কভিডের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে চরম বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে উৎপাদনকারী বা ক্রেতা, সবাই একটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এতে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে, প্রধান বাজারগুলোতে রপ্তানি কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে বিপুল বিনিয়োগ ও সংস্কারের মাধ্যমে শিল্পকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে পোশাক খাত। কিন্তু কাস্টমস এবং বন্ডের সমস্যাগুলো আমাদের চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী উদ্যোক্তাদের আর্থিকভাবে হয়রানি করছে।
গতকাল পোশাক শিল্পের সার্বিক পরিস্থতি নিয়ে বিজিএমইএর সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এনবিআরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উত্থাপন করেন সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘পোশাক শিল্প ফ্যাশন ও টাইম বাউন্ড শিল্প। কাস্টমস বন্ড পদ্ধতিগুলোকে সুবিন্যস্ত করা হলে তা লিড টাইম সংক্ষিপ্ত করবে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখবে। কিন্তু আমরা দেখছি কাস্টম হাউজ এবং বন্ড কমিশনারেটে নিচের দিকের কতিপয় কর্মচারীরা সময়ক্ষেপণ করে, উদ্যোক্তাদের আর্থিকভাবে হয়রানি করে। এটার নিরসন হওয়া দরকার।’
ফারুক হাসান বলেন, সম্প্রতি কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের জারিকৃত প্রেস বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। গণমাধ্যমে ‘পোশাক রপ্তানির আড়ালে ১০ কোম্পানির ৩০০ কোটি টাকা পাচার’ এ রকম শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের চিঠি, এ ধরনের মিডিয়া রিলিজ, এ ধরনের মিডিয়া ক্যাম্পেইন, আসলে কার স্বার্থে করা হয়েছে, এটা আমাদের কাছে একটি বড় প্রশ্ন। আমরা মনে করি এটা আমাদের অর্থনীতি, শিল্প, দেশ অথবা সরকার, কাউকেই কোনো সুবিধাজনক অবস্থানে নিচ্ছে না। শুধুমাত্র বাধাগ্রস্তই করছে।
‘কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা যা এখনো তদন্তই হয়নি সেগুলো নিয়ে সমগ্র শিল্প খাতকে ঘিরে ঢালাও মন্তব্য মোটেও কাম্য নয়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা তাদের ডাকবে, তদন্ত করবে। যারা সত্যিকার অর্থে কোনো ধরনের কোনো অসাধু তৎপরতার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনবে। কিন্তু উল্লিখিত বিষয়টাকে এভাবে মিডিয়ার মাধ্যমে জনসম্মুখে তুলে ধরে জাতির কাছে শিল্পকে ছোট করাটা আমরা একটি অপচেষ্টা বলে মনে করি। আমরা এই ধরনের কর্মকা-ের তীব্র নিন্দা জানাই।’
ফারুক হাসান বলেন, যে ১০টি কারখানার বিষয়ে অভিযোগ এসেছে, তার মধ্যে ৪টি বিজিএমইএর এবং ২টি বিকেএমইএর সদস্য প্রতিষ্ঠান। অবশিষ্ট ৪টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিজিএমইএর ৪টি সদস্য প্রতিষ্ঠান হলো- ফ্যাশন ট্রেড, প্রজ্ঞা ফ্যাশন লি., অনুপম ফ্যাশন ওয়্যার লি. ও হংকং ফ্যাশনস লি.। বিকেএমইএর ২টি সদস্য প্রতিষ্ঠান হলো পিক্সি নিটওয়্যার লি. ও ইডেন স্টাইলটেক্স (বায়িং হাউজ)। আমরা আমাদের সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোর কাছে নোটিস পাঠিয়ে জানতে চেয়েছি। তারা লিখিত বক্তব্য দিয়েছে।
এরমধ্যে বিকেএমইএর দুটি প্রতিষ্ঠান লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছে, তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ও বিন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) ব্যবহার করে কে বা কারা চালানের বিল অব এক্সপোর্ট, ইএক্সপি নম্বর, সেলস কন্টাক্ট, রপ্তানি মূল্য, বিল অফ এক্সপোর্টে উল্লিখিত ক্রেতা কিংবা যে ব্যাংকের নাম এসেছে, সেগুলোর কোনোটিই তাদের নয়। এমনকি যেসব সিএনএফ এজেন্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তারা কখনো কাজ করেনি। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে জালিয়াত চক্রকে প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়েছে অর্থপাচারের অভিযোগ থাকা বিকেএমইএর দুটি প্রতিষ্ঠান।
যদি কেউ অভিযুক্ত হন তবে তাদের ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যথাযথভাবে তদন্ত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান বিজিএমইএ সভাপতি। তিনি বলেন, এই শিল্পের দশজন উদ্যোক্তা নিয়ে আজ কথা হচ্ছে, এদের বাইরে আরও হাজার হাজার উদ্যোক্তা আছেন, তারা তো প্রচ-ভাবে হতাশ ও মর্মাহত হয়ে পড়েছেন। আগামীতে বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। কারণ এই অভিযোগ তাদেরও স্পর্শ করছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য হাই লেভেল টাস্কফোর্স গঠন করে তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করছি। এর জন্য প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দিতে বিজিএমইএ প্রস্তুত।
ফারুক হাসান বলেন, গত ১০ বছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩২০ বিলিয়ন ডলার যা টাকার অঙ্কে প্রায় ২৬ লাখ কোটি টাকা। আর গত ৫ বছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৮৩ বিলিয়ন ডলার যা টাকার অঙ্কে প্রায় ১৬ লাখ কোটি টাকা। এই টাকাগুলো কিন্তু আমরা রপ্তানি করে আমাদের দেশের মধ্যেই এনেছি এবং এই যে রপ্তানিটা আমরা করতে পেরেছি, এটা কিন্তু সহজ কাজ ছিল না। এর জন্য আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। এর জন্য আমাদের অনেক বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এর জন্য আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক ধরনের চড়াই-উতরাই অতিক্রম করতে হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, চরম প্রতিকূলতার মধ্যে আমরা যে প্রবৃদ্ধিটি ধরে রাখতে পেরেছি তা এসেছে মূলত কাঁচামাল, জ্বালানি, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং হাই-ভ্যালুড পণ্য তৈরির কারণে। তিনি বলেন, গত এক বছরে শিল্প খাতে গ্যাসের মূল্য দেড়গুণ বেড়েছে। আর চলতি বছর বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে ৩ বার, যার পরিমাণ প্রায় ১৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এছাড়া, চলতি বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যাংক সুদের ওপর ক্যাপ তুলে দিয়েছে, ফলে উৎপাদন খরচও বেড়েছে। শুধু তাই নয় রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের আওতায় আমরা যে সুবিধা পেতাম সেটিও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটাও অর্ধেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বৃহত্তর অর্থনীতির স্বার্থে এ সব বিষয় মেনে নিয়েই কিন্তু আমরা ব্যবসা পরিচালনা করছি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এসব পরিবর্তন আমাদের তহবিল ব্যয়, আমাদের উৎপাদন ব্যয় এবং আমাদের কাঁচামাল ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।