ফলোআপ

গোপীগঞ্জের গফফার গাইনকে একজন মোটা বুদ্ধির লোক বলে সবাই জানে। তার চৌদ্দ পুরুষের কেউ কোনোদিন গাঁয়ের মোড়ল সাজার সাহস দেখায়নি। আজকাল গফফারের মাথায় কীভাবে যে কখন কী আসে তা তার আপনজনরাও বুঝতে পারে না। গফফার ইদানীং অনেক জিনিস নিজে নিজে ভাবে, ভাবতে বাধ্য হয় এবং তার সামনে আগে-পিছে যা ঘটে তার একটা বোধগম্য ব্যাখ্যা সে দাঁড় করায়। গফফারের বাবা বদরউদ্দীন ছিলেন সাদা মনের মানুষ, কারও সাতে পাঁচে মাথা ঘামানো তার স্বভাবে ছিল না। ফলে রাতে তার ভালো ঘুম হতো। নিজের গোলার ধান, গোয়ালের গরুর দুধ, ক্ষেতের তরকারি আর পুকুরের মাছ ছিল তার প্রিয় খাবার। বদরউদ্দীনকে কেউ কেনোদিন ফ্যাতনা ফ্যাসাদ করতে দেখেনি বা শোনেনি।

কেন জানি গফফারের মাথায় আজকাল ভালো ঘুম হওয়া-না হওয়া নিয়ে নানান ভাবনা আসা-যাওয়া করে। বাপজান বদরউদ্দীনের কাছে ডাক্তার বিধান রায়ের গল্প শুনেছে সে। সাতক্ষীরার দেবহাটার বিধান রায়ের হাতপাত দুই-ই ভালো ছিল। অর্থাৎ জনসেবা করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী বিধান বাবুর স্টেথোস্কোপ রোগীর নাড়ি বোঝার পাশাপাশি আশপাশে সবার মতিগতি বুঝতেও ব্যবহৃত হতো। বিধান বাবু মস্ত বড় ডাক্তার। তবে তার চিকিৎসা করার পদ্ধতিটা ছিল ভিন্ন। তিনি রোগীর মনের চিকিৎসায় পারদর্শী ছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘একটি পেরেকের কাহিনী’ লিখেছিলেন ডাক্তার বিধান বাবুকে কেন্দ্র করেই। একটি বালকের পায়ে পেরেক ফুটে, সে ভীষণ যন্ত্রণায় কাতর, তার গ্যাংগ্রিন হওয়ার জোগাড়, হাসপাতালের বেডে শুয়ে সে কোনো এক নামি ডাক্তারের আগমনে অধীর আগ্রহে থাকে।  অবশেষে  স্বয়ং বিধান বাবু তাকে দেখতে এসেছেন, এটা জেনেই তার মনে হলো, ব্যথা কমতে শুরু করেছে । বিধান বাবু তাকে দেখলেন, বললেন, তোর তেমন কিছুই হয়নি, তুই উঠে দাঁড়া, হাঁটতে শুরু কর। এসব বাপজানের কাছে যখন শুনছিল গফফার, ঠিক সে সময় ভূপেন হাজারিকার গান বেজে ওঠে তাদের রেডিওতে মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না... বল কি তোমার ক্ষতি জীবনের অথৈ নদী পার হয় তোমাকে ধরে দুর্বল মানুষ যদি...

বিধান বাবুর চেম্বারে রোগীরা আসে। অনেকেই অনুযোগ তোলেন ডাক্তার বাবু আমার ভালো ঘুম হয় না। তিনি এ রকম ১২-১৩ জন রোগীকে দুদিন বাদে রাত ১০টায় তার চেম্বারে আসার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিলেন। রাত ১০টায় ১২ জন হাজির। বাবু রাজ্যের  মুখ্যমন্ত্রী আবার রোগীও দেখেন। তিনি বললেন গাড়ি লাগাও, ১২ জনকে গাড়িতে তুলতে বললেন। সন্দেশখালীর সুখেন, হাসনাবাদের হরেন, বর্ধমানের বসির পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। মুখ্যমন্ত্রী তাদের গাড়িতে তুলে কোথায় নিয়ে যাবেন কয়েদখানায় না তো! কেউ বলল, ‘আরে ধ্যাত! আমরা বলেছি আমাদের ঘুম হয় না, এটা কি দোষের কিছু? আমরা তো তার সরকারের কোনো সমালোচনা করিনি। আমাদের এই কথায় বিরোধী দল তো কোনো ইস্যু বানায়নি।’

দাশকাটির দবির বলল ‘এটা কি রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজ বা শৃঙ্খলা পরিপন্থি কিছু?’ আফজাল সরদার পঞ্চায়েতের লোক কাউকে সনদ দেওয়ার সময় দুটি কথা তাকে বাড়তি  লিখতেই হয় ‘সে সম্ভ্রান্ত বংশের লোক, সে রাষ্ট্র বা শৃঙ্খলাভঙ্গের কোনো কাজের সাথে জড়িত নয়।’ যত লোক সনদ নিতে আসে তারা সবাই সম্ভ্রান্ত বংশের লোক তো বটেই, অচ্ছুত ইতরদের ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট লাগে না কি? কেউ ওয়ারিশান সার্টিফিকেট নিতে এলে বোঝা যেত তাদের সহায় সম্পত্তি এবং চৌদ্দগোষ্ঠীর নাম; আর রাষ্ট্র এবং ‘শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ’ যে  কত বড় অপরাধ তা তো ক্ষুদিরামের ফাঁসির ঘটনা থেকে বোঝা যায়। ‘বড় লাটকে মারতে গিয়ে মা মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী’, ‘মাসির ঘরে জন্ম নিলে, তখন যদি চিনতে পারিস মা দেখবি গলায় ফাঁসির দড়ির দাগ।’ তখন তো ছিল পরাধীন ইন্ডিয়া, আর এখন স্বাধীন ভারত। রাষ্ট্র ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজের সঙ্গে এই ১২ জন জড়িত কিনা কিংবা অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় তাদের ঢুকানো হবে কিনা এসব নিয়ে তারা বেশ চিন্তিত।

গাড়িতে উঠতেই চালককে ডাক্তার বাবু বললেন, ‘শিয়ালদহ স্টেশনে যা’। তখন ১২ জনের একজন রতনপুরের পাঁচু মোল্লার গলা শুকিয়ে কাঠ হওয়ার জোগাড়। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বাবু তাদের কালাপানির পথ দেখিয়ে ট্রেনে তুলে দেবেন না তো! পাঁচু মোল্লা মনে করতেই পারল না সে কোনোদিন এমন কোনো কথা বলেছে কিনা, যাতে তার আন্দামান দীপপুঞ্জে চালান করার দরকার হবে? সবাইকে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে ডাক্তার বাবু বললেন, ‘যা তোরা স্টেশনটা ঘুরে ঘুরে দ্যাখ- আধা ঘণ্টার মধ্যে আবার গাড়ির কাছে আসবি।’ সবাই ঘুরেফিরে হাওয়া খাওয়ার মতো ভাব দেখিয়ে গাড়িতে ফিরে এলো। ডাক্তার বাবু জানতে চাইলেন কী দেখলি?

পরানপুরের হরেন ম-ল বলল আজ্ঞে দেখলুম মুটে মজুরিরা কেউ কাগজ বিছিয়ে ইট মাথায় দিয়ে, কেউ নিজের ঝুড়িতে গোল হয়ে দিব্যি ঘুমাচ্ছে। অন্যরাও প্রায় একই কথা বলল। ডাক্তার বাবু বললেন ‘তোদের চিকিৎসা এখানে শেষ। বাড়ি গিয়ে ভেবে দেখবি ওদের যদি এভাবে ঘুম হয় তবে তোদের কেন হবে না! ওদের মাথায় নয়ছয়ের প্যাঁচপোচ নেই, দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা নেই, কারও সাতে পাঁচে নেই তারা ওরা সকালে এক কথা বিকেলে আরেক কথা বলে সন্ধ্যেবেলা জিভ কাটে না। এরা কাউকে সকালে জাত তুলে গালাগাল করে দুপুরে স্বার্থের কারণে গলাগলি করে না, আবার কিছুক্ষণ পর তার কারও বিরুদ্ধে নাখোশ হয়ে তাদের গালাগাল করতে সময় লাগে না। তোদের ঘুম না হওয়ার কারণ তোদের স্বভাব, তোদের কর্মকা- তোদের স্বার্থচিন্তা, সহায় সম্পত্তি আর স্ববিরোধী কাজ বা বক্তব্য। তোরাই তোদের নিজেদের দোষ দেখিস না অন্যের দোষ ধুড়ে (তালাশ) বেড়াস। মানুষকে শত্রু বানিয়ে ভয় পাস আবার সময় হলে নিজে তাকে দলে এনে কোলে বসাস।’ 

