বিবৃতি ভিক্ষা করছেন ইউনূস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যে নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারে সেটাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে জনগণ ভালো পরিবেশে ভোট দিয়েছে, ভবিষ্যতে ভালোভাবে ভোট দিতে পারবে। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো চাপ নেই। জনগণ যাকে ভোট দেবে তারাই ক্ষমতায় আসবে।

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলা শ্রম আদালতের মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শতাধিক নোবলজয়ীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তির পাঠানো চিঠি প্রসঙ্গেও কথা বলেন শেখ হাসিনা। ড. ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, নিজের প্রতি এত আত্মবিশ্বাস থাকলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিবৃতি ভিক্ষা করে বেড়ান কেন? তাদের বিবৃতি না দিয়ে বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলিল-দস্তাবেজ, কাগজপত্র ঘেঁটে দেখুন অন্যায় আছে কি না। এক্সপার্টরা দেখুক, অনেক কিছু পাবেন। সদ্য সমাপ্ত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের নতুন সদস্যপদ না পাওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনার স্পষ্ট বক্তব্য, এখনই ব্রিকসের সদস্যপদ পেতে হবে সেই ধরনের কোনো চিন্তা ছিল না। সদস্যপদ পেতে সেই ধরনের চেষ্টাও করা হয়নি।

দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়াসহ কোন কোন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, কার কার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সফরের অর্জন কী এসব নিয়ে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এরপরই সাংবাদিকদের জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। এ সময় তিনি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সিন্ডিকেটের ভূমিকা ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্নের জবাব দেন।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন : অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অংশগ্রহণ বলতে কাদের অংশগ্রহণ? যারা দুর্নীতিবাজ, খুনি, ভোট চোর, ভোট ডাকাত, গ্রেনেড হামলাকারী, জাতির পিতার হত্যাকারী, যুদ্ধাপরাধী তাদের অশংগ্রহণ? এটা কি জনগণ চায়? তারা অংশগ্রহণ করলেই নির্বাচন বৈধ হবে, অন্য কেউ করলে হবে না, এটা তো হতে পারে না। কারণ তাদের প্রতি রয়েছে মানুষের ঘৃণা।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘এটা মাথায় রাখতে হবে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৩০টি সিট পেয়েছিল। তারপর থেকে বিএনপি তো ইলেকশন করে না। তারা শুধু বাণিজ্য করে, নমিনেশন বেচে। কিছু টাকা গুলশান অফিস পাবে, পুরানা পল্টন পাবে আর মোটা অঙ্কের টাকা যাবে লন্ডনে। এই তো তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিজেরাই নির্বাচনে গণ্ডগোল করবে, মারামারি করবে আর বলবে ইলেকশন করতে পারলাম না। বর্জন করলাম।’

বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে যখন গেলাম, যার সঙ্গে দেখা হয়েছে বলে, কী করে বাংলাদেশ এত উন্নতি করল? আর দেশের এরা এটা বলে না। তারা পরশ্রীকাতরতায় ভোগে। আমি ওটা নিয়ে চিন্তা করি না। যতক্ষণ আছি, দেশের জন্য কাজ করে যাব।’

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশের বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। সবকিছুই আইনমতো চলে। কেউ যদি ট্যাক্স না দেয় আর যদি শ্রমিকের অর্থ আত্মসাৎ করে, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যদি মামলা করা হয়... আমাদের কি সেখানে হাত আছে, যে মামলা বন্ধ করে দেব? মামলা তো আমরা করিনি। এনবিআর থেকে আয়কর ফাঁকির মামলা করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত লেবাররা মামলা করেছেন।’

সরকারপ্রধান বলেন, দুর্নীতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান করতে বলেছেন, কিন্তু দুর্নীতিবাজ পছন্দের লোক হলে আবার এগুলো নিয়ে কথা আসছে কেন? আইন তো তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

নোবেলজয়ী বলে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এমন প্রশ্ন রেখে শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীতে এমন বহু নোবেল বিজয়ী আছেন, পরবর্তী সময়ে তাদের কাজের জন্য কারাগারে আছেন (যেতে হয়েছে)।

বিবৃতির ফলে আদালত প্রভাবিত হবে কি না, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, পারবে না কেন? আদালত স্বাধীনভাবে চলবে। ভয় পেলে চলবে না। শ্রমিকদের পাওনা তাদের দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘এখন যদি জিজ্ঞেস করি, গ্রামীণ ব্যাংক কিন্তু সরকারি (নিয়মে চলে)। ড. ইউনূস তার এমডি। তাহলে সরকারি বেতনভুক একজন এমডি কীভাবে বিদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন? কীভাবে তিনি এগুলো করেন?’

