মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ

জাতীয় নির্বাচনের আগে আর্থিক খাতে কোনো নীতিনির্ধারণী পরিবর্তন চায় না সরকার। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সংকটসহ অর্থনীতিতে বর্তমানে নানা ধরনের সংকট রয়েছে। এসবের সমাধানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বাড়ানো ও ব্যাংক খাত সংস্কারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারকে আর ঋণ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর।

অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা প্রশমনে অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ নেওয়ার অংশ হিসেবে গতকাল আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বৈঠকে বসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।  বৈঠকে গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার ছাড়াও অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার উপস্থিত ছিলেন। এ-সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কাজী সায়েদুর রহমান, আবু ফরাহ মো. নাসের, সাজেদুর রহমান খান ও নুরুন নাহার।

বৈঠকে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে সবার আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, মূল্যস্ফীতি কমলে এমনিতেই ডলার বাজার স্থিতিশীল হয়ে যাবে। তবে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আর্থিক খাতে নীতিনির্ধারণী কোনো পরিবর্তন কিংবা সংস্কার করা সম্ভব না হলে সেক্ষেত্রে রিজার্ভ ধরে রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান করণীয় হওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন তিনি। রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি বৈচিত্র্য আনতে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।  

আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে জানায়, বর্তমানে জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন খাতে খরচ কমিয়েছে সরকার। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এখন আর টাকা নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। তবে প্রয়োজন হলে এখন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে সরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে অর্থনীতিতে তেমন কোনো সংস্কার আনতে অপারগতা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের পর দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে বলেও এই অর্থনীতিবিদকে জানানো হয়েছে। তাই এই অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে করণীয় বিষয়ে দুই ধরনের পরামর্শ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বল্পমেয়াদি বলতে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কী করণীয়, তার পরামর্শ চাওয়া হয় আহসান এইচ মনসুরের কাছে। আর দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারসহ নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 বৈঠকের বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘নির্বাচনের আগে পর্যন্ত দেশের রিজার্ভকে ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছি। আর সরকারকে যেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ না দেওয়া হয় সেটিও উল্লেখ করেছি। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারকে ঋণ দিলেই মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও বহুমুখী রপ্তানি খাত তৈরির পরামর্শ দিয়েছি।

এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি না করতে পারলে অর্থনীতিকে ধরে রাখা যাবে না। এজন্য এনবিআরকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আর ব্যাংক খাতে বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে তা অর্থনীতির জন্য শুভকর নয়। তাই নির্বাচনের পর ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে। এক্ষেত্রে নীতি পরিবর্তনসহ বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া দেশের রপ্তানি খাত এখন পোশাক শিল্পকেন্দ্রিক। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পোশাক খাতে কোনো সমস্যা তৈরি হলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। তাই দেশের রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছেন মনসুর।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, মূল্যস্ফীতি, ডলারের দামের অস্থিতিশীলতা এবং খেলাপি ঋণ এ-সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সবার আগে মূল্যস্ফীতি কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন পিআরআই নির্বাহী পরিচালক। পাশাপাশি নতুন করে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ না দেওয়ার ওপরেও গুরুত্ব আরোপ করেছেন এই অর্থনীতিবিদ।

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংককে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামলাতে সুদহার বাড়ানোসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন অর্থনীতিবিদরা। এর কোনো কিছুকেই আমলে নেয়নি আর্থিক খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় বিশে^র প্রায় সব দেশে মূল্যস্ফীতিসহ আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারলেও ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। বিশেষ করে পাশর্বর্তী সব দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও বাংলাদেশে তা গাণিতিক হারে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে অর্থনীতিবিদদের দারস্থ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের।

এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। বৈঠকে নতুনভাবে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।