বিকল্প হতে পারছে না বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি

আদালতে মামলাজট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা সম্ভাবনা জাগালেও কাক্সিক্ষত সুফল মিলছে না। ক্ষেত্রবিশেষে আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (অলটারনেটিভ ডিসপুট রেজল্যুশন) বা এডিআর মামলা পূর্ব ও পরবর্তী বিরোধ নিষ্পত্তিতে উত্তম ও সহজ পদ্ধতি। কোনো রকম ভোগান্তি ও হয়রানি ছাড়া নিখরচার এই সমাধানেও অনেকের উৎসাহ নেই। ফলে মামলা বাড়ছে, পক্ষগণের বিরোধে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ভুক্তভোগীর ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে চরমভাবে।

গত দুই দশকে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যার সঙ্গে আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধপূর্ণ ঘটনার সংখ্যা মেলালে সেই চিত্রই দেখা যায়। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত উচ্চ ও আদালতে বিচারাধীন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা ৪২ লাখের বেশি।

অন্যদিকে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার হিসাবে ২০০৯ সাল থেকে প্রায় ১৫ বছরে সাড়ে ৮৬ হাজার বিরোধ (মামলা পূর্ব ও পরবর্তী) নিষ্পত্তি করেছে ৬৪ জেলার লিগ্যাল এইড অফিস। লাখ লাখ মামলা ও বিরোধের বিপরীতে এ পরিসংখ্যানকে হতাশাজনক বলছেন আইনবিদরা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ওয়াকিবহাল আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেওয়ানি মামলায় দুই পক্ষের সম্মতিতে এডিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন অনেকটা সহজতর। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ ব্যতীত লঘু অপরাধের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে মামলার জট হ্রাস পায়। কিন্তু এডিআর নিয়ে ধারণা ও প্রচারের ঘাটতি, বিরোধীয় পক্ষগণের আস্থাহীনতা, মামলার প্রবণতা ও ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা, কিছু ক্ষেত্রে আইনজীবীদের আন্তরিকতার ঘাটতি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আদালতকে নির্ভরযোগ্য মনে করা, পক্ষগণের এডিআর মানার বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক সম্ভাবনার পরেও বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা।

মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলায় পক্ষগণের বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গত ২৯ আগস্ট প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টে মেডিয়েশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির উদ্যোগে সেখানে আদালতের অনুমতি ও দুই পক্ষের সম্মতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে। এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় উল্লেখ করে আইনবিদরা বলছেন, এর মাধ্যমে এডিআর পদ্ধতিটি প্রতিষ্ঠিত হবে। 

এডিআর পরিস্থিতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা হচ্ছে। আপিল, রিভিশন হচ্ছে। একটা মামলা থেকে চারটা-পাঁচটা মামলা হচ্ছে। যে হারে মামলা বাড়ছে এডিআর ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই।’ তিনি বলেন, ‘একদিকে এ বিষয়ে মানুষের ধারণা কম। অন্যদিকে মানুষকে বোঝাতে না পারা। আমরা হয়তো মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছি না যে এটার লাভ-ক্ষতি কী? মামলা করলে কী হবে আর এডিআর করলে কী হবে এগুলো বোঝানো গেলে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে।’

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইনজীবীদের দায় আছে কি নাÑ এমন প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘অবশ্যই। আদালতেরও দায়িত্ব আছে। প্রথমত, আদালত আইনজীবীদের ডেকে নিয়ে দুই পক্ষকে সমঝোতায় আসতে তাগিদ দিলে আপসের মানসিকতা নিয়ে বসলেই সমাধান হবে।’

দেশে দেওয়ানি কার্যবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, শ্রম আইন, অর্থঋণ আদালত আইন, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, গ্রাম আদালত আইন, সালিস আইন, বিরোধ মীমাংসা (পৌর এলাকা) বোর্ড আইনসহ বিভিন্ন আইনে বিকল্প পদ্ধতিতে মামলা পূর্ব ও পরবর্তী বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে। দেওয়ানি আইনের ৮৯ (ক) ধারায় মধ্যস্থতা, ৮৯ (খ) ধারায় সালিস ও ৮৯ (গ) ধারায় আপিলে মধ্যস্থতার বিধান রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারা অনুযায়ী, ৬২টি লঘু অপরাধের ক্ষেত্রে আপস-মীমাংসার বিধান রয়েছে।

