মাছের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য

আমাদের প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৬০ ভাগ পাই মাছ থেকে। বাংলাদেশে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এই সময় প্রাকৃতিক জলাশয়, পুকুর ও দিঘিতে প্রচুর পানি থাকে। মাছ ডিম পাড়ে। মাছের পোনা বড় হয়। বাজারেও পাওয়া যায় প্রচুর ছোট মাছ। এ কারণে ভাদ্র-আশ্বিনে সাধারণত  চাষের বড় মাছের দাম কম থাকে। বিলম্বিত বর্ষা ও স্বল্প বৃষ্টিপাতের কারণে এ বছর ভাদ্র মাসেও বাজারে ছোট মাছের সরবরাহ কম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় দাম একটু বেশি।

ডিম ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাছের দাম বাড়ার কারণে বাজারে বাড়ছে ডিমের দাম। মাছের খামারিদের কথা খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ খরচ এবং শ্রমিকের বাড়তি মজুরির জন্য মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু খামারিরা যে হারে দাম বাড়িয়েছেন, সে তুলনায় উচ্চ হারে দাম বাড়িয়ে মাছের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে অতিলোভী মধ্যস্বত্বভোগীরা।

বাংলাদেশে মাছের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী হলো আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী। ধান, চাল, ফলমূল ও শাকসবজি বিপণনে পাইকারি ব্যবসায়ীদের বড় ভূমিকা থাকলেও বিদ্যমান মাছের বাজার ব্যবস্থাপনায় পাইকারি ব্যবসায়ীদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। খামারি বা মাছ চাষির কাছ থেকে সরাসরি আড়তদার মাছ কিনে পুকুর থেকে ধরে নিয়ে আসেন। আড়তদার সেই মাছ খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। আড়তদারদের সমিতি আছে। তারা খুব সংগঠিত। সংগঠনের নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে কোনো আড়তদার মাছ বিক্রি করতে পারেন না। খুচরা ব্যবসায়ীরাও কম সংগঠিত নন। তাদেরও সমিতি আছে। আছে মাছের দৈনিক নির্ধারিত দাম।

গরিবের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৩ সালে সারা দেশ মিলিয়ে পাঙ্গাশের প্রতি কেজির দাম ছিল ১১৪ টাকা। ২০২১ সালে এই দর ছিল ১১১ টাকা। খামারি পর্যায়ে মাছ চাষিরা যে দামে মাছ বিক্রি করেন, তার চেয়ে কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দামে মাছ বিক্রি হচ্ছে খুচরা পর্যায়ে। সম্প্রতি (২৫.৮.২৩) ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে মাঝারি ও বড় সাইজের প্রতিকেজি তেলাপিয়া ২০০ টাকা এবং পাঙ্গাশ প্রতিকেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের রুই মাছের দাম ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা, দুই-আড়াই কেজি ওজনের দাম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি। তিন থেকে চার কেজি ওজনের কাতলা মাছ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খামারি পর্যায়ে মাঝারি ও বড় সাইজের তেলাপিয়া প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ  ফিশ ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, মাছের খাবারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ বিল ও মজুরি খরচ বৃদ্ধির কারণে মূলত মাছের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তবে চাষিপর্যায়ে যে হারে দাম বেড়েছে, মধ্যস্বত্বভোগীরা তার চেয়ে অনেক বেশি দামে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করছেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভোক্তা। মাছ চাষ করে একজন চাষি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা লাভ করতে পারছেন না, অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা একদিনের ব্যবধানে কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা লাভ করছেন। এককেজি ওজনের রুই মাছ তৈরি করতে সাধারণত প্রায় এক বছর সময় লাগে। বর্তমানে চাষি পর্যায়ে এক কেজি ওজনের রুই মাছের দাম ২২০ টাকা। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে সেই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবেই এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। চাষিবান্ধব ও ভোক্তাবান্ধব বাজার দরকার। তা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমত এবং ভোক্তারাও কম দামে প্রাণিজ আমিষের স্বাদ কিছুটা হলেও উপভোগ করতে পারতেন।

এবার গতবারের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ইলিশের দামও বেশি। গত বছর এই সময়ে ৫০০ গ্রাম ও ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে যথাক্রমে ৮০০ ও ১২০০ টাকা কেজি দামে। বর্তমানে ময়মনসিংহ মহানগরের বিভিন্ন মাছের বাজারে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১২০০ টাকা এবং ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। ইলিশের মূল্যবৃদ্ধিও চাষের মাছের মূল্যবৃদ্ধিকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে বললে ভুল হবে না। 

