প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং আমার অভিজ্ঞতা

দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সওেয়ের একাংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে রবিবার (০৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৬টা থেকে। এর আগে শনিবার (০২ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

আপাতত এটি বিমানবন্দর সংলগ্ন কাওলা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত খুলে দেওয়া হয়েছে।

মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য হচ্ছে প্রায় ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে ১১ কিলোমিটার। যে অংশটি খুলে দেওয়া হয়েছে সেটি মূলত রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ করে যানজট কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে।

গত এক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত গুলশান-১ এ একটা ব্যক্তিগত কাজে আসতে হচ্ছে। যখন বাসায় ফেরার তাড়া শুরু হয় তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে যায়। সেই সন্ধ্যা আরও ঘনীভূত হয় জ্যামে পড়ে থাকতে থাকতে।

প্রথম দিন গত রবিবার (৩ সেপ্টেম্বর) গুলশান-১ থেকে বের হয়ে রওনা দিয়েছি মোহাম্মদপুরের উদ্দেশ্যে। কোনোভাবে ঠেলতে ঠেলতে তিতুমীর কলেজের গেট পর্যন্ত এগিয়েছি। তারপর থেকে গাড়ি যেন আর সামনে আগাতে চায় না। তার ওপর মহা টেনশনে পড়ে গেলাম গাড়িতে জ্বালানি নেই। যে জ্বালানি আছে তাতে একটানা গাড়ি চললে বড় জোর ৫০-৬০ কিলোমিটার যাওয়া যাবে।

জ্বালানি না থাকার আরেকটা কারণ হচ্ছে- আগের দিন জ্বালানি তেলের লরি শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছিলেন। এ কারণে রাজধানীর অনেক পাম্পে জ্বালানি তেল ছিল না।

যাক সে অন্য গল্প। বলছিলাম, একটানা চললে ৫০-৬০ কিলোমিটার যাওয়া যাবে। কিন্তু যানজটের যে অবস্থা তাতে সেই আশা করা আর বোকার স্বর্গে বাস করা একই। তিতুমীর কলেজ গেট থেকে মহাখালী রেল ক্রসিং এর আগ পর্যন্ত যেতেই ৪৫ মিনিট নাই।

গুগল ম্যাপ বলছে, বিজয় সরণি পর্যন্ত যেতে আমাকে আরও অন্তত ৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করতে হবে। তার মানে গাড়ি স্টার্ট থাকলে জ্বালানি পুড়বে আর আমি রাস্তায় আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে প্রায় শতভাগ। অগত্যা মাথায় একটা বুদ্ধি চাপল যে, মহাখালী থেকে কুড়িল যেয়ে যদি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠি তাহলে হয়তো সময়টা কম লাগবে।

গুগল ম্যাপে মহাখালী থেকে কুড়িলের চিত্রটা দেখে নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। কুড়িল পৌঁছতে সময় লাগলো ১২ থেকে ১৩ মিনিট। আর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওেয়েতে উঠে ৮০ টাকা টোল দিয়ে ফার্মগেট পৌঁছতে মাত্র ৮ থেকে ১০ মিনিট।

ফার্মগেটে নেমে আমি ফাস্ট লেনে থেকে সড়ক শৃঙ্খলা মেনে কোনোরকম জ্যাম না পেয়েই পৌঁছে গেলাম খামার বাড়ি গোল চত্বর। তবে যারা বা যেসব গাড়ি চালক আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে বার বার লেন পরিবর্তন করছিলেন তাদের একটু বেশি সময়ই ব্যয় করতে হয়েছে খামারবাড়ি গোল চত্বর পার হতে।

অর্থাৎ যা দেখলাম তাতে মনে হল, উড়াল সড়ক থেকে নেমে গাড়ি চালকরাই বিশৃঙ্খলা তৈরি করে যানজটের সৃষ্টি করেছেন।

আরেকটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের যে র‌্যাম্পটি ফার্মগেটে নেমেছে সেখানে রাস্তা অনেক প্রশস্থ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওই সড়কের বাম পাশে তেজগাঁও কলেজের দিক থেকে যেসব রিকশা মূল সড়কে উঠে আসে তারা অহেতুক দাঁড়িয়ে থেকে বা গাড়ির রাস্তায় রিকশা চালাতে গিয়ে যানবাহনের গতি স্লো করে দিচ্ছে, তাতে কিছুটা যানজটের সৃষ্টি করছে।

শুধু রবিবার নয় এরপর মঙ্গলবারও (৫ সেপ্টেম্বর) একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে মহাখালী ক্রসিং থেকে সোজা কুড়িল গিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠে মহাখালী রেল ক্রসিং থেকে বিজয় সরণি পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের জ্যামে পড়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা ও জ্বালানি পুড়িয়ে নষ্ট করার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, ফার্মগেট অংশে নামার পথে সেই রকম কোনো যানজটেই আমাকে পড়তে হয়নি। যদি কুড়িল থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠে তেজগাঁও নামার এক কিলোমিটার বা আধা কিলোমিটার আগেই গাড়ি থেমে যেত তাহলে হয়তো সেটা জ্যাম বা যানজট বলা যেতে পারে। কিন্তু একেবারে ফার্মগেট নেমে গিয়ে বিশৃঙ্খলার কারণে জটলায় পড়লে সেটা জ্যাম বা যানজট বলা কতটা যৌক্তিক?

বছর কয়েক আগে একবার বার্লিন থেকে প্যারিস যাচ্ছিলাম বাসে। আমার একজন নিকটাত্মীয় প্যারিস বাস টার্মিনালে অপেক্ষা করছিলেন। যথাসময়ে বাস পৌঁছে যায় টার্মিনালে। আমি গাড়ি থেকে নেমে আমার নিকটাত্মীয়ের গাড়িতে চড়ে যখন ওনার বাসার দিকে শহরের আরেক প্রান্তে যাওয়ার চেষ্টা করছি তখন কঠিন জ্যামে পড়লাম। আমার ওই নিকটাত্মীয় বললেন, এখন পিক-আওয়ার বেশ জ্যাম হবে।

হ্যাঁ, বিশ্বের প্রায় সব মেগা সিটিতেই পিক-আওয়ারে জ্যাম লেগে থাকে দীর্ঘ সময়। জনবহুল শহর ঢাকাও তার ব্যতিক্রম নয়।

যাক শেষ করতে চাই এভাবে-রাজধানীকে যানজট মুক্ত করতে এবং নগরবাসীর যাতায়াত সহজ করতে ও সময় বাঁচাতে রাজধানী ঘিরে যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মেট্রোরেল, ইনার সার্কুলার সড়ক, বৃত্তাকার রেলপথ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে গেলে আশা করি নগরবাসী যানজটের হাত থেকে শত ভাগ মুক্তি না পেলেও বড় ধরনের স্বস্তি পাবেন।

আর সড়কে যানজট কমাতে কিংবা যানজট থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে সবার আগে যানবাহন চলাচলে যে বিশৃঙ্খলা সেটা দূর করতে হবে। রাজধানীতে যে পরিমাণ সড়ক আছে তাতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারলেই অন্তত ৩০ থেকে ৪০ ভাগ জ্যাম কমে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক- সাংবাদিক।

e-mail: nizamul71@gmail.com