হদিস মিলছে না দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুনকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় একদল সন্ত্রাসী। ১৮ সেপ্টেম্বর এ ঘটনার পর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। এরপর থেকে অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকেন শীর্ষ এই সন্ত্রাসী। সর্বশেষ কলাবাগান এলাকায় অবস্থান করছেন জানা গেলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে এ ঘটনার দুদিন পর ২২ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্ত হন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। মুক্ত হওয়ার পর থেকেই তার সন্ধান মিলছে না। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দল তাকে হেফাজতে নিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক বাহিনীতে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেনি।

জানা গেছে, রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ও তারিক সাঈদ মামুন। এই দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার আসামি। ইমন কারাগারে থাকলেও বেশ কয়েক মাস আগে মামুন জামিনে বের হন। একসঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালালেও কারাগারে থাকা অবস্থাতেই দুজনের বিরোধ দেখা দেয়। এর জের ধরে মামুনের ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে।

সূত্র বলছে, অন্ধকার জগতে পা দেওয়ার পর একসঙ্গে কাজ করলেও ইমনের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ ছিল মামুনের। এর জের ধরে কারাগারে থাকতেই মামুন রাসুর সঙ্গে নতুন পরিকল্পনা করেন। এরপর মামুন কারাগার থেকে বের হয়েই এ এলাকায় বিকল্প শক্তি তৈরিতে সক্রিয় হয়ে পড়েন। ফলে ইমন কারাগার থেকেই তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। তার অনুসারীদের দিয়ে হামলা চালান। এরপর মামুন পাল্টা হামলার পরিকল্পনা করেন এবং এই হামলার মধ্য দিয়েই ইমনের অনুসারীদের হাত থেকে এই এলাকার দখল পুরোপুরি নিয়ে নেবেন। এই পরিকল্পনায় যোগ দিতে চতুর্থ দিনেই কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন রাসু। তবে এসব বিষয় আগেই আঁচ করে একাধিক গোয়েন্দা দল। এ জন্য কারা ফটক থেকেই হেফাজতে নেওয়া হয় রাসুকে। একই সময়ে গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারিতে মামুন কোণঠাসা হয়ে পড়েন।

এদিকে সন্ত্রাসী রাসু কোথায় জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হয়। পরে কথা হয় তার ভাই মো. সাচ্চু শেখের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তকে বলেন, রাসু ওই দিন মুক্তি পাবেন জেনে তারা আগে থেকেই কারা ফটকে অবস্থান করছিলেন। তিনি বের হওয়ার পরই পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের  (ডিবি) একটি টিম তাকে কারা ফটক থেকে তুলে নিয়ে গেছে।

তিনি দাবি করেন, রাসুকে ডিবির কোন টিম নিয়ে গেছে সেটা তারা জানেন। কোন গাড়িতে নিয়ে গেছে, সেই গাড়ির নম্বর, ছবিসহ প্রমাণও রয়েছে। কেন তাকে এভাবে নিয়ে গেছে তারা জানেন না। ষাটোর্ধ্ব একজন মানুষকে কোনো কারণ ছাড়া এভাবে কারা ফটক থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া অমানবিক বলে মন্তব্য করেন রাসুর ভাই। তবে রাসুকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রমাণ থাকার পরও কেন তারা কোনো অভিযোগ করছেন না জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এদিকে সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আন্ডারওয়ার্ল্ড উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, দেশের বাইরে থাকা সন্ত্রাসীরা নিজেদের সহযোগীদের মাধ্যমে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এমনকি কারাগারে থাকা সন্ত্রাসীরাও সহযোগীদের নানা বিষয়ে বার্তা দিচ্ছে। এর মধ্যে কেউ কেউ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হতে চাইছে। যে কারণে সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে পুলিশ সদর দপ্তর সব ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের বার্তা পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া বিদেশে আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে নতুন করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কারাগার কর্তৃপক্ষকেও হাজতি ও বন্দি সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

১৮ সেপ্টেম্বর মগবাজার এলাকার পিয়াসী বার থেকে বের হয়ে সন্ত্রাসী মামুন, তার দুই সহযোগী খোকন ও মিঠু প্রাইভেট কারে শুক্রাবাদের বাসায় যাচ্ছিলেন। তেজগাঁও শিল্প এলাকার সিটি পেট্রোলপাম্প ও বিজি প্রেসের মাঝামাঝি রাস্তায় চারটি মোটরসাইকেলে প্রায় আটজন সন্ত্রাসী মামুনকে লক্ষ্য করে গুলি করে। তাৎক্ষণিক প্রাইভেট কার থেকে মামুন, মিঠু ও খোকন নেমে পড়েন। এ সময় সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে মামুনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে আহত হন ভুবন চন্দ্র শীল নামের এক আইনজীবী। তিনি ওই পথে মোটরসাইকেলে করে বাসায় ফিরছিলেন। প্রায় সাত দিন অচেতন থাকার পর গত সোমবার তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় ভুবনের স্ত্রী বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলার তদন্তে হামলাকারীদের শনাক্তের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া তাদের একজনকে গত সোমবার পুরান ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে থানা পুলিশ। তার নাম মারুফ বিল্লাহ ওরফে হিমেল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এইচ এম আজিমুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাকিদের গ্রেপ্তারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আশাকরি খুব শিগগির তাদের আইনের আওতায় আনা যাবে।’

এ বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনাটি যারা ঘটিয়েছে, আমরা তাদের গ্রেপ্তার করতে সামগ্রিকভাবে কাজ করছি। ইতিমধ্যে এ ঘটনার পেছনে সন্ত্রাসীদের বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নামে এসেছে, যিনি এখন জেলখানায় রয়েছেন। এ ঘটনার পেছনে যার হাত রয়েছে, আমরা তাকেই আইনের আওতায় আনব।’