ভোট নয় বিএনপি চায় ধ্বংস

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের ভোটাধিকার নস্যাতের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি আবারও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ওরা (বিএনপি) গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। ওরা ভোট করতে আসে না। ওরা ভোট পাবে না, ভোট চায় না। জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে আবারও তারা ছিনিমিনি খেলতে চায়। ওরা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে চায়।’

গতকাল শুক্রবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগ আয়োজিত ছাত্র সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগসহ সব সংগঠনের নেতাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাদের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘মনে করিয়ে দেবেন ওরা (বিএনপি) ভোট করতে আসে না। ভোট পায় না। ভোট চায় না। ভোট পাবে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওরা তো (বিএনপি) লুটেরা, সন্ত্রাস। মানুষের শান্তি কেড়ে নেয়। মানুষের সম্পদ ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়। লুটেরা সন্ত্রাস আর জঙ্গিতে বিশ্বাসী ওরা। ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাকারবারি। এরা কখনো মানুষের কল্যাণ করতে পারে না। কারণ তাদের জন্ম হয়েছে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীর হাতে। তারা গণতন্ত্রেও বিশ্বাস করে না। এখন তারা নাকি বলে গণতন্ত্র উদ্ধার করবে। যাদের জন্ম ক্যান্টনমেন্টে। যারা গণতন্ত্রে বিশ^াস করে না, ওরা নাকি গণতন্ত্র রক্ষা করবে। ক্ষমতা দখলকারীদের হাতে তৈরি ওই বিএনপি আর যুদ্ধাপরাধীরা এ দেশের কল্যাণ কখনো চাইতে পারে না। তারা দেশকে ধ্বংস করতে চায়।’

আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ আয়োজিত বিশাল এ ছাত্র সমাবেশে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে দেশের ছাত্রসমাজ সদা-সর্বদায় শেখ হাসিনার পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ বলে জানান তিনি। ছাত্রলীগ সভাপতি সমবেত ছাত্রদের ‘তারুণ্য লড়বে, তারুণ্য গড়বে’ এ শপথ পাঠ করান।

ছাত্র সমাবেশে পাঁচ লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ ঘটানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি। সারা দেশের সাংগঠনিক জেলা থেকে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন শর্ত দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন বয়সের মানুষ সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করে। দুপুর ১২টা থেকে সমাবেশস্থলের আশপাশে ছাত্র জমায়েত হতে শুরু করে। বেলা ৩টার পর আর কাউকে মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সবাই মাঠের চারপাশে মিছিলসহ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে রাখে অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের সরকারের উন্নয়নচিত্র সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুনসহ মেগা প্রজেক্টের ছবি সংবলিত টি-শার্ট পরা ছিল সমাবেশে আসা ছাত্র-যুবসমাজ। তাদের মুখে ছিল ‘আবারও শেখ হাসিনা’ স্লোগান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের প্রকাশনা মাতৃভূমির বিশেষ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন।

বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাকে স্বাগত জানান।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সমাবেশে বক্তৃতা করেন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

বিশাল ছাত্র সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

মহাসমাবেশে শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে জাতির পিতার আদর্শ অনুসরণ করে দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেদের বর্তমানকে উৎসর্গ করার জন্য এবং আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকার পক্ষে ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে বিজয়ী হওয়ার জন্য লাখো শিক্ষার্থী অঙ্গীকার করেন।

