উপাচার্য বা ভাইস চ্যান্সেলর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী পদ। কিন্তু আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৩টি। এর মধ্যে ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ৮৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি এবং ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেজারারের পদ শূন্য রয়েছে। আইনের বিধান মতে, ব্যয় ভাউচার, দেনা পরিশোধ, সব অর্থ লেনদেনে চ্যান্সেলর নিযুক্ত ট্রেজারারের সই থাকতে হবে। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈধ ট্রেজারার নেই। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে গতিশীলতা নিয়ে আসতে ও শিক্ষার মান বজায় রাখতে উপ-উপাচার্য থাকারও বিধান রয়েছে আইনে। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার ছাড়াই দিব্যি চলছে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এর অন্তর্নিহিত কারণ অনেকেরই অজানা। ভিসি ও ট্রেজারার না থাকলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মে সুবিধা হয়। যে কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ চ্যান্সেলর অনুমোদিত ভিসি নিয়োগে বিলম্ব করে দিনের পর দিন ভারপ্রাপ্ত ভিসি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার ট্রেজারার পদে ট্রাস্টি বোর্ড সদস্যদের আত্মীয়স্বজনই দিব্যি বসে আছেন। এ বিষয়ে রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘ভিসি-প্রোভিসি পেতে হয়রান’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলো ভিসি-প্রোভিসি-ট্রেজারার ছাড়াই কীভাবে বছরের পর বছর চলছে এবং বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হ্যাঁ-না খেলার কথাও চমৎকারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তখন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সে সময় ৪৮তম বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২১ পেশ করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) ক্ষমতা দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করে সংস্থাটি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি, প্রোভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগে ইউজিসির মতামত গ্রহণ এবং একটি নীতিমালা তৈরি করারও সুপারিশ করা হয়। এরপর সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক ও নিয়োগ-সংক্রান্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টদের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু সেই নির্দেশও অজানা কারণে কার্যকর হয়নি!
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য (ভিসি) পদ দীর্ঘদিন ধরেই শূন্য। গত বছর তারা তিনজনের একটি ভিসি প্যানেল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু গত বছরের ২৯ নভেম্বর সে ফাইলটি মন্ত্রণালয় থেকে ফিরে আসে। এরপর চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চিটাগংয়ের উপাচার্য নিয়োগের ফাইলটি ফেরত আসে। মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছিল, প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের মধ্যে অধ্যাপক ড. মো. জাহিদ হোসেন শরীফের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকায় তার পরিবর্তে বিকল্প প্রস্তাবসহ নতুন করে তিনজনের প্যানেল প্রস্তাব পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হলো। এখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির পদটি শূন্য রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের (ইউডা) প্রোভিসি নিয়োগের ফাইল ফেরত আসে এ বছরের ৯ এপ্রিল। গত বছরের ১০ নভেম্বর প্রাইম ইউনিভার্সিটির ট্রেজারার নিয়োগের ফাইল ফেরত আসে। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকায় গত বছরের ৯ নভেম্বর সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রেজারার নিয়োগের ফাইলও ফেরত আসে। মন্ত্রণালয় এই বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনরায় ট্রেজারার নিয়োগের প্যানেল পাঠানোর অনুরোধ করেছে। কিন্তু ১০ মাস পার হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেজারার নিয়োগ হয়নি। এখন প্রোভিসি পদটিও খালি রয়েছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং ট্রেজারার নিয়োগের কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা ও পদ্ধতি নেই। এমনকি ইউজিসি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার উৎকর্ষসহ উচ্চশিক্ষার সার্বিক তদারকির দায়িত্ব পালন করলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণিত তিনটি পদে (উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ইউজিসির কোনো ধরনের মতামত নেওয়া হয় না। তবে ইউজিসির মতামতের ভিত্তিতে দেশের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদদের মধ্য থেকে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকার একটি বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ ধরনের কমিটি থাকতে হয়। এর মধ্যে তিনটি কমিটির সভাপতি থাকেন ভিসি। তিনটি কমিটিতে ভিসি মনোনীত শিক্ষক সভাপতি হন। আর বাকি তিনটি কমিটিতে সভাপতি থাকেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যরা। এই তিন কমিটিতেও সদস্য হিসেবে থাকেন ভিসি আর একটিতে ট্রেজারারের থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আর্থিক লেনদেন পরিচালিত হয় ভিসি ও ট্রেজারারের স্বাক্ষরে। এর জন্যই কি এই ইচ্ছাকৃত শূন্যতা! এই অচলায়তন কীভাবে ভাঙবে, কে জানে?