দেশে চলমান বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে চলতি মাসে। এরই মধ্যে আজ শনিবার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশ উদ্বোধন হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিকেল সাড়ে ৩টায় বহুল প্রতীক্ষিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন করবেন। তবে পরদিন রবিবার থেকে বিমানবন্দর-ফার্মগেট অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এ ছাড়া আগামী কয়েক মাসে সরকারের আরও কয়েকটি মেগা প্রকল্পের মধ্যে পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশ, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রেল সংযোগ প্রকল্পসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধন হবে। আর এসব মেগা প্রকল্প সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগে গতি বাড়াবে বলে মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, এসব মেগা প্রকল্প উদ্বোধন হলে তা হবে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার গেম চেঞ্জার। এসব মেগা প্রকল্পগুলোর পুরোপুরি উদ্বোধন হলে দেশের মানুষ যানজট থেকে অনেকটাই রক্ষা পাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ মেগা প্রকল্পগুলো উদ্বোধনের পর দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। এখন সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকা লাগলেও মেগা প্রকল্পগুলোর সব চালু হলে খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মানুষ যাতায়াত করতে পারবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল হবে। দক্ষিণের রেল যোগাযোগ চালু হলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ত্রিমাত্রিক যুগে প্রবেশ করবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। তবে এর সুবিধা শুধু ওই এলাকার মানুষই নয়, পুরো দেশ পাবে। আর যখন ট্রেন চালু হবে তখন রেলপথে ঢাকা থেকে খুলনার দূরত্ব কমবে ২১২ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের যেকোনো জেলায় যাওয়া যাবে। আর মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে খুব সহজে যোগাযোগের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মো. যুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ছোট থেকে বড় হয়েছি মিরপুর এলাকায়। এই এলাকার নাম শুনলে মানুষ যানজটের জন্য ভয়ে আসতে চাইত না। এখন আগের থেকে অনেকটা কমেছে যানজট। তবে মেট্রোরেলের পুরো অংশ চালু হলে খুব সহজে মতিঝিল যেতে পারব।’ দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াতের যে স্বপ্ন ছিল, তা মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রায়হান নামে গাজীপুরের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যখন পুরোপুরি চালু হবে তখন সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী হব আমরা। আমাদের ব্যবসায়িক মালামাল রাজধানীর নিচের সড়ক ব্যবহার না করে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় খুব দ্রুত আনা-নেওয়া করা যাবে। তবে এখন যে অংশ চালু হবে সেটি দিয়েও রাজধানীতে দ্রুত যাতায়াতে আগের থেকে ভোগান্তি কমবে।’
এ বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যানজট নিরসনের জন্য সরকার নানা পরিকল্পনা নিয়েও সেভাবে কোনো পরিকল্পনাই তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। কিন্তু গত কয়েক বছরে সরকার যেসব মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেগুলো কিন্তু কেউ কখনো ভাবেনি। আর এগুলো অনেকটা স্বপ্নের প্রকল্প মনে হলেও বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে। এগুলো যোগাযোগের গেম চেঞ্জার হিসেবে পরিণত হতে যাচ্ছে। সব মেগা প্রকল্প উদ্বোধন হলে একদিকে যেমন যোগাযোগে গতি বাড়বে, তেমনি অন্যদিকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আসবে।’
রাজধানীর যানজট নিরসনসহ ভ্রমণে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে এ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘পুরো প্রকল্পটি শেষ হলে ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণ করিডরের সড়কপথের ধারণক্ষমতা বাড়াবে। এ ছাড়া প্রকল্পটি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হলে ঢাকা ইপিজেড ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের যোগাযোগ সহজতর হবে।’
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আকতার গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আগামীকাল (আজ) বিকেল সাড়ে ৩টায় শেরেবাংলা নগরের পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পরের দিন বিমানবন্দর-ফার্মগেট অংশটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার। বোর্ডিংয়ের জন্য ১৫টি র্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে বনানী ও মহাখালীতে দুটি র্যাম্প আপাতত বন্ধ থাকবে। এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার। থ্রি-হুইলার, সাইকেল এবং পথচারীদের এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। এ ছাড়া মোটরবাইকও এখনই চলতে পারবে না। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ হয়েছে।’