৫৫ কেজি সোনা চুরিতে কাস্টমস কর্মকর্তা-সিপাহি!

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টম হাউজের নিজস্ব গুদাম এলাকায় বাইরের কারও যাওয়ার সুযোগ নেই। অত্যন্ত সুরক্ষিত ওই কক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ৫৫.৫১ কেজি সোনা কৌশলে সরানো হয়েছে, যার বাজারমূল্য ৪৫ কোটি টাকা। আর এই চুরিতে কাস্টমসের কর্মকর্তা ও সিপাহিরা জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এদিকে ঘটনাস্থলে থাকা সিসি টিভি ক্যামেরা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ সোনা চুরির এই ঘটনাটি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে বিমানবন্দর এলাকার পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাকে। সোনা চুরির এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন আটজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বিমানবন্দর থানা-পুলিশ। তাদের মধ্যে কাস্টমসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা চারজন, আর কাস্টম হাউজের গুদামের নিরাপত্তায় পালা করে দায়িত্ব পালন করতেন, এমন সিপাহি রয়েছেন চারজন। তবে তাদের কাউকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। বিমানবন্দর থানা-পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গুদামের ভেতরে কোনো সিসি টিভি ক্যামেরা নেই। বাইরে থাকা সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ আলামত মিলেছে, যা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

সোনা চুরির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বিমানবন্দর থানা-পুলিশ এর তদন্তের মূল দায়িত্বে থাকলেও ছায়া তদন্তে নেমেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।

এদিকে গতকাল কাস্টম হাউজের গুদামে থাকা আরও ৫৫ কেজি সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। গতকাল দিনভর গুদামে থাকা সোনা গণনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে বলে কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে।

কাস্টমসের গুদাম থেকে যেসব সোনা চুরি হয়েছে সেগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশ থেকে ঘোষণার বাইরে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢোকানোর সময় বিমানবন্দরের কাস্টমসে আটক হয়। ডিএম (ডিটেনশন মেমো) মামলা দিয়ে এসব সোনা জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর নিয়ম রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম বলেন, ‘কাস্টম হাউজের নিজস্ব গুদামে যে কারও যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই যেতে পারেন। এই সোনা চুরির আলামত নেই বললেই চলে। আমাদের কাছে যে তথ্য-উপাত্ত আছে সেখানে বাইরে থেকে কেউ এসে স্বর্ণ নিতে পারবে না। কোনো ধরনের যন্ত্রপাতি ছাড়া যে আলমারিতে সোনা ছিল সেগুলো ভাঙা সহজ না। আর সেখানে যেসব যন্ত্রপাতি ছিল তা দিয়েও আলমারি ভাঙা সম্ভব না।’

ডিসি বলেন, ‘ধরেন প্রতিটি ডিএমসিতে দশটি সোনার বার ছিল। চোর চুরি করলে তো দশটা বারই নিয়ে যাবে। সে ওখান থেকে তো একটা-দুটো করে নেবে না।’

কাস্টমসের বরাত দিয়ে ডিসি মুর্শেদ আলম বলেন, ‘যেসব ডিএমসি থেকে সোনা চুরি হয়েছে তাদের তথ্য মতে “আংশিক সোনা চুরি” হয়। একবারে সব সোনা চুরি হয় না। এখানে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে, চোর বাইরের নাকি ভেতরের কোনো অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী চুরিতে জড়িত। এটা এখন তদন্তের বিষয়। আমরা সঠিকভাবে নিশ্চিত করে কোনো তথ্য দিতে পারছি না, এটা ভেতরের লোক করেছে নাকি বাইরের কেউ করেছে।’

