দেশে মুদ্রাস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস চলছে। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে এসেছে। এমন কি শ্রীলঙ্কার মতো ভুঁইফোড় মুদ্রাস্ফীতির দেশেও বিগত আগস্ট মাসে এর সূচক ৪ শতাংশে নেমে আসে। আর আমাদের দেশে খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী ওই মাসে দেশের সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি (৯.৯২ শতাংশ) প্রায় দুই অঙ্কের ঘর স্পর্শ করে ফেলেছে, খাদ্যপণ্যের সূচক ইতিমধ্যেই ১২ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে। এটা আবার শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি। সামনে জাতীয় নির্বাচন। ফলে এই পাগলা ঘোড়া নিয়ে সরকারও বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।
সাধারণ মূল্য স্তরের বৃদ্ধি এক জিনিস আর কারসাজি করে বিশেষ বিশেষ পণ্যের মূল্য বিস্ফোরণ ঘটানো আরেক জিনিস। দেশে এই উভয় প্রপঞ্চের উপর্যুপরি উপস্থিতি ও বিরামহীন ক্রিয়াশীলতা শুধু লক্ষ্যই করা যাচ্ছে না, বরং একটা আরেকটাকে উস্কে দিতে যেন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। আমদানি করা হোক বা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিতই হোক, নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যই এখন আর এই দুষ্ট বাতাবরণের বাইরে নেই; ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ডিম, এমন কি আলুর উদ্বৃত্ত পণ্যেও চলছে এই ভোজবাজির খেলা। এতে নাকাল হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষ। আর ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ বনে যাচ্ছে ধনিক ও বণিক সম্প্রদায়; এই দুঃসময়েও দেশে বেড়ে চলেছে কোটিপতির সংখ্যা। মুদ্রাস্ফীতির প্রধান কাজই এটা, নিঃস্বদের সম্পদ শীর্ষদের পকেটে স্থানান্তর করা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্ভবত কিছু একটা করা দরকার এই চিন্তা থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ডিম, পেঁয়াজ ও আলুর সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু এটা কতটুকু কার্যকর করা সম্ভব এবং দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, সেটা বিবেচনার দাবি রাখে।
সরকার এর আগেও মূল্য উল্লম্ফনের প্রেক্ষাপটে চিনি ও ভোজ্যতেলের সর্বোচ্চ বিক্রয় মূল্য বেঁধে দিয়েছিল। তাতে বাজার পরিস্থিতিতে তেমন কোনো ইতর-বিশেষ হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে একটা কৌতুক স্মরণে আসছে। মানুষ সাধারণত যেখানে নিগৃহীত হয়, প্রথমে সেখানে তার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী হয়। এক রেলওয়ের খালাসি তার স্ত্রীর কাছে নিজের ক্ষমতা জাহির করতে বলে বসে, তুমি দাম না দিলে কী হবে, চাকরিতে আমার ক্ষমতা অসীম; যে রেলগাড়িতে বড় বড় সাহেব-সুবা চড়ে বেড়ান, সেই ট্রেন মুহূর্তের মধ্যে আমি থামিয়ে দিতে পারি। বউটার বেশ কৌতূহল হয় এই গোবেচারা স্বামীর এত ক্ষমতার কথা শুনে। সে পরীক্ষা প্রার্থনীয় হয়। খালাসি বউ নিয়ে গিয়ে রেলগাড়ি আসার সময় লাইনের ওপর লাল সালু টাঙিয়ে দেয়। গাড়ি যথারীতি থেমে যায়। গার্ড গাড়ি থেকে নেমে লাইনে কোনো কাজের নিশানা না দেখে খালাসির কাছে লাল সালু টাঙানোর হেতু জানতে চান। কোনো সদুত্তর না পাওয়ায় গার্ড খালাসিকে থাপ্পড় মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে ট্রেন নিয়ে চলে যান। বউটা তখন স্বামীকে বলে, ‘দেখলাম তোমার ক্ষমতা, গার্ড সাহেব তো তোমাকে থাপ্পড় মেরে মাটিতে ফেলে দিল।’ বেচারা খালাসি তখন বলে ওঠে, ‘আমার গাড়ি থামানোর ক্ষমতা আছে, আমি গাড়ি থামাইছি। গার্ড সাহেবের থাপ্পড় মারার ক্ষমতা আছে, তিনি আমারে থাপ্পড় মারছেন।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী মূল্য বেঁধে দিয়ে কাজ সমাপ্ত করছে। আর ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রি করে মুনাফা লুটেছেন। কাজেই প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষমতার মধ্যেই আছেন।
