কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সেবায় নতুনত্ব আনার শর্তে ২০১৩ সালে সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংককে অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শুরু থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ব্যাংকটি। উদ্যোক্তা-পরিচালকদের একটি বড় অংশই ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকায় ব্যাংকটিতে সব সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতি দেখা দেয়। ব্যাংকটির নিয়মিত কার্যক্রমে পরিচালকদের হস্তক্ষেপে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না। পরিচালকদের অনৈতিক হস্তক্ষেপে বাধ্য হয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা পদত্যাগ করছেন।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার নিয়মিত কার্যক্রমে খেলাপি পরিচালকদের অনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন এসবিএসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাবিবুর রহমান। শুধু হাবিবুর রহমানই নন, ব্যাংকটির গত ১০ বছরের কার্যক্রমে ব্যাংকটির পাঁচ এমডির চারজনই মেয়াদ পূর্তির আগেই পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। যাদের চাপে এসব ব্যাংকার পদত্যাগ করেছেন, সেই সব পরিচালকের অধিকাংশই অন্য ব্যাংকের ঋণখেলাপি, যারা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনে পরিচালক পদে বহাল রয়েছেন।
ব্যাংকটির আগের এমডিরা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিচালনা বোর্ডে খেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের আধিপত্যে এগোতে পারছে না নতুন প্রজন্মের এই ব্যাংক।
২০১৩ সালে যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন লকপুর গ্রুপের চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন। ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের মামলা থেকে বাঁচতে তিনি বিদেশে পালিয়ে যান। এরপর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আলোচিত দুই ঋণখেলাপি আব্দুল কাদির মোল্লা ও মিজানুর রহমানের হাতে। তারা দুজনই ঋণখেলাপি হয়েও আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনে পরিচালক পদে থেকে পুরো ব্যাংক চালাচ্ছেন। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাজে নিয়মিত হস্তক্ষেপ করছেন। পরে থার্মেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির মোল্লা এসবিএসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদও হাতিয়ে নেন। তবে সম্প্রতি তাকে চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে হয়েছে। কাদির মোল্লা রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের খেলাপি। আইন অনুযায়ী, কোনো খেলাপি গ্রাহক ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকতে পারেন না। কিন্তু কাদির মোল্লা পরিচালক থাকতে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন।
ব্যাংক সূত্র বলছে, সাউথ বাংলা ব্যাংকের ঋণ বিতরণ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই হস্তক্ষেপ করছেন তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ পাইয়ে দিতেও সহায়তা করেন। এর বিনিময়ে তিনি এবং অন্য পরিচালকরাও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ বাগিয়ে নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সাউথ বাংলা ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দিয়েছে ৭১৫ কোটি টাকা। যদিও নিজ ব্যাংক থেকে সাউথ বাংলা ব্যাংকের পরিচালকরা ঋণ নিয়েছেন মাত্র ২২ কোটি টাকা।
শুধু আব্দুল কাদের মোল্লাই নন, আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে এই ব্যাংকের পরিচালক পদে বসে আছেন আলোচিত খেলাপি মুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। অগ্রণী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় তিনি ২০১৬ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অগ্রণী ব্যাংকের ২২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। যদিও পরে তিনি জামিনে বের হয়ে খেলাপির বিষয়ে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, নানা অনিয়মের কারণে সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংকের খেলাপি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত ছয় বছরে ব্যাংকটির খেলাপি বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি। বর্তমানে ব্যাংকটির বিতরণের পরিমাণ ৭ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৩৯৭ কোটি।
জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান রফিকুল ইসলাম। টানা দুই মেয়াদের ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। তারপর আর কোনো এমডি তার দায়িত্ব পূরণ করতে পারেননি। এর পেছনে পরিচালকদের অনৈতিক চাপকেই দায়ী করেছেন একাধিক সাবেক এমডি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন, অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধভাবে ঋণ অনুমোদনে চাপ তৈরি করার কারণেই তারা এই পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সাউথ বাংলা ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন গোলাম ফারুক। এসবিএসির তৎকালীন চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ২০২০ সালের মার্চে পদত্যাগ করেন। বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনের বিদেশ ভ্রমণে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিষেধাজ্ঞা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। ওই সময় ব্যাংকের এমডি ও প্রভাবশালী দুজন পরিচালককে সন্দেহ করা হয়। আর এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় ব্যাংকের পর্ষদ। শেষ পর্যন্ত মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগেই পদত্যাগ করেন এমডি।
এরপর ২০২০ সালের জুলাই মাসে এমডি হিসেবে যোগ দেন তরিকুল ইসলাম চৌধুরী। কিন্তু আট মাস না পেরোতেই পদত্যাগ করেন তিনি। ২০২১ সালের এপ্রিলে এই পদে যোগ দেন মোসলেহ উদ্দিন। ২০২২ সালের অক্টোবরে তিনি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দিলে সাউথ বাংলা ব্যাংকের এমডি পদে আবারও শূন্যতা দেখা দেয়। পরে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হাবিবুর রহমানকে নিয়োগ দেয় ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আট মাসের মাথায় গত সপ্তাহের শেষ দিকে তিনিও পদত্যাগ করেন। বর্তমান পদে তার মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখন পরিচালনা পর্ষদ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলেই তার পদত্যাগ কার্যকর হবে।
ব্যাংকটির সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে বক্তব্যের জন্য বর্তমান চেয়ারম্যান আবু জাফর মোহাম্মদ শফিউদ্দিন, পরিচালক কাদির মোল্লা ও পদত্যাগ করা এমডি হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কেউ সাড়া দেননি।