অনেকটা নীরবে চলে গেলেন কিংবদন্তি চিত্রগ্রাহক ও আলোকচিত্রী আফজাল এইচ চৌধুরী। গত ৩১ আগস্ট, বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউনাইটেড হাসপাতালে প্রায় ৯৩ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০), উভয় পাকিস্তানের প্রথম আংশিক রঙিন ছবি ‘গুলে বাঁকালি’ (১৯৬১), প্রথম জনন্দিত লো-কি সিনেমা ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩), প্রথম সম্পূর্ণ রঙিন ছবি ‘সঙ্গম’ (১৯৬৪), প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ (১৯৬৫) ও প্রথম ট্রিপল রোলের চলচ্চিত্র ‘জ¦লতে সুরুজ কে নিচে’ (১৯৭০)-এর চিত্রগ্রাহক ছিলেন তিনি। তৎকালীন পাকিস্তানের সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘আয়না’ চলচ্চিত্রও তারই সেলুলয়েডে আঁকা। এ ছাড়াও বাংলাদেশের অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি ক্যামেরায় যেন কথা বলেছেন। অথচ তারই মৃত্যুতে এ দেশের মিডিয়াগুলো কেন যেন একেবারেই নীরব! জীবিতকালেও তাকে যে খুব সম্মান দেওয়া হয়েছে এমন নয়। আফজাল চৌধুরীর সঙ্গে আমার খুব বেশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। তাকে একবারই দেখেছিলাম পাঠশালায়। সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি আয়োজিত সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেই সময় আফজাল চৌধুরী ও পাঠশালার অধ্যক্ষ ড. শহিদুল আলমের হাত থেকে সনদ গ্রহণ করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে জেনেছি, তিনি ছিলেন পাঠশালার প্রতিষ্ঠাকালীন উপদেষ্টা কমিটির সদস্য।
আফজাল এইচ চৌধুরী, যিনি এক কথায় সেলুলয়েড শিল্পী, তাকে নিয়ে তেমন চর্চা হয়নি। তুলে ধরা হয়নি তার সৃজনকর্ম, নতুন প্রজন্মের কাছে। ফলে অনেকটা অন্তরালেই থেকে যান এই শক্তিমান চিত্রগ্রাহক। অবশ্য নিজেও ছিলেন এক নিভৃতচারী মানুষ। কয়েক বছর আগে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর তার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেটি দেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। সামাজিক দুনিয়ায় সাক্ষাৎকারটি থেকে যাওয়ায় আফজাল চৌধুরী বিস্মৃতি হয়ে যাওয়া থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়ে যান।
হাইস্কুলে পড়ার সময় ফটোগ্রাফি শুরু করেন আফজাল চৌধুরী। পরবর্তী জীবনে জড়ান চলচ্চিত্রের সঙ্গে। তার জন্ম ১৯৩১ সালের ৩১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জে। পিতা হাজী আবদুল ওয়াহাব চৌধুরী রংপুরের মহিমাগঞ্জে কাঠের ব্যবসা করতেন। এক মাস ২২ দিন বয়সে মা আমেনা খাতুনকে হারান। ফলে তাকে মহিমাগঞ্জে মামির কাছে পাঠানো হয়। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তিনি সেখানে পড়াশোনা করেন। এরপর সিরাজগঞ্জের জ্ঞানদায়িনী স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ভর্তি হন বিএল হাইস্কুলে। ১৯৪৭ সালে সেখান থেকেই তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। ফলে তারাই ছিলেন কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের শেষ ব্যাচের শিক্ষার্থী।
একদিন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখলেন, কোডাক কোম্পানি ৬ টাকা ১২ আনায় বক্স ক্যামেরা বিক্রি করছে; সঙ্গে এক রোল ফিল্ম। বড় ভাইকে চিঠি লিখলেন, টাকা পাঠানোর জন্য। সেই টাকায় কিনলেন কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরা। সিরাজগঞ্জে তখন স্টুডিও ছিল। ওখানে গিয়ে শিখলেন, ফটোগ্রাফির টুকিটাকি। কিছু বইপত্র সংগ্রহ করলেন। ঢাকা থেকে কিনে আনলেন কেমিক্যাল। বাড়িতে ডার্করুম নেই। