সব দেশ থেকেই কমছে রেমিট্যান্স

বিদেশি মুদ্রা সংকটের সময়ে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ দেশ থেকেই কমছে প্রবাসী আয়। বিশেষ করে দেশের প্রবাসী আয় সংগ্রহের প্রধান হাব মধ্যপ্রাচ্যের ৫টি দেশ থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ১৬ শতাংশ কম আয় এসেছে। হঠাৎ করেই প্রবাসী আয় সংগ্রহের শীর্ষ তালিকায় উঠে আসা যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। পশ্চিমা অন্য দেশগুলো থেকেও কমছে বিদেশি মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এ খাতটি। এতে দেশের বিদেশি মুদ্রার সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলাবাজারে ডলারের দরে বড় ব্যবধান থাকায় মানুষ ব্যাংকিং চ্যানেলে কম অর্থ পাঠাচ্ছেন। অতি মুনাফার আসায় হুন্ডিতে ঝুঁকছেন বেশিরভাগ প্রবাসী। পাশাপাশি নির্বাচনী বছর হওয়ায় অর্থপাচারও বেড়েছে। এতে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়েছে বলেও মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৫৭ কোটি ২৬ লাখ ডলার। অথচ, গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪১৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমেছে ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রবাসী আয় সংগ্রহের প্রধান হাব ধরা হয় মধ্যপ্রাচ্যকে, যেখানে প্রবাসীদের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজে নিয়োজিত। সেই মধ্যপ্রাচ্যের ৫ দেশ থেকেই গত দুই মাসে গড়ে রেমিট্যান্স কমেছে ১৬ শতাংশ। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে কাতার থেকে, ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। একমাত্র ব্যতিক্রমী ওমান, যে দেশ থেকে এ সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৩ দশমিক ২৮ শতাংশ।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, বর্তমানে সব মিলিয়ে বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৮৭ হাজার ৬১০ জন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশেই রয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ২২ হাজার ৮৬৩ জন। অর্থাৎ দেশের প্রবাসী জনশক্তি ৭৪ দশমিক ৮৮ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশে অবস্থান করছে। শুধু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই এই ছয়টি দেশে মোট নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৮১২টি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এসব দেশ থেকে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ১৮৩ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় (১০৯ টাকা দরে) যার পরিমাণ ২০ হাজার ২৮ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২০৪ কোটি ডলার বা ২২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের প্রথম দুই মাসে একজন প্রবাসী এসব এলাকা থেকে ১৯ হাজার টাকার বেশি পাঠিয়েছেন। সেখানে চলতি বছর প্রায় চার লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পরও পাঠানো টাকার পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার টাকা। এক কথায় এসব দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও প্রবাসী আয় বাড়ার পরিবর্তে কমেছে।

তথ্য বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশির পরিমাণ ৫০ হাজার ৫৬৭ জন। বছরের প্রথম ছয় মাসে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৩ হাজার ২৬০টি। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবাসী আয় কমার দিকে শীর্ষে অবস্থানে রয়েছে দেশটির। দেশটি থেকে প্রবাসী আয় কমেছে ৬৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

শতাংশের হিসাবে প্রবাসী আয় কমার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপান, যেখান থেকে কমেছে ৬৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। যদিও চলতি বছর এই দেশে নতুন কিছু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আয় কমে যাওয়ার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এ দেশটি থেকে প্রবাসী আয় কমেছে ৪৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

গত অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে দেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী সৌদি আরবকে পেছনে ফেলে হঠাৎ করেই শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশটি থেকে প্রবাসী আয় কমতে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে কম রেমিট্যান্সের কারণে চার নম্বরে নেমে এসেছে। গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে প্রায় অর্ধেক বা ৪৮ দশমিক ৭২ শতাংশ।

এছাড়া গত দুই মাসে কাতার থেকে ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ, কুয়েত থেকে ১৯ শতাংশ, মালয়েশিয়া থেকে ১৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ, বাহরাইন থেকে ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ ও ইতালি থেকে ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। সবচেয়ে বেশি প্রবাসীর অবস্থান সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স কমেছে ১৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এতে করে শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছে সৌদি আরব। এদিকে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ কমলেও গত দুই মাসে শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশ হিসেবে উঠে এসেছে আরব আমিরাত।

তবে এই সময়ে ব্যতিক্রম দেখা গেছে, দুটি দেশে। গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স বেড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ৪৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার পর সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে এই দেশে। দেশটিতে নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৭৬ হাজার ৬৮০টি। আর রেমিট্যান্স বাড়ার দিকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্য। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। চলতি বছর দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ২ হাজার ৬৪৬টি।