প্রত্নতাত্ত্বিকরা সম্প্রতি জানতে পেরেছেন, প্রাগৈতিহাসিক যুগে এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি এক অঞ্চলের বাসিন্দারা এক হাজার বছর মাছ খাননি। ওই সময় তারা বাইসন, হরিণসহ অন্য বড় প্রাণী শিকার করে খাদ্যের চাহিদা মেটাতেন। মাছ খেতে কি তাদের ভালো লাগত না? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
মাছে অনীহা?
মানবসভ্যতার সূচনাপর্ব থেকে মাছ মানুষের প্রিয় খাদ্য। প্রায় ২০ লাখ বছর আগে কেনিয়ার হোমিনিনরা ক্যাটফিশের শরীর থেকে হাড় আলাদা করে খেতেন। আট লাখ বছর আগে ইসরায়েলের হোমিনিনরা বিশাল কার্প মাছ ভেজে খান। এ ছাড়া সামুদ্রিক মাছ শেলফিশ আদিম যুগের মানুষরা প্রচুর খেতেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করা নিয়ানডারথালরা তো ঝিনুকের জন্য সমুদ্রে ঝাপ পর্যন্ত দিতেন। উত্তর আমেরিকার প্রাগৈতিহাসিক মানুষ মিঠাপানির মাছ খেয়ে খাদ্যের চাহিদা মেটাতেন। ওই মহাদেশে আজ যারা বাস করছেন, তাদের মাছ কতটা পছন্দের, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতœতাত্ত্বিকরা তাদের পূর্বপুরুষদের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে দেখেছেন, ১৫ থেকে ১৪ হাজার বছর আগে বেরিনজিয়ার (এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি অঞ্চল) প্রাচীনতম মানুষ শুরুতে মাছ খেতেন না। ১৩ হাজার বছর আগে তারা মাছ খাওয়া শুরু করেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা জানান, প্রথম এক হাজার বছর বা তার একটু বেশি সময় ধরে বেরিনজিয়ানরা বাইসন, এল্ক (বৃহৎ প্রজাতির হরিণ) ও অন্য বড় প্রাণী শিকার করতেন। তারা মাছ খেতেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, ওই অঞ্চলের মানুষ এক হাজার বছর মাছ খাননি কেন? সেখানে কি মাছ পাওয়া যেত না? নাকি পাওয়া গেলেও মাছ খেতে তাদের ভালো লাগত না? তাহলে এক হাজার বছর পর হঠাৎ কী এমন ঘটল যে, মাছের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি হলো? তাদের জীবাশ্মে মাছের অস্তিত্ব না পাওয়ার কারণ কী এই যে, মাছের হাড় বাইসন বা এল্কের মতো শক্ত নয়? যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা ফেয়ারব্যাঙ্কসের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বেন পটার ও তার সহকর্মীরা এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সায়েন্স অ্যাডভান্সেস নামের জার্নালে।
খাদ্য সংগ্রহ
নৃবিজ্ঞানী পটার ও তার দল পূর্ব বেরিনজিয়ার সব খনন প্রতিবেদন সংগ্রহ করে গবেষণা করেন। তারা জানতে পারেন, ওই অঞ্চলের মানুষ বড় প্রাণী শিকার করতেন। পূর্ব বেরিনজিয়ার একটি অঞ্চলে প্রথম মাছ আসে ১২ হাজার ৯০০ বছর আগে। অঞ্চলটির নাম মিড। ১১ হাজার ৮০০ বছর আগে আপওয়ার্ড সান রিভার নামে পূর্ব বেরিনজিয়ার আরেক জায়গায় মাছের প্রবেশ ঘটে। পূর্ব বেরিনজিয়া আলাস্কার কয়েকটি অঞ্চল ও কানাডার উত্তর-পশ্চিমের ইউকন অঞ্চল নিয়ে গঠিত। ১৫ থেকে ১৪ হাজার বছর আগে ওই গোটা অঞ্চল তুষারমুক্ত ছিল। ওই সময় থেকে মানুষ সেখানে বাস করা শুরু করে। জীবজন্তুর বিচরণ তার আগে থেকেই ছিল। বেরিনজিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে মাছের অস্তিত্ব ছিল কি না, জানতে চাওয়া হলে পিটার বলেন, তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বেরিনজিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে গবেষণা করেন পটার ও তার সহকর্মীরা। এসব অঞ্চলের কোনোটিই উপকূলীয় নয়। তাদের গবেষণা তাই মিঠাপানির মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দীর্ঘসময় বেরিনজিয়া অঞ্চলে মাছের প্রবেশ ঘটেনি, তাদের এই সিদ্ধান্ত নির্ভুল। বেরিনজিয়ানরা মাছের চেয়ে মাংস বেশি পছন্দ করতেন, মাছের স্বাদ তাদের ভালো লাগেনি এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। পটার বলেন, পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয় এটি। তাদের খাবারের দোকান ছিল না যে, গেলেই পছন্দমতো খাবার কিনে খেতে পারবেন। খাদ্য সংগ্রহ প্রাচীন যুগের মানুষদের কাছে সহজ কোনো বিষয় ছিল না। মাছ, মাংস দুটোই পর্যাপ্ত আছে, তবে মাছ খেতে ভালো লাগছে না বলে মাংস খাচ্ছি এই বাছাই করার সুযোগ তাদের ছিল না। শিকার করে যা পেতেন, তাই খেয়ে জীবনধারণ করতে হতো তাদের। এখানে বিষয়টি প্রধানত জলবায়ুর। হাজার হাজার বছর আগে ওই অঞ্চল যখন অনেক বেশি ঠাণ্ডা ছিল, সে সময় সেখানে মাছ পাওয়া যেত না।
প্রায় ২৬ হাজার বছর আগে শেষ বরফযুগের পর পৃথিবী উষ্ণ হতে শুরু করে। কিন্তু এই উষ্ণ হওয়ার প্রক্রিয়া হঠাৎ একটা সময়ে থেমে যায় এবং পৃথিবী ফের আগের মতো শীতল হয়ে পড়ে। ওই সময়কে ইয়ঙ্গার ড্রাইয়াস বলা হয়। ১২ হাজার ৮০০ থেকে ১১ হাজার ৭০০ বছর পর্যন্ত এভাবেই উল্টোপথে হাঁটে পৃথিবী। এটা কেন হয়েছিল? জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সময় গলিত হিমবাহের পানি যখন সমুদ্রে পড়ে, তখন পানির সেই ঢল পৃথিবীকে আবার বরফযুগে নিয়ে যায়। এ ছাড়া সমুদ্রের স্রোতে পরিবর্তন ঘটে, যা জলবায়ুতে প্রভাব ফেলে। বেরিনজিয়া ইয়ঙ্গার ড্রাইয়াসের সময় অনেক শীতল হয়ে পড়েছিল এবং একই সঙ্গে আরও শুষ্ক অঞ্চলে পরিণত হয়। শিকার করার মতো পর্যাপ্ত তৃণভোজী প্রাণী বেরিনজিয়ানরা সে সময় পেতেন না। যখন যা পেতেন, তাই শিকার করতেন। পটার বলেন, ‘মাছের চেয়ে বাইসনের মতো প্রাণী শিকার করা তাদের জন্য লাভজনক ছিল। যত বড় প্রাণী শিকার করে খাওয়া হবে, দেহে তত বেশি শক্তি পাওয়া যাবে। এটি তারা বুঝতে পেরেছিলেন বলে মাছের পেছনে সময় নষ্ট করতেন না। তারা ছোট্ট ট্রাউট মাছ শিকার করে শক্তি ক্ষয় না করে বাইসন বা হরিণের দিকে নজর দিতেন। এ কারণে এটি তাদের মাছ পছন্দ করা বা না করার বিষয় নয়।’
গোটা ইয়ঙ্গার ড্রাইয়াসের সময় বেরিনজিয়ানরা বাইসন ও এল্ক ভক্ষণ অব্যাহত রাখেন। এ কারণে তারা বিলুপ্ত হয়ে যাননি বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। অবশ্য ম্যামথ ও বুনো ঘোড়ার ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনি। ওই সময়ই এই দুই প্রাণী বিলুপ্তির পথে হাঁটতে শুরু করে। পটার জানান, দক্ষিণ আমেরিকায় বিশালদেহী প্রাণীদের বিলুপ্তিতে মানুষের অবদানের প্রমাণ আছে। সময়কাল ও তাদের সংখ্যা হ্রাসের দ্রুততার ওপর ভিত্তি করে এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে উত্তর আমেরিকার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন ছিল না। জলবায়ুর চেয়ে শুষ্ক আবহাওয়া মহাদেশটিতে তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য দায়ী। বেরিনজিয়ানদের হাতে তখন মাছ শিকার করা ছাড়া উপায় ছিল না। মাছের পাশাপাশি ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার অব্যাহত রাখেন তারা। বেরিনজিয়ানদের মাছ শিকারের আরেকটি কারণ হতে পারে পুষ্টির চাপ। বড় প্রাণী পর্যাপ্ত নেই তাই মাছের মতো ছোট প্রাণী শিকার করে পুষ্টির চাহিদা মেটান তারা।
শনাক্ত
বেরিনজিয়ানরা প্রথম কোন মাছ খেয়েছিলেন, তা জানার কৌতূহল থেকে পটার ও তার দল গবেষণা কাজ চালিয়ে যান। পূর্ব বেরিনজিয়া অঞ্চলের ছয়টি বসতি থেকে ১ হাজার ১১০টি মাছের নমুনা শনাক্ত করেন তারা। বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, একেবারে শুরুতে বারবট মাছ শিকার করা হয়েছিল। ১২ হাজার ৯০০ বছর আগে এই মাছ বেরিনজিয়ার মিড অঞ্চলে পাওয়া যেত। এ ছাড়া বিজ্ঞানীরা আরও ১১টি মাছের জীবাশ্ম পান, তবে সেগুলোর নাম জানা যায়নি। বারবট মাছের নাম অনেকে নাও শুনে থাকতে পারেন। এটির আঁশ ছোট। চামড়া পাতলা। ইল আর ক্যাটফিশ এক করলে যা হয়, বারবট দেখতে অনেকটা তেমনই। আলাস্কা অঞ্চলে এই মাছ বেশি পাওয়া যায়। বেরিনজিয়ার সোয়ান পয়েন্ট ও কুক এলাকা থেকে পাওয়া দুটি মাছ নিয়ে গবেষণা করেন পটার ও তার দল। ওই দুই এলাকায় মাছ দুটি ১৩ থেকে ১২ হাজার বছর আগে ছিল। একই সঙ্গে মিড অঞ্চলে ১২ হাজার বছর আগের ৩৫৬টি বারবট ও ২৩টি হোয়াইটফিশ শনাক্ত করা হয়। ওই দুই মাছই আকারে বিশাল ছিল। এ ছাড়া নাম না জানা আরও ৩২৭টি মাছ শনাক্ত করা হয়। প্রায় ১২ হাজার বছর আগে এক্সবিডি-৩১৮ নামে বেরিনজিয়ার এক জায়গায় স্যামন মাছের আনাগোনা ছিল বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন। এরপর ১১ হাজার ৮০০ বছর আগে আপওয়ার্ড সান রিভারে শত শত স্যামনের বিচরণ ছিল বলে জানান তারা। এ ছাড়া আপওয়ার্ড সান রিভারে ১৪৫টি অজ্ঞাত মাছের জীবাশ্মের সন্ধান পান বিজ্ঞানীদের দল। পটার জানান, স্যামন সাগরে বাস করলেও ডিম ছাড়ার জন্য এটি নদীতে আসে।
পটার ও তার দল গবেষণার শেষ পর্যায়ে নিশ্চিত হন, ১৪ থেকে ৭ হাজার বছরের মধ্যে বেরিনজিয়ার দুটি জায়গায় কয়েকশ মাছের বিচরণ ছিল। মাছের সংখ্যা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কি না পটারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, অবশ্যই এটা জানা জরুরি। মাছের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ওই অঞ্চলের মানুষদের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। মাছের সংখ্যাবৃদ্ধি তাদের জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে বাধ্য। হতে পারে সেই বৃদ্ধির হার খুব কম। তবে সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটা নিশ্চিত হওয়া যে, ওই সময় বেরিনজিয়াতে মাছ ছিল। এটা ঠিক, ইয়ঙ্গার ড্রাইয়াসের সময় মানুষ বাইসন ও হরিণের মাংসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এসব মাংস থেকে তারা দরকারি শক্তি ও পুষ্টি পেত। তবে তারা বাইসন-হরিণের বিকল্পও খুঁজছিলেন। কেবল কোনো এক নির্দিষ্ট জায়গায় নয়, পূর্ব বেরিনজিয়ার গোটা অঞ্চলজুড়ে।
অদৃশ্য প্রযুক্তি
প্রত্নতাত্ত্বিকরা বেরিনজিয়ানদের মাছ ধরার কোনো যন্ত্র অবশ্য খুঁজে পাননি। যদিও বিশ্বের অন্য অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক যুগে ব্যবহৃত মাছ শিকারের যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। যেমন ইসরায়েলের এক জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিকরা হারপুন ও বড়শির সন্ধান পান। ১০ হাজার বছর ধরে ওই অঞ্চলের মানুষ এসব হারপুন, বড়শি ব্যবহার করতেন। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মাছ ধরার জালও প্রত্নতাত্ত্বিকরা পেয়েছেন। বিজ্ঞানী পটারের ধারণা, বেরিনজিয়ানরা জাল দিয়ে মাছ ধরতেন। পটার ও তার দল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন, মিঠাপানিতে মাছ শিকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জলবায়ু পরিবর্তন। তবে এর অর্থ এই নয়, বেরিনজিয়ায় বসবাসরত সবাই মাছ শিকার করতেন। একটা ছোট মাছ ধরলে একজন খেতে পারবে। কিন্তু একটা হরিণ শিকার করলে পুরো গোষ্ঠীর আহারের সংস্থান হয়। তবে হরিণ যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে? পটার বলেন, ‘এটাই হচ্ছে মানুষের অভিযোজনক্ষমতার গল্প। মানুষ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। আমাদের জলবায়ু ফের পরিবর্তন হচ্ছে। হাজার হাজার বছর আগে জলবায়ু পরিবর্তনের সময় ম্যামথের মতো তৃণভোজী প্রাণী আমরা হারিয়েছি। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে একটা সময় পর হতে পারে আমরা মাছ হারিয়ে ফেলেছি।’