নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো ‘মান’ নেই। যে কারণে, অনেকটাই মানহীন জীবনযাপন করছেন। বেঁচে থাকাটাই যখন প্রবল সংগ্রামের নাম, তখন এক টুকরো ‘আবাসন’ স্বপ্নের মতন মনে হয়। যদিও কংক্রিটের গন্ধে ছেয়ে যাচ্ছে দেশ, তবু ওদের কোনো আপন ঠিকানা নেই। যেখানে রাত, সেখানেই কাত। এই ভাসমান মানুষগুলো, ‘অদৃষ্টের লিখন’ বলে সব মেনে নেয়। আসলে কি তাই?
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, দেশে ভাসমান মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১১৯। ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশনে লাখ লাখ মানুষ বস্তিতে বসবাস করছেন। এই বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সরকারের এ বিষয়ক কোনো নীতিমালা কিংবা পরিকল্পনার কোনো উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। এ বিষয়ে সরকারের সৎ, নিষ্ঠাবান মানসিকতার অভাব রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতিও নেই। একইসঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন সুবিধা এখনো স্বপ্ন সুখের নাম। অথচ দেশের এমন কোনো জেলা নেই, যেখানে একের পর এক নতুন বাড়িঘর গড়ে না উঠছে। গতকাল ছিল বিশ্ব বসতি দিবস। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার পালিত হচ্ছে এই দিনটি। ‘বৈষম্য হ্রাসের অঙ্গীকার করি/ সবার জন্য টেকসই নগর গড়ি’ প্রতিপাদ্যে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হলো বিশ্ব বসতি দিবস। এই দিনটি শুধু পালিতই হয়। কিন্তু স্বল্প আয়ের মানুষের আবাসন সংকট দিন দিন বাড়ছে। শহরের ভৌত কাঠামোকে চাকচিক্যময় হিসেবে গড়ে তুললেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
এ বিষয়ে সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘স্বল্প আয়ের মানুষের আবাসন অধরাই’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে এ তালিকায় রয়েছেন যারা রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, মাজার, ফুটপাত, সিঁড়ি, ওভারব্রিজের নিচে, লঞ্চ টার্মিনাল, ফেরিঘাট, মার্কেটের বারান্দায় দিন কাটান। আর বস্তিতে বসবাস করছেন ১৮ লাখ ৪৮৬ জন। তারা মূলত শহর ও উপশহর এলাকায় টিনের ঘর, সেমিপাকা ঘর বা ঘিঞ্জি পাকা ঘরে বাস করেন। তবে বস্তিবাসী কারা সে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘২০১৬ সালে সরকার আবাসন নীতিমালা করেছে। আবাসন উন্নয়ন তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। আবাসন সংকট নিরসন করতে হলে সরকারকে আবাসন তহবিল করতে হবে।’
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট কামাল মাহমুদ বলছেন, সরকারের নীতিসহায়তার অভাবে আবাসন সংকট কাটছে না। স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে আবাসন। অপরদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বলছেন বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করে ৯ লাখ গৃহহীন মানুষকে চিহ্নিত করে। ইতিমধ্যে আট লাখ মানুষের গৃহের ব্যবস্থা করেছে; প্রায় ৪০ লাখ মানুষের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। বাকিদের জন্যও শেখ হাসিনা ব্যবস্থা করবেন। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্যও আবাসনের ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা তার সৈনিক হিসেবে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। রাজউক জানাচ্ছে- ঢাকায় রাজউক পূর্বাচল, ঝিলমিল, উত্তরা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় আবাসন প্রকল্পে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ফ্ল্যাটগুলো উচ্চমূল্যের কারণে নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। পূর্বাচল, ঝিলমিল ও উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প গ্রহণ করছে সরকার। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনেও বিভিন্ন সংস্থা আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন শহরে বসবাসরত সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সম্পদশালী ব্যক্তিরা। যাদের অনেক ফ্ল্যাট আছে তারা আরও ফ্ল্যাট কিনছেন। কিন্তু বাস্তুহারা, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সরকারি এসব আবাসনের সুবিধা পাচ্ছেন না।
ভাসমান তো দূরের কথা মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্তেরই স্বপ্ন থেকে গেল, এক টুকরো আবাসন। যতই স্যাটেলাইট সিটি এবং ডরমিটরি ভবন গড়ে তোলার চেষ্টা হোক না কেন, স্বল্প আয়ের মানুষদের বাদ দিয়ে কখনই সম্ভব নয় স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা।