কোটা আন্দোলনের ঝড় থেকে জন্ম একটা পার্টির। দেশবাসীকে তারা ভাষা দিলেন। জয় করে নিলেন দেশের তরুণচিত্ত। পার্টির নাম ‘গণ অধিকার পরিষদ’। যার সঙ্গে কিছুটা তুলনীয় কেবল সর্বহারা পার্টি ও জাসদ।
সিরাজ সিকদারকে নিয়ে আহমদ শরীফ বলেছিলেন, কোনো তরুণ বিপ্লবী নেতার মধ্যে স্বল্পকালের মধ্যে এমন জাদুব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলেনি। একই কথা সিরাজুল আলম খান ও আ স ম রবের বেলায়ও সত্য। তাদের নিয়ে সেরা কবিরা কবিতাও লিখেছেন।
জাসদের নেতাদেরও জন্মের একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া আছে। তাদের ছিল একদল তাত্ত্বিক। যারা রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছিলেন। তার ভিত্তিতে ছিল কর্মসূচি। কর্নেল আবু তাহেরের ভাষায় আগুন জ্বালাতে এসেছিলাম, জ্বালিয়ে গেলাম।
তরুণ দত্ত ১৯৭০ সালের ৪ জুলাই সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় লিখলেন, দুটো কথা খুব শোনা যাচ্ছে। এক. এই সমস্ত বিপ্লবী ভ্রান্ত কিন্তু গভীরভাবে আন্তরিক। দুই. বাঙালি যুবকদের যেটি সবচেয়ে মেধাবী অংশ, তারাই এই আন্দোলনের মধ্যে নিমগ্ন। অর্থাৎ সমাজের বিকাশের পক্ষে সেই সবচেয়ে মূল্যবান শ্রেণি যারা ধীসম্পন্ন ও অনুভূতিপরায়ণ, তারাই এই বিপ্লবের নেতা। এদেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সেই ছাপ নুরুল হক নুর ফেলতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।
বিদ্যমান রাজনীতি পাল্টাতে পার্টিগুলোর মধ্যে দেখেছি। শুধু থিসিস নয়, রীতিমতো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বিদ্যমান রাজনীতি বদলাতে হয়তো পারেনি, কিন্তু কর্মীবাহিনীসহ ব্যাপক পাঠক সমাজের মনোজগৎ নির্মাণে এই প্রকাশনাগুলোর ভূমিকা আছে। এইসব পার্টির বদলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় এসেছে এবং জনসমর্থনও বেশি, তাদের কাছে রাজনীতিতে থিসিস ও তত্ত্বচর্চার গুরুত্ব ছিল না। তবুও প্রতিষ্ঠা সময়ে মওলানা ভাসানীর ২১ দফা, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ও এরশাদের ১৮ দফা ছিল।
২
গণ অধিকার পরিষদ যেন তত্ত্বহীন যুগের সংগঠন। তত্ত্ব ছাড়া সংগঠন হলো খুঁটিহীন ঘর। ঝড় এলে ভেঙে পড়াই যার নিয়তি। ১৯ মের সমাবেশে গণঅধিকার পরিষদ যে কর্মসূচি নিয়েছিল, সেখানে দাবি ছিল, দুর্নীতি ও দুঃশাসন। অর্থাৎ স্পষ্ট থেকে বিমূর্ত কর্মসূচির দিকে যাত্রা। রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচিও বাদ দিয়েছে। ক্ষমতার জন্য তারা এমন ঘর বেঁধেছে, যে ঘরের গোড়ায় খুঁটি ও মাটি নেই। সবে মাত্র খুঁটি, আর তা ছিল কোটার ইস্যু। যা আজ অতীত।
