পোশাক রপ্তানির আড়ালে ৩০০ কোটি টাকা পাচার

তৈরি পোশাক রপ্তানির আড়ালে দেশের ১০টি প্রতিষ্ঠান ৩০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা। গতকাল সোমবার কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো প্রজ্ঞা ফ্যাশন লিমিটেড, পিক্সি নিট ওয়্যারস ও হংকং ফ্যাশনস লিমিটেড, ফ্যাশন ট্রেড, এমডিএস ফ্যাশন, থ্রি স্টার ট্রেডিং, ফরচুন ফ্যাশন, অনুপম ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড, স্টাইলজ বিডি লিমিটেড ও ইডেন স্টাইল টেক্স। এর মধ্যে ঢাকার সাতটি, গাজীপুরের দুটি ও সাভারের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিনব কায়দায় রপ্তানি জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্যের চালান বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে, কিন্তু রপ্তানি আয়ের সেই বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসিত হচ্ছে না এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর তদন্ত করে এই অর্থ পাচারের ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বিল অব এক্সপোর্ট জালিয়াতি করে অন্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ইএক্সপি ব্যবহার করে পণ্য রপ্তানি করেছে এবং বিল অব এক্সপোর্টের ২৪ নম্বর কলামে নমুনার কোড ২০ ব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে কোনো অর্থ দেশে প্রত্যাবাসিত না হয়ে সমুদয় রপ্তানি মূল্য বাবদ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে।

তদন্তকালে ১০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে ১ হাজার ২৩৪টি পণ্যের চালানে এমন জালিয়াতি করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। রপ্তানি সম্পন্ন হওয়া এসব চালানের বিপরীতে পণ্যের পরিমাণ ৯ হাজার ১২১ টন। যার প্রত্যাবাসনযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার সম্ভাব্য পরিমাণ ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯১৮ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

শুল্ক গোয়েন্দারা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট দলিল পর্যালোচনা করে দেখেছেন, এসব প্রতিষ্ঠান টি-শার্ট, টপস, নারীদের পোশাক, ট্রাউজার, বেবি সেট, পোলো শার্ট প্রভৃতি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, সৌদি আরব, নাইজেরিয়া প্রভৃতি দেশে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রপ্তানি দেখিয়ে অর্থ পাচার করেছে। উল্লিখিত ১০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মূলত বিল অব এক্সপোর্টে নেচার অব ট্রানজেকশনে কোড ২০ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিল অব এক্সপোর্ট পর্যালোচনায় বিল অব এক্সপোর্ট ও ইএক্সপিতে দেওয়া তথ্যের মধ্যে কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

বিল অব এক্সপোর্টে সাউথ ইস্ট ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উল্লিখিত ১০ প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই ওই ব্যাংকে লিয়েনকৃত নয়। প্রতিষ্ঠাগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে ওই ব্যাংক সম্পর্কিত নয় বিধায় ওই ব্যাংকের মাধ্যমে বিল অব এক্সপোর্টে উল্লিখিত সেলস কন্ট্রাক্ট বা ইএক্সপির রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসিত হয়নি। এসব রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জড়িত।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের যারা রপ্তানিকারক, তারা ইমেজ ক্রাইসিস তৈরি করছে। এটা যদি হয়ে থাকে অবশ্যই এর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রজ্ঞা ফ্যাশন লিমিটেড ২০১৯ ও ২০২০ সালে মোট ৩৯১টি রপ্তানি চালানের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে। রপ্তানি করা পণ্যচালানগুলোতে ৩ হাজার ৮০ টন টি-শার্ট, প্যান্ট, ট্যাংক-টপ, পায়জামাসহ বিভিন্ন পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে।

ফ্যাশন ট্রেড ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ২৪৬টি রপ্তানি চালানে জালিয়াতি করেছে। বিভিন্ন দেশে ১ হাজার ৭৭৯ টন তৈরি পোশাক রপ্তানি করলেও পণ্যের মূল্য প্রায় ৮০ লাখ ৫১ হাজার ৬৪০ ডলার বা ৬৮ কোটি ৩৫ লাখ ৮৪ হাজার ২৩৬ টাকা ফেরত আসেনি। এমডিএস ফ্যাশন ২০২০ সালে ১৮২টি রপ্তানি চালানে জালিয়াতি করে প্রায় ৫১ লাখ ৮২ হাজার ৫৮৬ মার্কিন ডলার বা ৪৪ কোটি টাকা পাচার করেছে।

হংকং ফ্যাশনস লিমিটেড ২০১৮ থেকে ২০২০ সালে ১৫৬টি রপ্তানি চালানে জালিয়াতি করেছে। রপ্তানি করা পণ্যচালানগুলোতে ১ হাজার ১৬১ টন টি-শার্ট রপ্তানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪৭ লাখ ৮৯ হাজার ৬০৬ মার্কিন ডলার বা ৪০ কোটি ৬৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫৮৬ টাকা পাচার করেছে। থ্রি স্টার ট্রেডিং ২০২০ সালে ১২০টি রপ্তানি চালানে ৮১৬ টন টি-শার্ট রপ্তানি করেছে। জালিয়াতির এসব রপ্তানির মাধ্যমে তৈরি পোশাক কারখানাটি ৩০ লাখ ৫৩ হাজার ১০৮ মার্কিন ডলার বা ২৫ কোটি ৯২ লাখ ৮ হাজার ৮৬৯ টাকার রপ্তানি আয় দেশে আনেনি। ফরচুন ফ্যাশন ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ৫৯টি রপ্তানি চালানে জালিয়াতির মাধমে প্রায় ১৫ লাখ ২৪ হাজার ৮১৩ ডলার পাচার করেছে।

অনুপম ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড ২০২০ সালে ৪২টি রপ্তানি চালানের মাধ্যমে প্রায় ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৪৭০ ডলার অর্থ পাচার করেছে। পিক্সি নিট ওয়্যারস লিমিটেড ২০২০ সালে ২০টি রপ্তানি চালানে জালিয়াতি করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ২৮২ ডলার বিদেশে পাচার করেছে। স্টাইলাইজ বিডি লিমিটেড ২০২০ সালে ১০টি রপ্তানি চালানে জালিয়াতি করেছে, যার মাধ্যমে পাচার হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬২৯ মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য। ইডেন স্টাইল টেক্স ২০২০ সালে ৮টি রপ্তানি চালানের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫ ডলার পাচার করেছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে রপ্তানি করা পণ্য হলো টি-শার্ট এবং প্রতি পিসের ওজন দেখানো হয়েছে ৫০০/৮০০/১০০০ গ্রাম বা তারও বেশি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রতি কেজি নিট ফেব্রিকস দিয়ে কমপক্ষে ৩ থেকে ৬টি লং সিøভ এল সাইজ টি-শার্ট হয়ে থাকে। এ অবস্থায় প্রতিটি টি-শার্টের গড় ওজন ন্যূনতম ২৫০ গ্রাম ধরে রপ্তানি করা টি-শার্টের সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে। এ ছাড়া কিছু কিছু পণ্যচালানে রপ্তানি পণ্যের মূল্য খুবই কম ঘোষণা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সমসাময়িক রপ্তানি চালানের সমজাতীয় পণ্যের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য রপ্তানিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিল অব এক্সপোর্টে অন্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ইএক্সপি ব্যবহার করেছে।

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও যোগসাজশে জাল-জালিয়াতির এ ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান বলে জানিয়েছেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর ঢাকার যুগ্ম পরিচালক মো. শামসুল আরেফিন খান।