নির্বাচনের আগে জনতুষ্টিমূলক বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এবার পাবনা ও সিরাজগঞ্জের নিমগাছি এলাকায় পুকুর আধুনিকায়নের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ এলাকার ৭৭৯টি পুকুরকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে মাছ চাষ করা হবে। সম্প্রতি মৎস্য অধিদপ্তরের ‘নিমগাছি এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
প্রকল্পটি নিয়ম অনুযায়ী গত মঙ্গলবারের অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অবগত করা হয়েছে। একনেক সূত্রে জানা যায়, ২১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন সময়ের মধ্যে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের অন্যতম হচ্ছে মাছ চাষের উদ্দেশ্যে নিমগাছি এলাকায় বিদ্যমান সরকারি ৭৭৯টি পুকুরের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন করা। এ পুকুরগুলো বিভিন্ন সমবায় সমিতিকে লিজ দেওয়া হবে। এজন্য সমবায় সমিতি গঠন করে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধন নেবে মৎস্য অধিদপ্তর। এ প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ৫৬০ জন মাছচাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
প্রকল্পটির ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হবে এ পুকুরগুলোর সংস্কার কাজের জন্য। এতে ৭৭৯টি পুকুর সংস্কারে ব্যয় হবে ৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকার বেশি।
৬ হাজার ৫৬০ জন মাছচাষিকে প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। সুফলভোগীদের আপ্যায়নে ব্যয় হবে ২০ লাখ টাকা।
পুকুরগুলোর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যয়ে কিছু অসংগতি দেখা গেছে। এ পুকুরগুলোর নিবন্ধনের ফি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। আবার নিবন্ধনের পর স্টেশনারি ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ প্রকল্পে উৎসব পালন করা হবে, ৪৫টি উৎসবের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ লাখ টাকার বেশি।
তবে এ প্রকল্পে কোনো পরিবহন কেনার কথা না থাকলেও পরিবহনের জন্য তেল ও টোল বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। আবার পেট্রোল ও লুব্রিকেন্টের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ লাখ টাকা।
চাষিদের জন্য আলাদাভাবে প্রশিক্ষণের ব্যয় থাকার পরও আবার অন্য খাত দেখিয়ে এতে ব্যয় ধরা হয়েছে। যেমন ৮টি সভা ও সেমিনার বাবদ খরচ করা হবে ২৪ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
প্রকল্পের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে, সমিতিগুলোকে উপকরণ বিতরণের জন্য। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আবার ১০০টি কিট বক্সের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ লাখ টাকা।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, নিমগাছি এলাকায় বিদ্যমান সরকারি পুকুরগুলোর আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উন্নত চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারণপূর্বক উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি ও আহরণোত্তর অপচয় ৫ শতাংশ কমানো।
এছাড়া নিমগাছি এলাকার জলাশয় সংশ্লিষ্ট সুফলভোগী দলগুলোকে সমবায় নিবন্ধীকরণের মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালীকরণ ও প্রকল্প এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এ প্রকল্পের আরেকটি উদ্দেশ্য।
জানা গেছে, গত ৩১ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ‘সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৯’ এর আলোকে নিমগাছি এলাকার ৭৭৯টি পুকুর একটি প্রকল্পের আওতায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে মোট ২১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এবং জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য আলোচ্য ‘নিমগাছি এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, স্বাধীনতার পর ৭৮৯টি পুকুর নিয়ে নিমগাছি মৎস্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এ সময় পুকুরগুলো মাছ চাষের উপযুক্ত ছিল না। পুকুর জঙ্গলে ভরা ছিল। জঙ্গল পরিষ্কার করে মাছ চাষের উপযুক্ত করে গড়ে তুলে পুকুরপাড়ের মৎস্যজীবীদের নিয়ে সমিতির মাধ্যমে মাছ চাষের ব্যবস্থা করা হয়। শুরু থেকে এসব পুকুরের পাড়ে বসবাসকারী মৎস্যজীবীরা সুফল পেতে থাকেন। তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে লাভজনক পুকুরগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে ২৫ বছরের চুক্তিতে লিজ দেওয়া হলে মৎস্যজীবীরা তাদের অধিকার হারান। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় পুকুরগুলো পুনরায় নিমগাছি মৎস্য প্রকল্পে হস্তান্তর করা হয়। ফলে পুকুরপাড়ের মৎস্যজীবীরা পুনরায় মাছ চাষে তাদের অধিকার ফিরে পান। মাছ চাষ করে তারা শুধু লাভবানই হচ্ছেন না, ভাগ্যের পরিবর্তন করছেন। ৭৮৯টি পুকুরপাড় ১০ হাজারের অধিক মৎস্যজীবী পরিবারে প্রায় অর্ধ লাখ পোষ্য রয়েছে। মৎস্যজীবীরা সমিতির মাধ্যমে মাছ চাষ করে লভ্যাংশ সমানভাবে ভাগ করে নেন।
১৯৮৩ সালে পুকুরগুলো গ্রামীণ ব্যাংকে লিজ দেওয়া হয়। ২০১২ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে পুকুরগুলো পুনরায় নিমগাছি মৎস্য প্রকল্পের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বছর শেষে বিঘাপ্রতি রাজস্ব প্রকল্পের মৎস্য সমিতি প্রদান করে। এ পুকুরগুলো থেকে নিমগাছি মৎস্য প্রকল্পের আয়ের কোনো সুযোগ নেই। আয়ের সমুদয় অর্থ মৎস্যজীবীরা সমান ভাগে ভাগ করে নেন।