বিনিয়োগের বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি স্থানান্তর

চীন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ায় বাংলাদেশের পোশাক খাতে বিনিয়োগের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে কমনওয়েলথের বিনিয়োগকারীদের। বাংলাদেশ পোশাক ছাড়াও বহুমাত্রিক পণ্যে বিনিয়োগের দিকে হাঁটছে। তবে এ মুহূর্তে বিনিয়োগের বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুুক্তি স্থানান্তর। গতকাল বুধবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে কমনওয়েলথ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের প্যানেল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানের প্যানেল আলোচনায় ইউনিলিভার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জাভেদ আখতার বলেন, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল হওয়ায় ব্যবসা পরিবেশ আমাদের অনুকূলে। তবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে আমাদের। এ দেশের এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি প্রযুক্তি স্থানান্তর। এখানে প্রযুক্তি স্থানান্তর করতে বহুমাত্রিক পরিকল্পনার প্রয়োজন। কারণ এখনো বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ ব্যবসার অনুকূলে। বাংলাদেশে কোনো পণ্য যদি ২২ ডলারে উৎপাদন করতে হয়, ভারতে একই পণ্য উৎপাদনে ৪৪ ডলার খরচ হয়।

প্যানেল আলোচনায় বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগে স্পেশালাইজেশন আছে। বাংলাদেশ ইউকেসহ বিভিন্ন দেশে জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। সাফল্যের পেছনের গল্প মূলত দেশের পোশাক শিল্প নিয়ে। জিএসপি সুবিধা, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও অবকাঠামো উন্নয়ন তিন দিকে একসঙ্গে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে।

এ সময় এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বাংলাদেশ এখন মধ্য আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের পথে যাচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানাগুলো সবুজ কারখানায় পরিণত হচ্ছে। বিশে^র শীর্ষ ৭টি সবুজ কারখানাই এদেশে। সব কমপ্লায়েন্সে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ এগিয়ে।

ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্টর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্রীনি নাগরাজন বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রস বর্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য ছোট ছোট বিনিয়োগগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্যানেল আলোচনা শুরুর আগে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, আমরা বিশে^ ঘন বসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আমাদের ঘনবসতি নিয়ে আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের বন্ধু এক ধরনের ধারণা পোষণ করেন। তবে বাংলাদেশ পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বৈচিত্রায়নের দিকে যাচ্ছে। আমরা কৃষিকে বৈচিত্রায়ণ করছি। কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে আমরা উৎসাহিত করছি। এখানে বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে যেতে হলে আমাদের অবশ্যই প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। সবাই পোশাক খাত নিয়ে কথা বলে কারণ চীনের পরই আমরা দ্বিতীয় অবস্থানে। কিন্তু চীনের পোশাকে নানান নিষেধাজ্ঞা আসায় তারা এ শিল্প থেকে সরে আসছে। ক্রেতারা বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছেন। সুতরাং পোশাকে বিনিয়োগের আরও বড় সুযোগ এখানে আছে।

 পোশাকের বিনিয়োগের খাত দেখিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদনে যেমন দ্বিতীয়, তেমন পোশাকের বর্জ্য উৎপাদনেও শীর্ষে। কারণ সব ফেব্রিক শতভাগ ব্যবহার হয় না। এ বর্জ্যকে রিসাইক্লিং করে আবার সুতা উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে বহু কোম্পানি। কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি রিসাইক্লিংয়ে বিনিয়োগ করেছে। আরও বিনিয়োগ আসবে। বাংলাদেশ সার্কুলার ইকোনমিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। কারণ সার্কুলার ইকোনমিতে প্রযুক্তির বিনিয়োগ সারা বিশে^ই বাড়ছে। আমরাও সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।

এ উপদেষ্টা বলেন, বিশে^র পোশাকের ৭০ শতাংশ চাহিদাই রয়েছে কৃত্রিম তন্তুর। কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক উৎপাদনের ৯০ শতাংশই কটনের। সুতরাং ম্যান মেইড ফাইবার তথা কৃত্রিম তন্তুতে বিনিয়োগের বিশাল সুযোগ রয়েছে এখানে।

সালমান এফ রহমান আরও বলেন, আমাদের যেসব সমস্যা ছিল, সেগুলো থেকে বেরিয়ে এসেছি। বিদ্যুতের সমস্যা থেকে উতরে গিয়েছি। সড়ক ও রেল যোগাযোগে বিশাল বিনিয়োগের পর বাণিজ্য যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে।

একই দিনে আরেক সেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কমনওয়েলথ অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে ই-কমার্স এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিতে হবে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ক্রস-বর্ডার বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে কমনওয়েলথ। সেক্ষেত্রে নিরাপদ বাণিজ্যে সাইবার সিকিউরিটিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে।

গতকাল বুধবার সকালে ঢাকায় প্রধান অতিথি হিসেবে কমনওয়েলথ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের উদ্বোধন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কমনওয়েলথ এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিলের (সিডব্লিউইআইসি) সহযোগিতায় বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সম্মেলনের আয়োজন করছে।

সম্মেলনের প্রথম দিনে ‘বৈশ্বিক অর্থনীতি : বাণিজ্যে বাধা ব্রেকিং ডাউন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প বিকাশে কমনওয়েলথ দেশগুলোতে এসএমই উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো যায়।

টিপু মুনশি মনে করেন কমনওয়েলথ সদস্য দেশগুলোর জন্য বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার ‘বিশেষ নীতি’ সহায়তা প্রণয়ন করা উচিত যাতে নিজেদের অর্থনীতির বিকাশ করতে পারে।

আলোচনাপর্বে সম্মানিত অতিথি ছিলেন ডমিনিকা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভিন্স হেন্ডারসন। শ্রীলঙ্কার বিনিয়োগ প্রতিমন্ত্রী দিলুম এস আমুনগামা, ক্যামেরুন সরকারের অর্থমন্ত্রী লুই পল মোতাজে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জি ফাউন্ডেশন সম্মেলনের অংশীদার। দুদিনব্যাপী সম্মেলনে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর ১৩ জন মন্ত্রীসহ ৩০০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে সিডাব্লিউআইসি চেয়ারম্যান লর্ড মারল্যান্ড বলেন, বাংলাদেশ কমনওয়েলথ দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। মারল্যান্ড বলেন, বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্বে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। কমনওয়েলথের দেশগুলো বাংলাদেশের পোশাকশিল্প থেকে শিখতে পারে। কমনওয়েলথের মাধ্যমে সব সম্ভাবনাকে সহযোগিতা করতে চাই। প্রায় ২৫০ কোটি মানুষের আবাসস্থল কমনওয়েলথ দেশগুলো উন্নত অর্থনীতি এবং উন্নয়নশীল উভয়কে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে।

পরে বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ‘কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য : একটি ইতিবাচক কর্মপরিবেশ তৈরি’ শীর্ষক আরেকটি অধিবেশন। সেশনে অংশ নেন যুক্তরাজ্যের এমপি পল ব্রিস্টো এবং ইনস্টিটিউট অব অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথের হেড অব স্ট্র্যাটেজিক এনগেজমেন্ট অ্যালান স্টিভেনস এবং জাই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জিল্লুর হোসেন।

কমনওয়েলথ নামে পরিচিত কমনওয়েলথ অফ নেশনস ৫৬টি সদস্য রাষ্ট্রের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার বেশিরভাগই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রাক্তন অঞ্চল।