ডাক্তার বাবুর সঙ্গে যে ১২ জন গিয়েছিল শিয়ালদহ স্টেশনে তাদের জ্ঞান চক্ষু যেন খুলে গেল। তাই তো নয়ছয় মেলাতে গিয়ে আজ শত্রুকে ফাঁসাতে গিয়ে আমাদের চোখের ঘুম হয়েছে ফেরারি। আমিই আমার শত্রু। আমরাই আমাদের শত্রু। পররে দোষ দেই। হরেন ম-ল দিব্য চোখে দেখল পঞ্চায়েত ভোটের আগে গফুর সরদারের সঙ্গে এত প্যাঁচাল পাড়লাম তাকে গালিগালাজ করলাম, আবার দুদিন পর তার সঙ্গে মাখামাখি করে সবারে দেখাতে চাইলাম গফুর সরদার আর আমি এক। এ যেন আমার বাড়ি বরিশাল তোমার বাড়ি ঘোড়াশাল এ ধরনের কত মিল খুঁজে পাওয়ার পালা গান। সাপখালির গফুর সরদারের মনে পড়ল তার ছেলে হাবিব একদিন তাকে বলেছিল, ‘বাপজান প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজেকে ফাঁসাবেন না। আপনি অন্যের দোষ যত খুঁজবেন আপনার নিজের দোষের প্রতি সন্দেহ বাড়বে, তত প্রকাশ পাবে।’

হাবিব সাহিত্য পড়ে সে সেদিন বলছিল, ‘ডাইনিরা বলেছে ম্যাকবেথ রাজা হবে। সে ধান্দায় সস্ত্রীক সেনাপতি ম্যাকবেথ তাদের বাসায় নিজের আশ্রয়ে রাজা ডানকানকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে। নাট্যকার শেক্সপিয়ার লিখেছেন, এভাবে  ম্যাকবেথ দম্পতি যেন  নিজেদের ‘ঘুম’কে হত্যা করেছে। এরপর আজীবন তারা আর ঘুমাতে পারেনি এমনকি তাদের মনে হয়েছে খুন হওয়া রাজার রক্ত তাদের হাতে লেগে রয়েছে। তারা হাত কচলিয়ে ধুয়ে শত চেষ্টা করে এমনকি বিশ^সেরা পারফিউম মেখেও আজীবন চেষ্টা করল সেই রক্তের দাগ মোছার জন্য, সেই গন্ধ ভোলার জন্য। ডাক্তার বাবু তোমাদের ঘুম হওয়ার জন্য কোনো ওষুধ দেন নাই তিনি বরং ১২ জনকে তাদের কৃতকর্মের ফলোআপ করায় মন দিয়ে মন পরিষ্কার করার তাগিদ দিয়েছেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের হরাইজেন্টাল ও ভার্টিকেল সম্পর্ক কীভাবে রক্ষিত হবে, উন্নত হবে সে চিন্তাচেতনায় মগ্ন হতে  হলে বারবার পেছনে তাকাতে হবে। ফলোআপ করতে হবে কিছুক্ষণ আগে কী করলাম বা বললাম আর এখন কী করছি বা বলছি। আত্ম সমালোচনায় নিজের মন পরিষ্কার হয়। এটি বড্ড প্রয়োজন। বড্ড প্রয়োজন নিজের ভুল শোধরানোর পথে থাকা তাহলে উজ্জ্বল হবে পথচলা। ভূতের পা  পেছনে থাকে,  সবকিছু টানলে লম্বা হয় শুধু সিগারেট ছাড়া। গফুর সরদার

বলল তাই তো!

লেখক: কলাম লেখক, উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক

mazid.muhammad@gmail.com