সমাবেশের শুরুতে জাতীয় সংগীত, ছাত্রলীগের থিম সং এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করা একটি গান গাওয়া হয় এবং এলইডি মনিটরে জাতির পিতাকে উৎসর্গ করা আরেকটি গানও প্রদর্শিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী তার ৫২ মিনিটের দীর্ঘ বক্তব্যে সরকারের উন্নয়নের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব উন্নয়ন অনেকের ভালোলাগে না। অনেকের কোনো কিছুই ভালো লাগে না। তারা দেখে না যে, দেশের উন্নতি হচ্ছে। তাদের চোখ অন্ধ। উন্নয়ন চোখে না দেখাদের পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আধুনিক চক্ষু ইনস্টিটিউট করে দিয়েছি। আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান আমি নিজে সেখানে চোখ দেখাতে যাই। ১০ টাকার টিকিট কাটলে সেখানে চোখ দেখানো যায়। তাদের বলব সেখানে গিয়ে চোখটা দেখিয়ে আসেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আসলে চোখ নয়, তাদের মনের দরজাই অন্ধকার। আর পরাজিত শক্তির পদলেহনকারী। সেজন্য মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন তারা দেখে না। হাওয়া ভবন খুলে খাওয়া খেতে পারছে না বলে তাদের যত দুঃখ।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কারণে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হয়েছিল উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বদনাম দিয়েছিলেন। কেন দিয়েছিলেন? একটি ব্যাংকের এমডি পদের জন্য। তিনি ১০ বছর বেআইনিভাবে ব্যাংকটি চালিয়ে আবারও সেখানে থাকতে হবে। সেই লোভে। বারবার আমাদের ওপর চাপ। একটি বড় দেশ বারবার চাপ দিত। কী বলত! এমডি পদে না রাখলে নাকি পদ্মা সেতুর টাকা বন্ধ করে দেবে। আমাদের বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে সেই ভদ্রলোক মামলাও করেছিল। কিন্তু আদালত তো তার বয়স কমাতে পারেনি। মামলায় হেরে যায়।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘হিলারি ক্লিনটন নিজে অর্ডার করে তখন বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যানকে দিয়ে পদ্মা সেতুর টাকা বন্ধ করেন। তখন বলেছিলাম নিজের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ করব। কারও কাছে হাত পেতে না। আমরা সেটা করেছি। করে বিশ্বকে দেখিয়েছি। বাংলাদেশ পারে। বাংলাদেশের মানুষ পারে। এরপর কিন্তু বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বদলে গেছে।’

সর্বজনীন পেনশন স্কিম নিয়ে বিএনপির সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছি। বিএনপির কিছু নেতা বলছেন এটা নাকি আমাদের নির্বাচনী ফান্ড তৈরি করার জন্য। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে। নিজেরা কিছু করতে পারেনি। মানুষকে কিছু দিতে পারেনি। মানুষের ভালোর জন্য যখন আমরা কিছু করি তখন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এ বিভ্রান্তিতে কেউ যেন কান না দেন। ছাত্রলীগকে বলব নিজের এলাকায় গিয়ে এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।’

ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়া ছাত্রদলকে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। বলেছিল ছাত্রদল আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট। আর আমি ছাত্রলীগকে দিয়েছিলাম খাতা আর কলম। বলেছিলাম পড়াশোনা করতে হবে। অশিক্ষিত মূর্খদের হাতে দেশ পড়লে তার অগ্রযাত্রা হতে পারে না।’

ছাত্রলীগের বিভিন্ন সময়কার সামাজিক কর্মকান্ডের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে ছাত্রলীগ কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিটি দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। গর্বে আমার বুক ভরে যায়। এভাবে তারা এগিয়ে গেলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ বন্ধ করতে পারবে না। আমরা চাই আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে।’

ছাত্রলীগের নেতাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘যেকোনো প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে সঠিক নেতৃত্ব দরকার। আশা করি ছাত্রলীগের নেতারা নিজেদের সেই নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে তুলবেন। যেখানে থাকবে সেখানে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দেবে সেটাই আমরা চাই।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েরা একচল্লিশের স্মার্ট বাংলাদেশের কান্ডারি হবে। সেটাই আমি চাই। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় আর কেউ বাধা দিতে পারবে না। অতন্দ্র প্রহরীর মতো ছাত্রলীগকে সবসময় সজাগ-সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বেশ কিছু দায়িত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘নিজের প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করবা, যেখানে থাকো সেটা পরিষ্কার রাখবা, এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখবা। পরিবেশ রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণ করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) ঘুণে ধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীয়করণ করতে চেয়েছিলেন। জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন, যাতে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে দেশ এগিয়ে যেতে পারে। তার সুফল কিন্তু মানুষ পেতে শুরু করেছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু জানুয়ারিতে ঘোষণা করলেন, দুর্ভাগ্য ওই বছরের আগস্ট মাসে তাকে হত্যা করা হলো। হত্যা করে আবার সেই বাংলাদেশে মিলিটারি ডিক্টেটর। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগ্রাম আমরা করেছি। জনগণের ক্ষমতা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করা হয়েছিল। আমরা জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি।’