মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের (এমপিএল) প্রধান স্থাপনা থেকে তেল চুরির ঘটনায় তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, একটি প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ বাতিল ও অন্য একটির ডিলারশিপ স্থগিতের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। সুপারিশ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন নির্দেশ দিলেও মেঘনা পেট্রোলিয়াম তা করছে না। এতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে প্রতিষ্ঠানের সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং সিবিএর কয়েকজন নেতা জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। তাদের চাপের কারণেই বিপিসির নির্দেশনা বাস্তবায়নে এমন গড়িমসি হচ্ছে।
‘তেল চুরির দুর্ভেদ্য চক্র’ শিরোনামে গত ৪ এপ্রিল দেশ রূপান্তর পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংবাদটির বিষয়ে বিপিসিকে চিঠি দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয় জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ২৩ মে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিপিসি। কমিটি অভিযোগের বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করে গত ১৯ জুন বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে গত ১৩ আগস্ট মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেন বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. আবুল কালাম আজাদ। চিঠিতে সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিপিসিকে জানাতে বলা হয়। এ ছাড়া কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, অভিযুক্ত কর্মচারীদের অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
যাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে তারা হলেন মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কর্মচারী (জিই-১) জয়নাল আবেদিন, নিরাপত্তা প্রহরী মো. আলমগীর হোসেন ও মিটার অপারেটর-১ মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন। এর মধ্যে জয়নালকে স্থায়ী বহিষ্কার, আলমগীরের এক বছরের ও আলতাফের দুই বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট (বেতন বৃদ্ধি) স্থায়ীভাবে বাতিল।
এ ছাড়া মেঘনার ডিলার চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মেসার্স রউফ অ্যান্ড সন্সের ডিলারশিপ বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। পাশাপাশি খাগড়াছড়ির মেসার্স জিলানি এন্টারপ্রাইজের ডিলারশিপ এক বছরের জন্য স্থগিত করা যেতে পারে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।
বিপিসি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপই নেয়নি মেঘনা পেট্রোলিয়াম।
এ বিষয়ে জানতে মেঘনা পেট্রেলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালেহ ইকবালকে একাধিবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।
পরে প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর) মো. টিপু সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অফিশিয়াল অ্যাকশনে যাচ্ছি। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী বিভাগীয় মামলাসহ যা যা করার তা-ই আমরা করব। এ জন্য কিছুটা সময় লাগবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা এখনো চাকরিতে বহাল আছে। দুই-এক দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর চিঠি দিয়ে ওই দিন থেকেই বরখাস্ত করা হবে। কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব দিতে না পারলে তদন্ত হবে। ধাপে ধাপে এগুলো না করলে আমরা আইনগত জটিলতায় পড়ব।’
একবার তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং বিপিসি শাস্তির নির্দেশ দিয়েছে। তারপরও আবার কেন তদন্ত করবেন? জবাবে টিপু সুলতান বলেন, ‘এটা তো বিপিসি তদন্ত করেছে। এখন আইন অুনযায়ী আমাদের কোম্পানির পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত হবে।’
বিপিসি তো সুপারিশ বাস্তবায়নের চিঠি দিয়েছে। আপনাদের তদন্তে দোষী প্রমাণিত না হলে কি কোনো ব্যবস্থা নেবেন না? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। বিপিসি যেটা তদন্ত করেছে, সেটা নিশ্চয় অস্বীকার করা যায় না। দেখা যাক কী হয়।’
মিটার অপারেটর-১ মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন দাবি করেন, তেল চুরির সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। সিবিএর কিছু নেতার চক্রান্তের শিকার তিনি।
তেল চুরির এ ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করার সময় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক মেঘনা পেট্রেলিয়ামের প্রধান স্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানটির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবুল মেরাজের সঙ্গে কথা বলেন। তখন তিনি দাবি করেছিলেন, তেল চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি।
আর সিবিএ সেক্রেটারি হামিদুর রহমান জানিয়েছিলেন, প্রতিটি তেলবাহী গাড়িতে কয়েকটা ধাপে চেকিংয়ের পর তা গেট দিয়ে বের করা হয়। ফলে তেল চুরির কোনো সুযোগ নেই। এর পরও মাঝেমধ্যে যারা করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।