প্রসঙ্গত, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলা শ্রম আদালতের মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়ে সোমবার প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন শতাধিক নোবলজয়ীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

ব্রিকস সদস্যপদ : ব্রিকসের সদস্যপদ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন, সদস্যপদ চাইলে পাব না সেই অবস্থাটা নেই। প্রত্যেকটা কাজের একটা নিয়ম থাকে। আমরা সেই নিয়ম মেনেই চলি। আমরা কাউকে বলতে যাইনি আমাদের এখনই সদস্য করেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেখানে তো আমার সব রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধানের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট, ইন্ডিয়ার প্রাইম মিনিস্টার থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে। লাঞ্চের সময় ব্রাজিল ও সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের মহাসচিব আমার পাশে ছিলেন। ওই সময় আলোচনা হয় যে, আমরা এই কয়জন নেব। এরপর ধাপে ধাপে সদস্যপদ বাড়াবে।’

তিনি বলেন, ‘এর আগে আমার দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো, আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন ব্রিকস সম্মেলন করবেন। আমাকে আসতে বললেন এবং তখন আমাকে এও বললেন, তারা কিছু সদস্যপদ বাড়াবেন। সেই বিষয়ে আমার মতামতও জানতে চাইলেন। আমি বললাম এটা খুবই ভালো হবে।’

ব্রিকসের ব্যাংক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশ আগে থেকেই আগ্রহী ছিল বলে উল্লেখ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

ব্রিকস নিয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘জানি যে এই প্রশ্নটা আসবে। বাংলাদেশ কিছু চেয়ে পাবে না, এটা কিন্তু ঠিক নয়। অন্তত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমরা তো দেশের মর্যাদাটা তুলে ধরেছি। সেখানে আমাদের সেই সুযোগটা আছে। তারা বলতে পারে কারণ বিএনপির আমলে ওটাই ছিল। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের কোনো অবস্থানই ছিল না। সেই সময় বাংলাদেশ মানে ছিল দুর্ভিক্ষের দেশ, ঝড়ের দেশ, ভিক্ষার দেশ। হাত পেতে চলার দেশ। এখন সবাই জানে, বাংলাদেশ ভিক্ষা চাওয়ার দেশ নয়।’

এ সফরের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে গেছে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বর্তমান স্যাংশন ও কাউন্টার স্যাংশনের এ যুগে এই সফরের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণসহ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক দক্ষিণের অবস্থানকারী দেশগুলোর ওপর আরোপিত কৃত্রিম সিদ্ধান্ত এবং বিভাজনের নীতিকে না বলার এখন উপযুক্ত সময়। সর্বজনীন নিয়ম ও মূল্যবোধকে অস্ত্রে পরিণত করার প্রচেষ্টাকে আমাদের অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমাদের নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার চক্র বন্ধ করতে হবে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর আরোপিত কৃত্রিম সিদ্ধান্তের কারণে আমরা আর ক্ষতিগ্রস্ত হতে রাজি নই। সর্বজনীন নিয়মের নামে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অসমনীতিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য আমি দক্ষিণের দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছি।’

বাজারের সিন্ডিকেট : দেশে সিন্ডিকেট করে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কে কত বড় শক্তিশালী আমি দেখব। সিন্ডিকেট ভাঙা যাবে না এটা কোনো কথা নয়। সিন্ডিকেট ভাঙা যাবে না এমন কিছু বাণিজ্যমন্ত্রী বললে তাকে আমি ধরব।’ এ সময় নিত্যপণ্যের সিন্ডিকেট প্রতিরোধে পণ্য সরবরাহ ও সংরক্ষণে বিকল্প পদ্ধতি নেওয়ার কথা জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে বাড়িতে শাকসবজি উৎপাদন ও সেগুলো নিজেরাই সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

দাম বাড়া প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেন, ‘কিছুদিন আগে ডিমের দাম বাড়ল। ডিম সেদ্ধ করে রেখে দিলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। পরে (দাম বাড়লে) সেগুলো ভর্তা করে বা রান্না করে খাওয়া যায়।’

সর্বজনীন পেনশন নিয়ে অপপ্রচার : সর্বজনীন পেনশন নিয়ে অপপ্রচার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের টাকা নিয়ে ইলেকশন ফান্ড গঠন করতে হবে আওয়ামী লীগ এত দীনতায় পড়েনি। সাধারণ মানুষ নিজের খেয়ে নৌকায় ভোট দেয়, এটাই হলো বাস্তবতা। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীরা পেনশন পান। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী বা সাধারণ মানুষ পেনশন পায় না। তাদের কথা চিন্তা করেই এটা করা হয়েছে। পেনশন স্কিমে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই স্কিমে এখন যে টাকা রাখবে পরবর্তীকালে নির্দিষ্ট বয়সসীমার পর সে টাকা পাবেন। অথবা মাঝখানে কেউ তুলে নিতে চাইলে সেটাও নিতে পারবে।

সবাই সবকিছু সহজে ভুলে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পেনশন স্কিমটি আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল, এখন সেটি বাস্তবায়ন করছি। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের জনকল্যাণমুখী কাজ। যারা পরশ্রীকাতর, সবসময় অন্যের দোষ খোঁজে, হতাশায় ভোগে, তারাই ভালো কাজের নেতিবাচক প্রচারণা চালায়।’ জনগণকে এসব মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।