মুনাফিক বহুল প্রচলিত একটি চেনাজানা শব্দ। এর সরল অর্থ কোনো কিছু গোপন রেখে এর বিপরীত কথা বা কাজ প্রকাশ করা। মুনাফিকরা আমাদের সমাজের বাইরের কেউ নয়, তারা সমাজের মধ্যেই বসবাস করে। বিভিন্ন সামাজিকতায় অংশ নেয়, হাটবাজারে একসঙ্গে ঘোরাফেরা ও চলাফেরা করে। শরিয়তের পরিভাষায় মুনাফিক বলা হয় ওই ব্যক্তিকে, যে অন্তরে কুফরি ও ইসলামবিরোধিতা রেখে মুখে ও প্রকাশ্যে ইসলাম প্রকাশ করে এবং মুসলমান হওয়ার দাবি করে। ইসলামের বিধানে মুনাফিকি দুই ধরনের। এক. বিশ্বাসগত মুনাফিকি, দুই. কর্মগত মুনাফিকি। বিশ্বাসগত মুনাফিকি হলো অন্তরে কুফরি রেখে নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করা। এ ধরনের মুনাফিকির মাধ্যমে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। আর কর্মগত মুনাফিকি যেমন আমানতের খেয়ানত করা, মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, গালাগাল করা ইত্যাদি। এসব কর্ম মুনাফিকি হলেও এসবের মাধ্যমে কেউ ইসলাম ধর্ম থেকে বের হয়ে যায় না। আমাদের আলোচনা কর্মগত মুনাফিকি নিয়ে।
ইসলাম মানুষকে সর্বাবস্থায় সতর্ক করে ইরশাদ করেছে, মুনাফিকরা মানবতার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই আল্লাহতায়ালা এ জাতীয় লোকদের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা কোরআন মাজিদের বিভিন্ন সুরার আয়াতে বলে দিয়েছেন যাতে করে সচেতন ব্যক্তিরা সহজেই তাদের চিহ্নিত করতে পারে এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকতে পারে। মুনাফিক লোকগুলোর মুখে বলা কথার সঙ্গে অন্তরের বদ্ধমূল বিশ্বাস এক নয়। মূলত মুনাফিক সব সময় মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে চলে। বাস্তবতা হচ্ছে তারা অন্যকে নয়, নিজেদেরই ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, ছলনাময় মিথ্যা কথা বলে মানুষ থেকে নানান সুযোগ-সুবিধা হাসিল করার চেষ্টা করা।
কোরআন মাজিদের শতাধিক আয়াতে মুনাফিকদের বিষয়ে আলোচনা এসেছে। তা ছাড়া কোরআনে কারিমে মুনাফিকদের নামে স্বতন্ত্র একটি সুরাও রয়েছে। চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান, সে হবে প্রকৃত মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পূর্ণভাবে পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। সেগুলো হলো ১. সম্পদ গচ্ছিত রাখা হলে তা হরণ করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে বিস্ফোরিত হয়ে অশ্লীল গালি দেয়, সত্য থেকে বিচ্যুত হয়, অত্যন্ত অবিবেচক, অযৌক্তিক, মূর্খ, মন্দ এবং অপমানজনকভাবে আচরণ করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি ১. কথা বললে মিথ্যা বলে, ২. ওয়াদা করলে তা খেলাপ (রক্ষা করে না) করে, ৩. আমানত রাখা হলে তাতে খেয়ানত করে।’ অন্য বর্ণনায় আছে, ‘যদিও সে রোজা রাখে, নামাজ পড়ে ও ধারণা করে যে সে মুসলিম।’ সহিহ বোখারি
ইসলামি স্কলাররা সর্বজনীনতায় মুনাফিকের আরও কিছু আলামতের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো ব্যাধিগ্রস্ত মন, খেয়ালখুশির প্রলোভন, অহংকার প্রদর্শন, দোটানা-দোদুল্যমান মনোভাব, মিথ্যা শপথ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কাপুরুষতা-অস্থিরতা, যা করেনি তা করার নামে প্রশংসা-পিয়াসি, সৎকর্মকে দূষণীয় গণ্য করা, অন্যায়ের আদেশ ও ন্যায়ের নিষেধ, মানুষের দৃষ্টির আড়াল হওয়ার চেষ্টা, আমানতের খেয়ানত করা, কথোপকথনকালে মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করা এবং বাগবিতণ্ডাকালে বাজে কথা বলা ও কুরুচিপূর্ণ বচন-বাচালতা।
