে, নির্বাচনে আসবে আন্দোলনরত বিএনপি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইসের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের। সেই বৈঠকে এই আলোচনা হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৪টায় গুলশান-২ নম্বরে গোয়েন লুইসের বাসভবনে হওয়া বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। অন্য সদস্যরা হলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান, আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ এবং কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
বৈঠক শেষ হয় বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশে একটি অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় বলে জানিয়েছেন গোয়েন লুইস। এ বিষয়ে তারাও একমত বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কি না গোয়েন লুইসের এই প্রশ্নে বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেছেন, ‘আমরা আশাবাদী বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে।’
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়েছে, সরকার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো সাহায্য চাইলে তারা সেটা দিতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার আগ্রহের কথাও জাতিসংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ জানায়, দলটি বলেছে বাংলাদেশ পরিপক্ব গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে নির্বাচন নিয়ে অনেকগুলো শক্তিশালী আইন রয়েছে। সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে। তাই এখানে নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না আওয়ামী লীগ। এটা দলটির অবস্থান। আর সরকার তো এ ধরনের সহযোগিতা কখনো তাদের (জাতিসংঘ) কাছ থেকে চায়নি। বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে বলা হয়েছে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারলে তারা খুশি হবে। সরকার চাইলে তারা যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে রাজি আছে। তবে সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কিছুই তারা করবে না বলে জানিয়েছে।’
বৈঠকে উপস্থিত থাকা ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতা জানান, জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। নির্বাচন নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে তারা বলেছেন, বিএনপি আলোচনায় আগ্রহী নয়। তাদের ২০১৪ সালে সংলাপের জন্য ডাকা হয়েছিল, কিন্তু সেটা তারা নাকচ করেছিল। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে দুবার সংলাপ করা হলেও ভোটের দিন দুপুর ১২টায় তারা ভোট বর্জন করে।
বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের অন্য এক নেতা বলেন, জাতিসংঘ প্রতিনিধির সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়ও আলোচনায় উঠে এসেছে। সেখানে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইস ছাড়াও আরও দুজন উপস্থিত ছিলেন।
অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চায় জাতিসংঘ : কাদের বৈঠক শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে চায় বলে আওয়ামী লীগকে জানিয়েছেন গোয়েন লুইস। একটা নির্বাচন বাংলাদেশে হোক এটাই তারা (জাতিসংঘ) চায়। বিরোধীরা যে শর্তগুলোর কথা বলছে তা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। তারা (জাতিসংঘ) বলেছে এটা তোমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, এটা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, তারা (জাতিসংঘ) বলেছে, বাংলাদেশে একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখলে তাদের ভালো লাগবে। মূলত তারা এ বিষয়টিই বলেছে।
বিরোধী দল (বিএনপি) প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, সংসদের বিলুপ্তি, তত্ত্বাবধায়কের যে দাবিতে জোর দিচ্ছে সেসব বিষয়ে জাতিসংঘের কোনো বক্তব্য ও মাথাব্যথা নেই বলে দাবি করেছেন ওবায়দুল কাদের।
কাদের বলেন, ‘আমরা আমাদের সেই ইচ্ছেটা বলেছি যে, আমরা একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন করতে চাই। যেটা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হবে। বিএনপির মতো বড় দল নির্বাচনে আসুক সেটাও চায় আওয়ামী লীগ।’
তিনি বলেন, ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য আমরা জোরাজুরি করতে পারি না। নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের (বিএনপি) অধিকার। এটা কোনো দলের জন্য সুযোগ নয়। এটা কারও দয়ার দান নয়। তারা বাংলাদেশের বড় দল হিসেবে এটা তাদের নৈতিক অধিকার। সেটা তারা প্রয়োগ করবে। এটা আমরা আশা করি।’