কোটা আন্দোলনের সময় ‘উদ্বিগ্ন অভিভাবক সমাজ’-এর ব্যানারে রাস্তায় দাঁড়ানো, আইনি সহযোগিতা, ডাকসু নির্বাচনে অর্থ ও অফিস দিয়ে নানান ধরনের সহযোগিতা করেছে রাষ্ট্রচিন্তার বন্ধুরা, তাদের ভূমিকাও নুররা ভুলে গেল। পরে ছাত্র অধিকার পরিষদ, যুব অধিকার পরিষদের নেতারা ও রাষ্ট্রচিন্তার কর্মীরা এক মেসে থাকা, যুব অধিকারে নেতৃত্ব বণ্টন পর্যন্ত হলো। সিদ্ধান্ত হলো, মূল পার্টির নাম হবে ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’। হাসনাত কাইয়ূম আহ্বায়ক ও নুরুল হক নুরের সদস্য সচিব হয়ে রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত, অধ্যাপক আসিফ নজরুলের নামও এসেছিল পরে। তা আর পরিণতির দিকে গেল না। ডেকে আনলেন বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা রেজা কিবরিয়াসহ সামরিক বাহিনীর সাবেক কয়েকজন কর্তাকে।
সর্বহারা পার্টি, জাসদের ছিল তাত্ত্বিক ফ্রন্ট। যারা বিশ্লেষণ হাজির করতেন। যারা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। জুলফিকার আলি ভুট্টো, মাত্র আড়াই বছরে পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রিয়তম পার্টিতে পরিণত করেছিলেন। এই পার্টির প্রধান তিনজন উদ্যোক্তা ছিলেন। ছিল ভুট্টোর নিজের ক্যারিসম্যাটিক চরিত্র, নীতিগত দলিলগুলো লিখতেন আরেকজন। তার নাম জালালুদ্দীন আব্দুর রহিম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চরতর ডিগ্রি নেন, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রেও পড়েন। গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন পিপলস পার্টির সেক্রেটারি। আরেকজন ছিলেন মুবাশ্বির হাসান, যার ছিল নেতা ভেড়ানোর ক্ষমতা। গণ অধিকার পরিষদে এরকম কিছু নেই।
এরপর ভাসানী অনুসারী পরিষদ, গণসংহতি, ছাত্র-যুব-শ্রমিক অধিকার পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে কর্মসূচি পালিত হতে থাকল। কথা উঠল, এই ৪টি সংগঠন একটি পার্টিতে পরিণত হওয়া যায় কি না। তাও হলো না।
রেজা কিবরিয়া ও নুরদের সম্পর্কে এতদিন কানাঘুষা ছিল। তদন্ত রিপোর্টে ১০ শতাংশও সত্য হলে বাংলাদেশের জন্য তা দুঃসংবাদ। প্রশ্ন ওঠা দরকার, কেন যৌথ মালিকানা ব্যক্তিগত হয়ে যায়? আসলে সংগঠনের ভেতর গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকার পরিণতি এটাই। দলটি ভেঙে গেল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাহলে ভাঙছে না কেন, সে আরেক আলোচনা।
৩
লেখাটি যখন লিখেছিলাম, তখন সংগঠনটি কেবল বিভক্ত হয়েছে। দুটি অংশই নিজ নিজ জমায়েত বাড়াতে মনোযোগী। জনগণের আলোচনায় তারা আর নেই। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও আর তাদের নাম মুখে নিচ্ছে না। ধর্মপন্থি দলগুলোও না। ফরহাদ মজহারের মতো তাত্ত্বিকরা সম্ভাবনাময় মনে করেছিলেন, তিনি গণতন্ত্র মঞ্চ ভাঙার অভিযোগ তুলেছেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও অধ্যাপক আসিফ নজরুলের মতো প্রবীণরা ছিলেন। আছেন এখন আসিফ নজরুল। ৫৪-এর নির্বাচনী জনসভায় ভাসানী হুজুরের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুও গেছেন ময়মনসিংহে। ঢাকায় ফিরে আলাপের মাঝখানে কর্মীদের জানালেন, আমরা ওখানে জিতব না। কর্মীরা জানতে চাইল, কেন? তখন বললেন, জনসভায় সব চেংরা বেংরা, মুরব্বি কই?
তরুণরা আগামীর মানুষ। সেই তরুণরা ফুল না ফুটতেই ঝরে গেল। গণ অধিকার পরিষদও সম্ভবত তাই হলো।
লেখক : লেখক ও সংগঠক
nahidknowledge1@gmail.com