আলেমরা বলেছেন, মুনাফিকরা কথা বলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত মিষ্টিমধুর কথা বলে। কথা শুনলে মনে হবে, এই মানুষের দ্বারা কোনো পাপকাজে লিপ্ত হওয়া অসম্ভব। আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে তাদের এ ধরনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তুমি যখন তাদের দিকে তাকাবে, তখন তাদের (বাইরের) দেহাবয়ব তোমাকে খুশি করে দেবে আবার যখন তারা তোমার সঙ্গে কথা বলবে, তখন তুমি (আগ্রহভরে) তাদের কথা শুনবেও।’ সুরা মুনাফিকুন : ৪
মুনাফিকদের চিহ্নিতকরণে তাদের বাইরের এই রূপ দেখে যেন মানুষ প্রতারিত না হয়, সেজন্য আল্লাহতায়ালা তাদের বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। মুনাফিকের পরিচয় বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘অবশ্যই মুনাফিকরা প্রতারণা করছে আল্লাহর সঙ্গে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুত তারা যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায়, একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।’ সুরা আন নিসা : ১৪২
মুনাফিকের দল নিজেরা সব সময় পাপকাজ, অন্যায় কাজের মাঝে ডুবে থাকে। অন্যের সম্পদ জোর করে ভোগদখল করে। তারা দুর্বল মানুষের ওপর প্রতিপত্তির জোরে অবিচার করে। তাদের কাছে কেউ যখন কোনো পরামর্শের জন্য আসে, তখন তারা তাদের সুপরামর্শের বদলে কুপরামর্শ দেয়। তাদের কাছে যখন কোনো অভাবী, গরিব, মিসকিন সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায়, তখন তারা দান-খয়রাত করে না। তারা এতিমের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না।
নিজের সুবিধা লুটতে মানুষের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করার জন্য সর্বদা ওত পেতে থাকে। আল্লাহতায়ালা এসব মুনাফিকের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করেছেন এবং তিনি তার রাসুল (সা.) মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা মুনাফিকদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করে। মুনাফিকদের শাস্তির ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং কাফেরদের জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’ সুরা তওবা : ৬৮
জাহান্নাম এমন একটি ভয়াবহ জায়গা, যা বর্ণনা করে কোনো মানুষকে বোঝানো সম্ভব নয়। আল্লাহতায়ালা মুনাফিকদের এমন ভয়াবহ আজাবের স্থান জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন এবং তারা সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে। সেখানে তাদের অবস্থা এমন হবে যে, তারা মৃত্যু কামনা করবে, কিন্তু তাদের মৃত্যু দেওয়া হবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এ মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে, তুমি সেদিন তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী খুঁজে পাবে না।’ সুরা নিসা : ১৪৫
বিভিন্ন স্বভাবের সমষ্টি মানুষের মধ্যে আছে, যা প্রশংসনীয় এবং নিন্দনীয়। আল্লাহতায়ালা ও রাসুল (সা.) নিন্দনীয় স্বভাবগুলো থেকে বেঁচে থাকার জন্য শাশ্বত মহাগ্রন্থ কোরআন ও হাদিসে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। মানুষের সবচেয়ে নিন্দনীয় ও নিম্নমানের স্বভাব মুনাফিকি। এই স্বভাব থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা সর্বতোভাবে কাম্য। নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, সুন্দর কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, নির্মল পরিবার ও আদর্শ সমাজ গঠনে এই মন্দ স্বভাব বর্জন ইমানের দাবি।
লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক
muftianaet@gmail.com