ত্রিশাল উপজেলার হদ্দের ভিটা গ্রামের খামারি মো. লিটন মিঞার মোট ১৫টি পুকুর আছে।  পাঙ্গাশ ছাড়াও তিনি সেখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া মাছের চাষ করেন।  সপ্তাহ অন্তর পাইকাররা তার পুকুর থেকে মাছ ধরে নিয়ে যান। মাঝারি সাইজের প্রতিকেজি রুই ও কাতলা ৩০০ থেকে ৩২০, তেলাপিয়া ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা এবং পাঙ্গাশ ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করেন। আর ওই মাছই উপজেলার বিভিন্ন বাজারে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দামে খুচরা বিক্রি করা হয়। উপজেলার চকপাঁচপাড়া গ্রামের মাছচাষি মাহবুবুর রহমান জানান, তিনি প্রতি বছর ২.৫ একর জমিতে পাঙ্গাশ ও বাংলা মাছের মিশ্র চাষ করেন। তার মতে, মাছের দাম বাড়ার প্রধান কারণগুলো হলো খাবার, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি।  এছাড়া মাছ চাষের আন্যান্য উপকরণ যেমন চুন ও ওষুদের দামও বেড়েছে প্রচুর। এককেজি মাছে খামারিদের লাভ হয় ১৫ থেকে ২০ টাকা। আর মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভ হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে খামারে মাছচাষি আর বাজারে ঠগছেন ভোক্তা সাধারণ।

মাছের খাদ্য তৈরির উপকরণ সয়ামিল, ভুট্টা, গম/আটা, খইল, শুঁটকি মাছ, কুড়া প্রভৃতির দাম গত এক বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রচুর। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার একজন বিশিষ্ট মাছের খাদ্য ব্যবসায়ীর মতে, মাত্র এক বছর আগে যে সয়াবিন মিলের দাম ছিল ৩৫ টাকা, বর্তমানে তার দাম হয়েছে ৪৮ টাকা। অনুরূপভাবে ৩৫ টাকার খইল হয়েছে ৪৭ টাকা, ৩০ টাকার আটার দাম হয়েছে ৪০ টাকা, ২৫ টাকা কেজির ভুট্টার দাম হয়েছে ৩২ টাকা, ৮০ টাকা কেজির শুঁটকির দাম হয়েছে ১৫০ টাকা, ২০ টাকা কেজি চালের কুড়ার দাম হয়েছে ৩০ টাকা। অপরদিকে ২৫ টাকা কেজির সাধারণ ব্যবসায়ীদের তৈরি ডুবন্ত খোলা খাদ্যের দাম বেড়ে  দাঁড়িয়েছে ৪৬ টাকা। বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি প্রতি কেজি ডুবন্ত খাবারের যে দাম ছিল ৩৬ টাকা, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৪৪ টাকা কেজি দরে। দেশে জনপ্রতি মাছের দৈনিক চাহিদা ৬০ গ্রাম।  জনপ্রতি মাছের বার্ষিক চাহিদা ২১.৯০ কেজি। জনপ্রতি বার্ষিক মাছ গ্রহণ ২৩ কেজি। মাছের বার্ষিক চাহিদা ৪৫.৫২ লাখ মেট্রিক টন। দেশে অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদন ৪৬ লাখ ২১ হাজার টন। সে হিসেবে মাছের দাম এতটা তো বাড়ার কথা নয়।

দেশ এখন মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশে^ প্রথম (৫.১৯ লাখ টন), তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশে^ ৪র্থ (প্রায় ৫ লাখ টন), অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়সহ মাছ উৎপাদনে বিশে^ বাংলাদেশ ৩য়, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে ৪র্থ এবং জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে ৫ম। এটা জাতির জন্য বিশাল গৌরব ও অহংকারের বিষয় হলেও নিম্ন আয়ের গরিব মানুষের জন্য তা কোনো সুফল বয়ে আনছে না। দেশের নিম্ন আয়ের গরিব মানুষ যাতে মাছের স্বাদ ভোগ করতে পারে, দিনে অন্তত একবার মাছ খেতে পারে সে ব্যাপারে সরকারকেই কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাত থেকে বাঁচতে হবে ভোক্তা ও খামারিদের।

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাসে কিছু সুপারিশ

১. প্রতিটি পৌরসভা ও মহানগরে কৃষক বাজারের মতো আধুনিক মৎস্য বাজার স্থাপন করতে হবে, যেখানে প্রকৃত মাছচাষিরা তাদের খামারে উৎপাদিত মাছ সংরক্ষণ করে বিক্রি করতে পারবেন। এতে খামারি বা মাছচাষি ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তাও মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাত থেকে রক্ষা পাবেন।

২. রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর মতো এলাকায় আগোরা, স্বপ্নের মতো সুপার শপগুলো সংযোগ চাষির মাধ্যমে উত্তম মাছচাষ নীতি অনুসরণ পূর্বক মাছ উৎপাদন ও সংগ্রহ করে তা ভোক্তার কাছে সরাসরি বিক্রি করতে পারে। এতে মাছচাষি এবং ভোক্তা উভয়ই উপকৃত হবেন।

৩. করোনাকালের মতো অনলাইনে মাছের ব্যবসা চালু হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া ব্যবসা কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হবে।

৪. প্রত্যেক আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীকে মাছের ক্রয়মূল্য সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। বিক্রয়মূল্যের চার্ট দোকানে টানিয়ে রাখতে হবে এবং ক্রেতাকে বিক্রিকৃত মাছের রসিদ দিতে হবে।

৫. এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে দেশের সর্বত্র মৎস্য সমবায় বিক্রয় সমিতি গঠন করতে হবে।

৬. নিয়মিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নেতৃত্বে মাছের বাজার মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

netairoy18@gmail.com