ডিএমপি কমিশনার হিসেবে আলোচনায় চার কর্মকর্তা

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বর্তমান কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক তার চাকরি জীবনের ইতি টানতে যাচ্ছেন আগামী ১ অক্টোবর। তার পদে কে দায়িত্বে আসছেন তা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে চলছে জল্পনা-কল্পনা। পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ এ পদটি পেতে বাহিনীটির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার চারজন কর্মকর্তা জোর তদবির চালাচ্ছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মূলত চৌকস ও নিষ্ঠাবান একজন পুলিশ কর্মকর্তা ডিএমপি কমিশনারের গুরুদায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে বিসিএস ১৫ বা ১৭ ব্যাচের একজন কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পাচ্ছেন বলে পুলিশের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। এ ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মাহাবুবর রহমান এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর রহমানের নাম বেশি আলোচনা হচ্ছে।

জানা গেছে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আগামীকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। আর এজন্য তিনি গত বৃহস্পতিবার রাতে ডিএমপি কমিশনার নিয়োগের ফাইলে সম্মতি জানিয়ে স্বাক্ষর করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহেই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা রয়েছে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত বছর ২৩ অক্টোবর ডিএমপি কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান খন্দকার গোলাম ফারুক। আগামী ১ অক্টোবর তিনি অবসরে যাচ্ছেন। তার পদে স্থলাভিষিক্ত হতে ইচ্ছুক বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম আলোচনায় আসে। তারা কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জোর তদবির করছেন। যাদের নাম বেশি আলোচনা হচ্ছে তাদের মধ্যে তিনজনই ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা। আর একজন ১৭ ব্যাচের কর্মকর্তা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের প্রধান মাহাবুবর রহমান, সিআইডির প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, রাজারবাগ পুলিশ টেলিকম সংস্থার প্রধান ওয়াই এম বেলালুর রহমান ও ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান হাবিবুর রহমানের নাম বেশি আলোচনা হচ্ছে। তাদের মধ্যে মাহাবুবর রহমান চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এ চারজনের মধ্যে মাহাবুবর রহমান ও হাবিবুর রহমানের মধ্যে যেকোনো একজন ডিএমপির নতুন কমিশনার হচ্ছেন বলে পুলিশের মধ্যে আলোচনা চলছে কয়েক মাস ধরে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএমপির কমিশনার কে হচ্ছেন এ জল্পনা-কল্পনার শিগগিরই অবসান হতে চলেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র যাবেন। অধিবেশন শেষ করে তিনি লন্ডন যাবেন। ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে তিনি দেশে ফিরবেন না। আর এ কারণে বৃহস্পতিবার রাতে ডিএমপির কমিশনার নিয়োগ দিতে সম্মতি জ্ঞাপন করে ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। চলতি সপ্তাহেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমান ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের আরও ছয় মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার গুঞ্জন আছে। সেজন্য তার পক্ষেও জোরালো তদবির হচ্ছে তা সত্য। পাশাপাশি অন্যরাও জোর তদবির করছেন। কিন্তু আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকার বিশ্বস্ত হিসেবে মাহাবুবর রহমান বা হাবিবুর রহমানের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে পারে। নির্বাচনের আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে নতুন পুলিশ কমিশনারকে।

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তা বলেন, হাবিবুর রহমান ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পেলে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন ১৭ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা। কারণ ডিএমপি সদর দপ্তরে এ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও সরকার যাকে ভালো মনে করে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে, তাকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে হবে।

জানা গেছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশপ্রধান মাহাবুবর রহমান জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি ১৫তম বিসিএসে সহকারী পুলিশ সুপার পদে যোগ দেন। এএসপি (সদর দপ্তর) হিসেবে নরসিংদী জেলা পুলিশ, সার্কেল এএসপি হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলার সদর ও বাজিতপুর সার্কেলে এবং নেত্রকোনা সদর সার্কেলে দায়িত্ব পালন করেন। সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি) হিসেবে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশে দায়িত্ব পালন করেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও র‌্যাবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সিও হিসেবে মহালছড়ি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও বগুড়া এপিবিএনে দায়িত্ব পালন করেন। উপকমিশনার (তেজগাঁও) হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশে এবং পুলিশ সুপার হিসেবে হাইওয়ে (পূর্ব), বরিশাল ও কুমিল্লা জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে চট্টগ্রাম ও ঢাকা রেঞ্জে কর্মরত ছিলেন। তিনি ২০০২-০৩ সালে কসোভো ও ২০০৫-০৬ সালে আইভরি কোস্টে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল পুলিশ মেডেল (পিপিএম-সেবা) পদক লাভ করেন।

অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর রহমান ট্যুরিস্ট পুলিশের আগে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর), ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার, পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) ও ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মক্ষেত্রে ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি তিনবার বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও দুবার রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) পেয়েছেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, বেদে সম্প্রদায় ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে নিয়ে তার কাজ প্রশংসিত। তাছাড়া ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তার সুখ্যাতি রয়েছে। ১৯৬৭ সালে গোপালগঞ্জের চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া হাবিবুর রহমান ১৭তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে।