তত্ত্বাবধায়কের ‘মাইনাস ওয়ান’ তত্ত্ব

১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন আনোয়ার-উল-হক কাকার। অথচ এ পদের জন্য তার নাম প্রস্তাব করেনি কোনো রাজনৈতিক দল। তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী বাছাই তালিকায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও বিরোধীদলীয় নেতা রাজা রিয়াজ যে তালিকা করেছিলেন, তাতে কাকারের নামই ছিল না বলে পাকিস্তানি একাধিক সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছিল। মূল দায়িত্ব নির্বাচন আয়োজন করা হলেও কাকার ক্ষমতা গ্রহণ করেই পাকিস্তানের জ¦ালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেন। যদিও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত পাকিস্তানকে দাম বাড়ানোর শর্ত আগেই দিয়ে রেখেছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ। কাকার শুধু সেসব পূরণ করছেন। এর মধ্যেই পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ের আশা করা পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান কারাগারে বন্দি। ইমরান বরাবরই দাবি করে এসেছেন, তার প্রতি পাকিস্তানিদের সমর্থন সবচেয়ে বেশি। এখন তিনি যখন কারাগারে তখন তাকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কি না, এমন প্রশ্ন জাগছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার-উল-হক কাকার সাফ বলে দিলেন, ইমরানকে ছাড়াই পাকিস্তানে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব। সম্প্রতি বার্তাসংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাকার বলেন, ‘ইমরান খান ও কারাগারে বন্দি তার দলের শত শত সদস্যকে ছাড়াই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে।’ কাকারের এ মন্তব্যের পর পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যার শিরোনাম ‘মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা ইকোস এগেইন’ অর্থাৎ আবারও মাইনাস ওয়ান ফর্মুলার প্রতিধ্বনি। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনের সারকথা, কাকারের এ মন্তব্য ইমরান খানকে ‘মাইনাস’ করার তৎপরতা।  পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণœ রাখতে ‘মাইনাস ওয়ান’ তত্ত্ব আগে থেকেই আলোচিত হচ্ছে। এ বছরের শুরু থেকে ইমরানের দল দাবি করে আসছিল, ইমরানকে পিটিআই থেকে সরিয়ে রেখে পিটিআইয়ের সেনা সমর্থিত নেতাদের সামনে এনে লোকদেখানো সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা হতে পারে।  এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে শুরু করে গোটা দেশটির সব ক্ষেত্রেই সর্বেসর্বা দেশটির সেনাবাহিনী। চূড়ান্ত গ্রেপ্তারের আগে ইমরান খান একাধিকবার সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখেন। এমনকি রাজনৈতিক সমাবেশে তাকে হত্যাচেষ্টার জন্য ইমরান সরাসরি সেনাবাহিনীর বড় কর্তাদের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন। এরপর ইমরানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। দুর্নীতির মামলায় গত ৯ মে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয় ইমরান খানকে। তার সেই গ্রেপ্তার দেশে মারাত্মক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পরে শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপে ইমরান কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও তার দল পিটিআইয়ের ওপর নেমে আসে ব্যাপক দমনপীড়ন। সহিংসতা এবং সামরিক স্থাপনায় হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে শত শত পিটিআই কর্মী এবং সিনিয়র নেতাদের কারাগারে বন্দি করা হয়। পরে তোশাখানা মামলায় আবার গ্রেপ্তার হন ইমরান খান। এপির এক প্রশ্নের জবাবে কাকার বলেন, কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে, সামরিক বাহিনী নয়। এ ছাড়া নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও সমর্থন করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারও রয়েছে। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিকান্দার সুলতান রাজাকে ইমরান খান নিয়োগ করেছিলেন জানিয়ে কাকার বলেন, ‘কেন তিনি তার বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াবেন? আমরা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জন্য কারও পেছনে ছুটছি না। পিটিআই চেয়ারম্যান বা অন্য কোনো রাজনীতিবিদ নিয়মকানুন লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হওয়ার কথা, সেটাই হয়েছে।’  এক্সপ্রেস ট্রিবিউন বলছে, পাকিস্তানে মহাক্ষমতাধর শক্তির জন্য হুমকি হয়ে ওঠা রাজনৈতিক নেতাদের সরিয়ে দিতে এ মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা নতুন নয়। এমনকি এজন্য চরম কিছু করতেও পিছপা হয়নি শক্তিশালী মহলটি। সেই লিয়াকত আলী খানের রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে জুলফিকার আলি ভুট্টোর ফাঁসি, বেনজির ভুট্টো হত্যাকাণ্ড কিংবা ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আগে নওয়াজ শরিফকে দুর্নীতির দায়ে দেশান্তরী করার ব্যাপারগুলো মাইনাস ওয়ান ফর্মুলার উদাহরণ।