ভারতের করিডর চীনের চ্যালেঞ্জ!

ভারতের দিল্লিতে সদ্য সমাপ্ত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের সঙ্গে ভারতকে সংযুক্ত করতে একটি বহুজাতিক রেল ও শিপিং প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। করিডরের জন্য প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটিতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জি-২০-এর অন্যান্য দেশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এই প্রকল্পের ঘোষণা দেন বিশ্বের উন্নত ও বর্ধনশীল দেশগুলোর নেতারা।

এমন পরিকল্পনা প্রকাশ ও তা বাস্তবায়নে ভারত এবং বাকি অংশীদাররা বেশ তৎপর। আর তাতে এটা স্পষ্ট যে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বিকল্প বৈশি^ক যোগাযোগের চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ। এই করিডর ও চীনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি দুটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আলজাজিরা ও বিবিসি।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পরিকল্পনা চীনের বিশাল বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সুস্পষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০১৩ সালে গৃহীত চীনের উদ্যোগটি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে সংযুক্ত করার জন্য হাতে নেওয়া হয়। ওই বিবেচনায় ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ সংযুক্তির নতুন এই উদ্যোগকে চীনের রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভের অনেকটা কাউন্টার পরিকল্পনা বলেই মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বিবিসির প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘ভারত-ইউরোপ করিডর পারবে কি চীনের বেল্ট ও রোডকে টেক্কা দিতে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্ডিয়া-মিডিল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডরে (আইএমইসি) যুক্তরাষ্ট্রকেও বেশ উৎসাহী-সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। যদিও এই করিডরে দেশটির সরাসরি কোনো লাভ নেই। কিন্তু আইএমইসিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) পাল্টা উদ্যোগ হিসেবে দেখে তাতে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

এশিয়ায় শক্তির পরীক্ষায় ভারত ও চীন দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। শি জিনপিংয়ের বিআরআই এমন একটি প্রকল্প, যা চীনের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য এশিয়া, রাশিয়া এবং ইউরোপকে যুক্ত করছে। এর বিপরীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অর্থনৈতিক করিডরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার বিষয়ে ফরেন পলিসি সাময়িকীর এডিটর-ইন-চিফ রবি আগারওয়াল বলেন, মোদির এই অর্থনৈতিক করিডরের পরিকল্পনা সহজভাবে বলতে গেলে এমন কিছু, যেটা চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবস্থানের শক্তি বাড়িয়ে দেবে।

বিবিসির দাবি, বিআরআই উদ্যোগের অগ্রগতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে এসেছে। এর অন্যতম কারণ, চীনা অর্থনীতির গতি কমে আসায় এ উদ্যোগের বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণের পরিমাণ আগের তুলনায় কমেছে। ইতালির মতো ধনী দেশ বিআরআই উদ্যোগ থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও জাম্বিয়ার মতো দেশ বিআরআই উদ্যোগের আওতায় নেওয়া ঋণ পরিশোধে অপারগতার কথা জানিয়েছে।

আবার মোদির আইএমইসি এখনো আছে কাগজে-কলমে। এর বাস্তবায়ন বিআরআইয়ের চেয়েও চ্যালেঞ্জের হতে পারে। কারণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। যেমন এতে মিসর, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো দেশ সম্পৃক্ত। আঞ্চলিক রাজনীতিতে দেশগুলোর সম্পর্ক খুব একটা উষ্ণ নয়। ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ অবধি অর্থনৈতিক করিডরকে সুয়েজখালের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হবে। কেননা, এখন সুয়েজখাল হয়ে এশিয়া থেকে ইউরোপে সস্তায় পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। তাই নতুন এই উদ্যোগ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নত করলেও মিসরের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

আইএমইসি কিংবা বিআরআই যেকোনো পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে আসলেই বদলে যাবে বিশ্বের অপেক্ষাকৃত কম আয়ের দেশগুলোর অর্থনীতির চেহারা।