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, দরজা-জানালা বন্ধ করে লালবাতি জ¦ালিয়ে ডিশের মধ্যে নেগেটিভ ডেভেলপ করতেন। প্রথমে প্রিন্ট করতে জানতেন না। স্টুডিওতে নেগেটিভ নিয়ে গিয়ে প্রিন্টং করা শিখলেন। তখন কন্ট্রাক্ট প্রিন্টের একটা ফ্রেম পাওয়া যেত। তাতে নেগেটিভ রেখে ১৫ সেকেন্ড আলো ফেলে কন্টাক্ট প্রিন্ট করা যেত। কিন্তু ছবি বড় করবেন কেমন করে? এনলার্জারের তখন অনেক দাম। বাবার কাঠের দোকানে মিস্ত্রিরা কাজ করত। ওই কাঠ দিয়ে তিনি এনলার্জার বানিয়ে তাতে কনডেক্সার আর ক্যামেরার লেন্স লাগালেন। ছবি তোলা তখন তার নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। যখন ক্লাস টেনে পড়েন তখন কলকাতায় গিয়ে রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা ও ফ্ল্যাশগান কিনে আনেন।
১৯৪৮ সালে ঢাকা কলেজে পড়ার সময়ে ১৪ আগস্টে রাষ্ট্রীয় একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখলেন, প্রখ্যাত পরিচালক এ জে কারদার সিক্সটিন মিলিমিটার মুভি ক্যামেরায় ছবি তুলছেন। ওই দিনই তিনি মুভি ক্যামেরা শেখার সিদ্ধান্ত নেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর কয়েকজন বন্ধু মিলে হিচহাইকিংয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। তখন শামসুদ্দীন আবুল কালাম তাকে একটা ৮ মিলিমিটার ক্যামেরা দেন। ওই ক্যামেরায় তিনি চা বাগানের ওপর সাড়ে তিন মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি বানান। কিছু দিন পর মাইকেল টডের একটা ইউনিট ঢাকায় আসে। ইউনিটটি ঢাকা থেকে ট্রেনে করে সিলেটে যায়। তখন এফডিসির অপারেটিভ ডিরেকটর নাজির আহমেদ তাকে একটা ক্যামেরা ও ৩৫ মিলিমিটার চারশ ফিটের একটি রোল দিলেন স্যুট করার জন্য। পরে নাজির আহমেদ ওই রোলটা মাইকেল টড কোম্পানির কাছে পাঠান। কিছুদিন পর তারা আফজাল চৌধুরীর কাজের প্রশংসা করে নাজির আহমেদের কাছে একটা চিঠি পাঠায়। এরপর আফজাল চৌধুরী সিনেমাটোগ্রাফার হওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
’৫১ সালের শেষ দিকে বম্বে গিয়ে ওখানকার বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান সুধীন মজুমদারের স্টুডিওতে যোগ দেন। স্টুডিওতে ওই সময়ের টপ ক্যামেরাম্যান ফলি মিস্ত্রি ও জাল মিস্ত্রির কাছে কাজ শেখেন। দেড় বছর পর বাবার চিঠি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। বাড়িতে থাকলেন কিছুদিন। এক বন্ধু তাকে নিয়ে গেলেন ইউএসআইএসের পরিচালকের কাছে। পরিচালক সব শুনে বললেন, ‘কালই যোগদান করো।’ ইউএসআইএসে তাকে নিউজ ফটোগ্রাফি করতে হতো। দেড় বছর কাজ করার পর মনে হয়েছে, এটা তার কাজ না। ’৫৭ সালে তিনি করাচিতে গিয়ে ইস্ট্রার্ন ফিল্ম স্টুডিওতে চিফ অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। ওখানেই প্রথমে কালার ফিল্মে কিছু নৃত্য ও গানের চিত্রায়ণ করেন।
১৯৬০ সালে ‘আর ভি গাম হ্যায়’ চিত্রায়ণ করে। ছবিটা ওই সময় প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল। এরপর ডব্লিউ জেড আহমেদের সঙ্গে কাজ করেন করাচি ও লাহোরে। তখন লোকে জেনে গেছে আফজাল চৌধুরীর কালার ফিল্মে কাজ করেন। ’৬২ সালে জহির রায়হান অভিনেতা খান আতাকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে আফজাল চৌধুরীকে লাহোর থেকে দেশে নিয়ে আসেন। এরপর তিনি জহির রায়হানের বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করেন। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হানের পরিচালনায় আফজাল চৌধুরী ‘জ¦লতে সুরুজ কে নিচে’ নামে একটা ছবি বানান। চলচ্চিত্রে ফরিদা আক্তার পপির নাম ‘ববিতা’ রাখেন আফজাল চৌধুরীর স্ত্রী সুরাইয়া চৌধুরী।
শেষ জীবনে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন। দুই মেয়ে সীমা, সাদিয়া আর নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে তার ভালোই কাটছিল। ৬৫ বছর তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ চিত্রগ্রাহক তার শিষ্য। কী নির্মম বাস্তবতা, এ দেশে তার কোনো মূল্যায়নই হলো না!
লেখক : আলোকচিত্র সম্পাদক, দেশ রূপান্তর
shahadatparvezpix@gmail.com