এখন আবার দেখছি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাওয়ায় ভোজ্যতেলের দাম সয়াবিন ও পাম অয়েলের বেলায় যথাক্রমে ৫ ও ৪ টাকা কেজিপ্রতি কমানো হয়েছে। এ যেন ভোক্তাদের জন্য ব্যবসাবান্ধব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক পরম উপহার; এখন ৪-৫ টাকা কোনো ফকিরকে দিয়ে দেখবেন, সে মুখের আকৃতি কী করে। এবার আবার দাম বেঁধে দেওয়া ভোগ্যপণ্যের তালিকা বাড়িয়ে প্রতি কেজি আলু ও পেঁয়াজ এবং প্রতিটা ডিমের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৩৬, ৬৫ ও ১২ টাকা। ১৬ সেপ্টেম্বর বণিক বার্তায় দেখলাম যে, বাজারে এ তিনটি পণ্যের খুচরা বাজার মূল্য যথাক্রমে ৪৮ থেকে ৫২, ৭৫ থেকে ৯০ এবং ১২.৫ থেকে ১৩ টাকা। তৎপরবর্তী অভিযান পরিচালনার পরও পরিস্থিতি তথৈবচ। তার মানে আগের মতো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তার ক্ষমতা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ আদেশ জারি করেছে, আর ব্যবসায়ী সম্প্রদায় তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী স্বনির্ধারিত লাভে পণ্য বিপণন করে চলেছেন। এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে আমাদের এলাকায় সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘খাবু না তো মাহালু কেন’? অর্থাৎ যে খাবারটা সে খেতে পারবে না, সেটা মাখানোর দরকারটা কী? বাণিজ্যমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কিনা, তা মনিটর করার জন্য জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করবেন। দেখা যাক, কত ধানে কত চাল ফলে।
অতীতে ভোজ্যতেল ও চিনির মতো মাত্র দুটি পণ্যের বিপণন কার্যক্রম যেখানে মনিটর করে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি, সেখানে আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের মতো ব্যাপকভাবে ব্যবহার্য ভোগ্যপণ্যের বিশাল খুচরা বিপণন কর্মকাণ্ড কতটুকু মনিটর করা সম্ভব, সেটা একটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন বটে। তা ছাড়া অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, এই জাতীয় মনিটরের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে কিছু ফল লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফলই বেশি মেলে; এই প্রক্রিয়ায় স্বল্পমেয়াদে পণ্যের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে, ফলে চাহিদা বেড়ে যায়। এতে বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। আবার চাহিদা বেশি থাকায় বাজারে নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্যের লভ্যতা বেড়ে যায়। তা ছাড়া যেসব পণ্যের মূল্যে টুপি পরিয়ে সর্বোচ্চ খুচরা দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, সাধারণ্যে ধারণা জন্মায় যে, অচিরে সেসব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরবরাহকারীদের মধ্যে দাম বৃদ্ধির প্রত্যাশা ও ভোক্তাদের মধ্যে মূল্য বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়। এতে শঙ্কাজনিত ক্রয় ও সংরক্ষণ বেড়ে যায়। আবার দাম বেঁধে দেওয়ায় অধিকতর মুনাফার সম্ভাবনা না থাকায় সরবরাহও বাড়ার আশাও থাকে না। ফলে এই টুপি দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ফারাক তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বাজারের এই অদক্ষতার কারণে সমাজে এক ধরনের ক্ষরণ শুরু হয়, অর্থনীতিতে যাকে deadweight loss হিসেবে অভিহিত করা হয়। নিয়ন্ত্রিত মূল্য, ভর্তুকি, পণ্যে কর-ভার আরোপ প্রভৃতি একইভাবে সমাজে বোঝার ক্ষেত্র তৈরি করে।