আইনবিদরা বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মারামারি, খুনের মতো ফৌজদারি অপরাধের বড় কারণ ভূমির বিরোধ। আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এডিআরের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বিরোধ নিষ্পত্তির তাগিদ দেন ভূমির বিরোধের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া অর্থঋণ আদালত মামলা এবং শ্রম আইনে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকের বিরোধের ক্ষেত্রেও এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির তাগিদ থাকলেও সুফল মিলছে কম।

আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও বিচারপ্রাপ্তিতে অসমর্থ জনগণকে নিখরচায় আইনি সহায়তা দিতে ২০০০ সালে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন’ করে সরকার। এতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়। ২০১৭ সালে দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধন করে এডিআরের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে আদালত নিজে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে পারে। পক্ষগণের আইনজীবী বা আইনজীবীর নিযুক্ত করা অন্য আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারক, জেলা জজের তৈরি করা প্যানেল মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে পারে। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে বাদীর অভিযোগ ও বিবাদীর লিখিত জবাবের পর বিচারক শুনানি মুলতবি করে দুই পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানাবেন। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। তবে, পক্ষগণের তা মানার ওপর বাধ্য বাধকতা নেই।

মধ্যস্থতায় (মেডিয়েশন) বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে সচেতনতায় কাজ করে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটি (বিমস)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসএন (সমরেন্দ্র নাথ) গোস্বামী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেডিয়েশন নিয়ে কাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এখনো হয়নি। আনুষঙ্গিক প্রধান কারণ হচ্ছে ব্যাপক প্রচারণার ঘাটতি। আইনজীবীদের মধ্যে এ বিষয়ে আকুতি ও বিচারকদের মধ্যে আগ্রহ কম। তিনি বলেন, সমাধান হলো, আদালত ও আইনজীবীদের এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। মেডিয়েশন কার্যকর করা গেলে বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি আমূল পরিবর্তন আসবে।

এসএন গোস্বামী আরও বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টে একটি মেডিয়েশন সেন্টার হয়েছে। এটা একটা ভালো দিক। এখন জরুরিভাবে প্রয়োজন মেডিয়েশন-সম্পর্কিত একটি আইন।’  

১৫ বছরে মাত্র ৮৬ হাজার বিরোধ নিষ্পত্তি : পক্ষগণের মধ্যে মামলা পূর্ব ও পরবর্তী কতসংখ্যক বিরোধ আলোচনা, মধ্যস্থতা ও সালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে থাকে না। তবে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা তাদের নিজস্ব উদ্যোগের বিষয়টি নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থার তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছরে ৬৪ জেলার লিগ্যাল এইড অফিস এডিআরের জন্য ৯৪ হাজার ১৫২টি বিরোধ (মামলা পূর্ব ও পরবর্তী) গ্রহণ করে। এর মধ্যে এই সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেল থেকে পাওয়া ৩ হাজার ২৯৩টি অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে এই সময়ে মোট ৯৭ হাজার ৪৪৫টি অভিযোগ গ্রহণ করে লিগ্যাল এইড অফিসগুলো। এর মধ্যে এডিআরের মাধ্যমে ৮৬ হাজার ৫২৭টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। এতে উপকারভোগী হয়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৬ জন। লাখ লাখ মামলা ও বিরোধের বিপরীতে এ পরিসংখ্যানকে হতাশাজনক বলছেন আইনবিদরা।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ডিএলআরের সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এডিআর নিয়ে অনেক কথা হয়। এটি অবশ্যই মামলাজট ও ফৌজদারি অপরাধ কমাতে একটি সহায়ক পদ্ধতি। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো এটি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে যেতে পারেনি। মানুষের মামলার প্রতি আগ্রহ বেশি। অনেক দেশই হয়তো এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে সফল হয়েছে। আমাদের কেন হচ্ছে না, সেটি বিবেচনায় নিয়ে সেভাবেই কাজ করতে হবে।’