ভারতের পাঞ্জাবের পর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিখ বসবাস করে উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডায়। ভারতের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে শিখদের উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। তেমনি কানাডার অর্থনীতিতেও শিখরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশেই শিখদের পরিবার-স্বজনদের বসবাস। কিন্তু কানাডায় ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যার পর ভারত ও ভারতের বাইরের শিখদের মধ্যে জাগছে শঙ্কা। কানাডায় ভারত সমর্থক এবং খালিস্তানপন্থিরা প্রকাশ্যে একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। শিখদের এই উত্তেজনার রেশ ভারত-কানাডা ছাড়িয়ে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশের শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যেও ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ভারত ও কানাডার মধ্যে সৃষ্ট তিক্ত বিরোধ ভারতের পাঞ্জাবে প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে কানাডার সঙ্গে দ্বন্দ্বে উভয় কুল হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন ভারতীয় পাঞ্জাবের শিখরা। গতকাল সোমবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে হত্যা করা নিয়ে ভারত ও কানাডার মধ্যে সৃষ্ট তিক্ত বিরোধ পাঞ্জাবেও অনুভূত হচ্ছে। ভারতীয় এ রাজ্যটিতে শিখদের অনেকেই ভারতের হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকারের রোষানলে পড়ার পাশাপাশি উত্তর আমেরিকায় তাদের উন্নত জীবনের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে হুমকি সৃষ্টিরও আশঙ্কা করছে।
১৮ সেপ্টেম্বর কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো হরদীপ হত্যায় ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করায় দুই দেশের সম্পর্ক এখন তলানিতে। এর পরিণাম শিখরাও এড়াতে পারছে না। অথচ এই দুটি দেশের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ ও ভালো বাণিজ্য সম্পর্কও রয়েছে। কিন্তু ওই অভিযোগের পর ব্যাপক উত্তেজনার একপর্যায়ে উভয় দেশ একে অপরের একজন করে কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। এরপর উত্তেজনা আরও তুঙ্গে ওঠায় কানাডিয়ান নাগরিকদের জন্য ভিসা পরিষেবা স্থগিত করে ভারত।
রয়টার্স বলছে, শিখ জনগোষ্ঠী ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ হলেও পাঞ্জাবে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ৩ কোটি জনসংখ্যার উত্তর ভারতীয় এই রাজ্যেই ৫০০ বছর আগে শিখ ধর্ম জন্মলাভ করেছিল। অন্যদিকে পাঞ্জাবের বাইরে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিখ বাস করে কানাডায়।
কানাডায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হরদীপের চাচা হিম্মত সিং রয়টার্সকে বলেন, তিনি কানাডার সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং পাঞ্জাবের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কমে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত।
কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় উৎসও হচ্ছে ভারত। গত বছর উত্তর আমেরিকার এ দেশটিতে পড়তে যাওয়া ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৭ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে।’
১৯ বছর বয়সী গুরসিমরান সিং, কানাডায় পড়তে যেতে চান তিনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শঙ্কিত এই তরুণ রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা এখন ভয় পাচ্ছি কানাডা স্টুডেন্ট ভিসা দেবে কি না বা ভারত সরকার এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে কি না।’
কানাডায় ৮ লাখের বেশি শিখের বসবাস। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বাস করে আরও প্রায় পাঁচ লাখ শিখ। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কানাডায় শিখ নেতা হত্যার উত্তেজনায় এখন বিশে^র অন্যান্য দেশেও শিখ নেতাদের নিয়ে শঙ্কার বিষয়গুলো সামনে আসছে। যুক্তরাজ্যের শিখরাও এই শঙ্কার বাইরে নয়।
উদাহরণ হিসেবে বিবিসি বলছে, অবতার সিং নামের আরেক খালিস্তানপন্থির রহস্যজনক মৃত্যুর কথা। ৩৫ বছর বয়সী ওই শিখ নেতা গত জুনে আকস্মিক অসুস্থ হয়ে বার্মিংহামে মারা যান। তার স্বজনরা দাবি করেন, ওই মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু বার্মিংহাম পুলিশ জানায়, তারা রহস্যজনক কিছু পায়নি। তবে স্থানীয় শিখদের দাবি, ওই ঘটনা আবার তদন্ত করা হোক।
প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আরেক শিখ কর্মী জাগতার জোহালের কথা উল্লেখ করে বিবিসি। সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, ছয় বছর আগে ভারতের পাঞ্জাবে বিয়ে করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন জাগতার। ধারণা করা হয়, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে জাগতারের তথ্য সরবরাহ করেছিল যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দারা; অর্থাৎ শিখদের স্বার্থ রক্ষায় কানাডা ও যুক্তরাজ্য সরকারের ভূমিকা এক নয়।এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জাগতারের ভাই গুরপ্রিত জোহাল বলেন, ‘এখানকার অবস্থা দেখলে মনে হয়, যুক্তরাজ্য সরকার নিজের নাগরিকদের চেয়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।’