গত রবিবার অফিস খোলার পর সোনা চুরির বিষয়টি কর্মকর্তাদের নজরে আসে। পরে রাতেই কাস্টম হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এয়ারপোর্ট প্রিভেন্টিভ টিম) মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সোনা চুরির এই ঘটনা কাস্টম হাউজের নজরে আসে গত শনিবার। তবে বিষয়টি জানাজানি হয় গত রবিবার। এই ঘটনায় কাস্টমসের একজন যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই স্পর্শকাতর। ঘটনাস্থলে যেতে আমাদের বিভিন্ন স্থানে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। অনুমতি নিয়ে সেখানে ঢোকা লাগছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ (গতকাল সোমবার) সারা দিন কাস্টম হাউজ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদল কাস্টম হাউজের গুদামে স্টক থাকা (মজুদ) সোনার হিসাব মিলিয়েছে। ফলে আমাদের প্রবেশের সুযোগ মেলেনি।’

বিমানবন্দর থানায় করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সোনা চুরির বিষয়টি গত শনিবার ঢাকা কাস্টম হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টমস গুদাম কর্মকর্তা মাসুদ রানার নজরে আসে। তিনি সকাল ৯টার দিকে ঢাকা কাস্টম হাউজের যুগ্ম কমিশনারকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অবহিত করেন। বিমানবন্দরের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’সংলগ্ন কাস্টমস ট্রানজিট গোডাউনের ভেতর প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান মূল্যবান পণ্য সংরক্ষণের জন্য গুদামে রক্ষিত একটি স্টিলের আলমারির দরজার লক ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। মাসুদ রানা যুগ্ম কমিশনারকে আরও জানান, প্রতিদিনের মতো আটক পণ্য গুদামে রেখে তালা দিয়ে তিনিসহ চারজন রাত সোয়া ১২টার দিকে বিমানবন্দরের কাস্টমস এলাকা থেকে চলে যান।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, গুদামের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন সংবাদ পেয়ে ওই গুদাম পরিদর্শনে যান ঢাকা কাস্টমসের কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার ও যুগ্ম কমিশনার। তারা গিয়ে গুদামের একটি স্টিলের আলমারির লকার ভাঙা দেখেন। গুদামের পূর্বপাশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বাতাস যে অংশ দিয়ে বের হয় সেখানকার টিনের কিছু অংশ কাটা দেখতে পান। পরে তারা গুদামে কর্মরত এ, বি, সি ও ডি শিফটের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাসুদ রানা, সাইদুল ইসলাম শাহেদ, শহিদুল ইসলাম, আকরাম শেখ এবং সিপাহি রেজাউল করিম, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, আফজাল হোসেন ও নিয়ামত হাওলাদারকে আলমারির লক ভাঙার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। এ সময় তাদের নির্দেশ দেওয়া হয় গুদামে রাখা মূল্যবান বস্তু চুরি হয়েছে কি না তা যাচাই করার জন্য। যাচাইকালে দেখা যায়, ২০২০ সাল থেকে ২০২৩ সালের বিভিন্ন সময় আটককৃত ডিএমের (ডিটেনশন মেমো) ৫৫.৫১ কেজি সোনার বার ও অলংকার লকার ভাঙা আলমারিতে পাওয়া যাচ্ছে না। চুরি হওয়া সোনার বর্তমান বাজারমূল্য ৪৫ কোটি টাকা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চুরির ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। এই চুরির রহস্য উদঘাটনে গুদামের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার একেএম নুরুল হুদা আজাদের ফোনে গতকাল সোমবার একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এর আগে চুরির বিষয়ে গত রবিবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গুদামে অনেকগুলো লকার থাকলেও সোনা চুরি হয়েছে একটি লকার থেকে। এসব সোনা ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে। আমি গুদামে অটোমেশনের কাজ শুরু করি। এর মধ্যে এ ধরনের ঘটনায় আমি লজ্জিত ও বিব্রত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আট দিন আগে গুদামটি অটোমেশনের কাজ শুরু হয়। এই কাজের অংশ হিসেবে গুদামে থাকা সোনা গণনার কাজ শুরু হয়। সোনা চুরির ঘটনা আগেই ঘটেছে। গুদামের অটোমেশনের কাজ শুরু হওয়ায় সেটা ধরা পড়বে; তাই লকার ভাঙার “নাটক” তৈরি করা হয়েছে।’