অনেকেই মনে করেন যে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মনিটরিংয়ের কোনো কাজ নেই। এটা একটা ভুল ধারণা। মনিটর সর্বত্র অপরিহার্য। তবে তার অর্থ দোকানে দোকানে বা আড়তে আড়তে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন নয়। এতে হিতে বিপরীত ফল হয়। এখানে মনিটর মানে সরবরাহের উৎস স্বাস্থ্যকর কিনা, উৎস থেকে সরবরাহ নির্বিঘ্ন কিনা, বাজারের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো অপ্রতিরোধ্য গতিতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে পারছে কিনা, সেগুলো নির্ণয় করা এবং চাহিদা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো কৃত্রিম হস্তক্ষেপ থাকলে সেগুলো অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যেমন হঠাৎ জনসংখ্যা বেড়ে গেলে বা মানুষের আয় বেড়ে গেলে বা বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে গেলে বা সরবরাহ অভিঘাত দেখা দিলে মূল্য বেড়ে যেতে পারে। ১৯৪৩ সালে বাংলায় যে মহাদুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তার অন্যতম কারণ ছিল বাংলায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রপক্ষের নিয়োজিত ব্যাপক সংখ্যক সৈন্য ও সহযোগী কর্মীদের উপস্থিতি এবং তাদের জন্য উদার হস্তে পরিশোধিত বেতন-ভাতা। বন্যা, সাইক্লোন, পোকার আক্রমণে ফসলহানি ও বার্মা থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও যেটুকু খাদ্যশস্য অবশিষ্ট থাকে, নব্য অর্থ প্রাপকরা উচ্চমূল্যে সেসব কিনে নিয়ে তাদের ভোগ বাড়িয়ে দেয়। ফলে শ্রমজীবী মানুষের খাদ্যের প্রাপ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
বাংলাদেশে এখন চলছে নব্য ধনীদের সিন্ডিকেট সংস্কৃতি। পুঁজিবাজারে এই সংস্কৃতির চর্চা আগে থেকেই ছিল; কোনো লোকসানি বা বন্ধ কারখানার শেয়ার দর কারসাজি করে বাড়িয়ে ফয়দা লুটে কুশীলবরা সটকে পড়ত। সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন তারা পণ্য বাজারে স্থান করে নিয়েছে। পণ্যভিত্তিক গড়ে ওঠা এসব অলিগার্করা এখন একেক সময় একেকটা পণ্যের ওপর ভর করে অল্প সময়ের মধ্যে লুটপাট চালায়। আগে নাকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় প্রশাসন থেকে এ রকম ইঙ্গিত আসত; সময় পাবে দুই ঘণ্টা, এর মধ্যে যা করার, করবে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা চলে আসব। তখন কিন্তু কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলেন। জাপানিরা সিঙ্গাপুরসহ মালয় দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেওয়ায় স্কুল বন্ধ হয়ে পড়ে। তখন তিনি পান-বিড়ির দোকান শুরু করেন। মাত্র দুই বছরের জন্য ছোট্ট এই দোকান পরিচালনা তাকে ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দান করে। তার লেখা স্মৃতিকথা A Doctor In The House-এ তিনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্যবসায়ীদের নিয়ে সভা করার সময় তারা যখন বলতেন যে তাদের লাভ হয় না, তখন তার ছোটবেলার পানের দোকানের অভিজ্ঞতা তাকে ব্যবসায়ীদের চালাকি ধরতে সাহায্য করত।
আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রীর ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা মাহাথির মোহাম্মদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। আন্তরিকতা ও অঙ্গীকার থাকলে সেই অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে তিনি তার সম্প্রদায়ের অলিগার্কদের বাগে আনতে পারবেন না, সেটা কেউ বিশ্বাস করে না। আর সাধারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে অর্থ সরবরাহের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, সেটাকে ঠিকঠাক করতে তার ক্যাবিনেট কলিগ অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা দরকার। সেটা না করে তার ক্ষমতা শুধু দরের মাথায় টুপি পরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে, তা হবে জুতা আবিষ্কারের মতো পুরো দেশ চামড়া দিয়ে আবৃত করে দেওয়ার মতো অসম্ভব এক কাজ। এখানে বরং গ্রহণ করতে হবে পা আবৃত করার উপযুক্ত কৌশল, রোধ করতে হবে কারসাজি এবং গ্রহণ করতে হবে সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রখ্যাত মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ কবি ও লেখিকা মায়া এঞ্জেলোর প্রাসঙ্গিক কথাটা উল্লেখ করে শেষ করছি : ‘You may not control all the events that happen to you, but you can decide not to be reduced by them.’
লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট
rulhanpasha@gmail.com