শুরুতেই এবারের লোগো পদ্মফুল নিয়ে বিতর্ক, চীন-রাশিয়ার শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সফলতা নিয়ে দেখা দিয়েছিল প্রশ্ন। কিন্তু বিশ্বের শিল্পোন্নত ও বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর এ সম্মেলনে ইতিমধ্যে নিজের অর্জনের ঝুলি ভালোপই পূর্ণ করেছে ভারত। এবারের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক দেশ ভারতের প্রস্তাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পর জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ পেয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ)। এছাড়া জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সংক্রান্ত রেকর্ড পরিমাণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন সদস্য দেশগুলোর নেতারা। তাদের মতৈক্যের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত হয়েছে ‘দিল্লি ঘোষণা’। এসব অর্জনের সঙ্গে ভারত আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে নিজের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়িয়ে নিয়েছে। জোর পেয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ প্রাপ্তির দাবি।
শুরুতেই বড় ঘোষণা : গতকাল শনিবার জি-২০ সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন ‘ওয়ান আর্থ’-এ আসে বড় একটি ঘোষণা। জোটের স্থায়ী সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি ঘোষণা করা হয়। অধিবেশনে এইউ-কে জি-২০ জোটের স্থায়ী সদস্যের আসন গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোটটির সদস্যের আসনে বসেন আফ্রিকার দেশগুলোর শক্তিশালী জোট এইউ’র চেয়ারম্যান আজালি আসওমানি।
এইউ-কে স্বাগত জানানো বক্তব্যে মোদি বলেন, ‘ভারত সাবকা সাথ সাবকা বিকাশ (সবার সঙ্গে সবার উন্নয়ন)-এর নীতি নিয়ে চলেছে। তাই জি-২০’র স্থায়ী সদস্য হওয়ার জন্য ভারত আফ্রিকান ইউনিয়নের নাম প্রস্তাব করে। আমার বিশ্বাস, আপনারা সবাই এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত। আপনাদের সম্মতিতে বৈঠকের কাজ শুরু হওয়ার আগে আমি আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টকে স্থায়ী সদস্যের চেয়ারে বসার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
এরপরই এইউ চেয়ারম্যান আজালি আসওমানি মোদিকে ধন্যবাদ দিয়ে তাদের আসনে বসেন। আঞ্চলিক জোটগুলোর মধ্যে এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জি-২০ জোটের সদস্য ছিল। এখন আরেক আঞ্চলিক জোট এই বৈশ্বিক জোটে যোগ দিল। এর আগে ৫৫ দেশের জোট এইউ ‘আমন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংস্থা’ হিসেবে জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল।
এইউ-কে জোটে নেওয়ার ব্যবস্থা করে ভারত কার্যত গ্লোবাল সাউথে নেতৃত্বের জায়গাও পাকাপোক্ত করল। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এইউ-কে জোটভুক্ত করার কথা জানিয়ে মোদি এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেন, ‘গ্লোবাল সাউথের আকাক্সক্ষার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে জি-২০ সম্মেলনে।’ গ্লোবাল সাউথ বলতে মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ধরা হয়। সম্প্রতি ব্রিকস সম্মেলনেও মোদি দাবি করেছিলেন, ভারত এখন গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানায়, এইউ-কে জি-২০ জোটে নেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুতো বলেন, ‘এ পদক্ষেপের মাধ্যমে আফ্রিকার স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক পরিসরে প্রকাশ করার কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করা হয়েছে।’
ভারতের সভাপতিত্বে ঐকমত্যের রেকর্ড : এবার জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সংক্রান্ত রেকর্ড সংখ্যক ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন সদস্য দেশগুলোর নেতারা। তাদের মতৈক্যের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত হয়েছে ‘দিল্লি ঘোষণা’। ভারতের সভাপতিত্বে চলমান সম্মেলনে এমন অসামান্য ঐকমত্য সবার জন্যই বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা মারাত্মক দুরূহ হয়ে উঠেছিল।
গতকাল শনিবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এক ঘোষণায় বলেন, ‘সুখবর আছে, আমাদের টিমের কঠোর প্রচেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের সহযোগিতায় নয়াদিল্লি জি-২০ নেতাদের সম্মেলনের ঘোষণায় ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে।’
ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদিপ পুরি জানান, জি-২০’র দিল্লি ঘোষণায় মোট ৭৩টি ফলাফল এবং ৩৯টি সংযুক্ত নথি রয়েছে, যা আগের সম্মেলনগুলোর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য, জলবায়ু, জলবায়ু অর্থায়ন সব দিকে আপনি এই জি-২০’র আগে এবং পরে একটি সাধারণ পার্থক্য ধরতে পারবেন।’ এটিকে ‘অত্যন্ত পরিপক্ব ও বুদ্ধিমান খসড়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ভারতীয় মন্ত্রী জানান, ‘এটি যুদ্ধের যুগ নয়’ বলে ঘোষণা শেষ হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে উজবেকিস্তানে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে মোদি বলেছিলেন, ‘আমার মতে এখনকার যুগ যুদ্ধের যুগ নয়।’
নিরাপত্তা পরিষদ নিয়েও ইতিবাচক সাড়া : শনিবার জি-২০ সম্মেলনের মূল আসর শুরুর আগের দিন শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে বাইডেনের পক্ষে বলা হয়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হওয়ার জন্য ভারতের দাবি তিনি সমর্থন করেন। ২০২৮-২৯ সালে ভারত আবার নিরাপত্তা পরিষদে নন-পার্মানেন্ট সদস্য হবে। একেও স্বাগত জানান বাইডেন।
বাইডেন বলেছেন, জি২০’র পর ২০২৪ সালে ভারতে কোয়াডের শীর্ষ সম্মেলন হবে। সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। কোয়াডে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ছাড়া আছে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। মূলত, চীনের প্রভাবের মোকাবিলায় এই জোট করা হয়।
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও একই বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সমসাময়িক বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পুনর্গঠন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে আসা জাতিসংঘ মহাসচিব গত শুক্রবার বলেন, ‘যদি আমরা সত্যিই একটি বৈশ্বিক পরিবার হয়ে থাকি, তাহলে আমরা আজ বরং একটি অকার্যকর পরিবারের মতো। আমাদের মধ্যে বিভাজন বাড়ছে, উত্তেজনা বাড়ছে এবং আস্থা কমে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত দ্বন্দ্বের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী আর্থিক ব্যবস্থা, অকার্যকর ও অন্যায্য। এর জন্য প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার। একই কথা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষেত্রেও বলা যেতে পারে। বহুপাক্ষিক সব সংস্থারই নতুন বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে নতুন কৌশল নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’
মোদির জন্যও বড় সুযোগ : এবারের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের উদ্যোগে যেসব ইতিবাচক অর্জন সে সবের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সাফল্যের দাবিদার। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে লিখেছে, বৈশ্বিক সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে ভারতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে, যেখানে মোদিরও চমক দেখানোর সুযোগ এসেছে। বিশ্বের দুই বড় নেতা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবারের সম্মেলনে উপস্থিত হননি। এটা ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নেতা হিসেবে মোদির পরিচয় পাওয়ার বড় সুযোগ বটে। এই সুযোগ মোদির সামনে এমন সময়ে এসেছে যখন তিনি ২০২৪ সালে তৃতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে চাচ্ছেন। সিএনএনের বিশ্লেষক রিয়া মোগালের মতে, এ সম্মেলন বিশ্বমঞ্চে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব জাহির করতে ‘মোদি ঝলক’ দেখানোর দারুণ সুযোগ।
ভারতের ভূমিকায় চীনের চিন্তা : জি-২০ সম্মেলনে ভারতের প্রাপ্তির ঝুলি ভরতে থাকা নজর এড়াচ্ছে না চীনের। ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশটির শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা সংশ্লিষ্ট থিংক ট্যাংক এ নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে। চায়না ইনস্টিটিউট অফ কনটেম্পোরারি ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স ভারতের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির মতে, জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আসর। কিন্তু সম্মেলনকে নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য অপব্যবহার করছে ভারত। এমনকি দেশটি বিতর্কিত কাশ্মীর, অরুণাচলেও নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থপূরণে সম্মেলনকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ চীনা সংস্থাটির।