গণঅভ্যুত্থান দূরের কথা, সাংবিধানিক রাজনীতির জয় হতে যাচ্ছে

‘একটা জংলা রঙের ওড়না কোমরে বেঁধে বিষকাটালীর/ ঝোপ পার হয়ে আমরা যাব কান নিয়ে যাওয়া চিলের পেছনে!’

লেখাটির শুরুতেই উপসংহার হিসেবে অনতিতরুণ কবি নাদিয়া জান্নাতের দুটো পঙ্ক্তি চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু ‘কপাল পোড়া এই দেশে সেটা হওয়ার জো নেই। কারণ, সাধারণে যে কথাটি সহজে বোঝেন, দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্নিহিত ভাবধারার প্রতিনিধিত্বকারী কতিপয রাজনীতিবিদ তা বোঝেন না বা বুঝতে চান না! বলছিলাম দেশের চলমান রাজনৈতিক ঘনঘটা প্রসঙ্গে। অনেকে অবশ্য একে ‘বিশাল সংকট’ হিসেবে দেখছেন। হুঙ্কার দিচ্ছেন চলতি মাসেই নাকি ‘এসপার-ওসপার’ হবে! কেউ কেউ তো আরও একধাপ এগিয়ে ‘অক্টোবর বিপ্লব’-এর স্বপ্ন দেখছেন। যেমন মাঠের রাজনীতিতে থাকা বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো দাবি করছে, অক্টোবর মাসেই তারা দফারফা করে ফেলবেন।

কার্যত বাস্তবতাটা কী? চলুন, আলো ফেলা যাক সে-ই দিকে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বরের আগে ডেটলাইন বেঁধে দিয়ে বিএনপি ঘোষণা করেছিল, দেশ চলবে খালেদা জিয়ার নির্দেশে! সরকারের পতন হয় যাবে। আসলে কি দেশ সেভাবে চলছে? পাঠক, বিচারের ভার আপনাদের ওপর। তারপর চলতি বছর বিএনপি ২৭ দফা ঘোষণা করল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। শেখ হাসিনাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। সংসদ ভেঙে দিতে হবে। তারা বিভাগীয় সমাবেশ শেষে ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় জমায়েতও করল। বলল, সেমিফাইনাল শেষ এবার হবে ফাইনাল খেলা! তো সেই খেলার ফলাফল কী? তাদের ঢাকা সমাবেশের পরদিন তারা ঢাকার প্রবেশমুখে অবরোধ কর্মসূচি দিল। সেই কর্মসূচি তো মুখ থুবড়ে পড়ল। কারণ বিএনপির নেতাকর্মীরাই হতাশ ছিল এই ধরনের হঠকারী কর্মসূচিতে। ফলাফল তথৈবচ।

এরপর এলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি কার্যকরের প্রশ্ন। তখন বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো নড়েচড়ে বসল। তারা সক্রিয় হলো। এক দফার আন্দোলন ঘোষণা করল। সরকারপ্রধানের পদত্যাগ চাইলেন নেতৃবৃন্দ। বললেন এই সরকারের পতন চান তারা। এবার মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা যাক। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে দিলেন। বললেন, সাংবিধানিক নিয়মেই নির্বাচন হবে নির্ধারিত সময়ে। প্রতিশ্রুতি দিলেন, নির্বাচন কমিশনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সর্বাত্মক সহায়তা করার। আর সরকারের পাহারাদার হিসেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও মাঠে নামল। ‘শান্তি ও উন্নয়ন’ সমাবেশ করে ঘোষণা দিল তারাও মাঠ ছাড়বে না। তারা এক দফাও দিল। শেখ হাসিনা তথা দলীয় সরকার থাকাকালীনই নির্বাচন হবে। এখন মাঠের রাজনীতি কার্যত উভয় দলের করতলে।

এবার আসি তৃতীয় পক্ষে। এই পক্ষের আবার দুটো ভাগ। একটি দেশীয়, অপরটি বৈশ্বিক। দেশীয় অংশটি পর্দার আড়ালে। এখনো দৃশ্যমান নয়। তবে বৈশ্বিক পক্ষটি জানান দিয়েছে তাদের অবস্থান। নেতৃত্ব রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সঙ্গী ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই পক্ষটি নিজ নিজ রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের বিবেচনায় ক্ষমতাসীন সরকারকে চাপ দিচ্ছে। তাদের দাবি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। তবে দৃশ্যমানভাবে তারা নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা বলছে না। বলতেও পারবে না। কারণ তা হবে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের শামিল। ফলে এক্ষেত্রে তারা ব্যাকফুটে। আর দেশীয় ভাগে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেপথ্য নেতৃত্বে দুটি বিশেষ পত্রিকা, কতিপয় এনজিওপ্রধান এবং দু-চারজন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মানবাধিকার, পরিবেশ ও পোশাক শিল্পে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে রাষ্ট্রীয় তথা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই হলো মোটামুটি চলমান ‘অক্টোবর রাজনীতি’র বাস্তব পরিস্থিতি। আসুন এবার দেখা যাক, এই পরিস্থিতি কতটা ‘বিপ্লব’ (?) উপযোগী। কতটা দফারফা হওয়ার পক্ষে ক্রিয়াশীল।

তৃতীয় পক্ষের দেশীয় অংশটির নেতৃত্বে থাকা ড. ইউনূস দুর্নীতি, অর্থ-আত্মসাৎ, অর্থ-পাচার এবং শ্রমিকের টাকা আত্মসাতের মামলায় নিজের ভাবমূর্তিতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। সাধারণের কাছে একে একে স্পষ্ট হচ্ছে জ্যোৎস্নার উল্টোপিঠের চিত্রটি। তাকে ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন এমন শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত শ্রেণিও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নথিপত্র সামাজিক মাধ্যমে দেখে নিজেরাই লজ্জিত হচ্ছেন। সুজনের ড. বদিউল আলমের ভাগ্নে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের গাড়িতে হামলার মামলায় ফেঁসে গিয়েছেন। ফলে এই পক্ষও এখন নিশ্চুপ।

বৈশ্বিক পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ভিসানীতি শুধু সরকারের জন্য নয়, বিরোধী দল বিএনপিকেও বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। তারা চাইলেও কোনো সহিংস আন্দোলনে যেতে পারছেন না। বা পারবেন না। ২০১৪ সালের মতো জ্বালাও-পোড়াও হলে ভিসানীতির আওতায় পড়ে যাবেন তারাও। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবেন না। আর যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে কোনো অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারছে না। কারণ তাদের আগামী শীত মৌসুমের পোশাক বানাচ্ছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা। ফলে এগুলো না হলে খোদ আমেরিকা পড়বে বেকায়দায়, নিজের দেশে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের কাছে। ফলে বাইডেন প্রশাসনকে সে পথ থেকেও পিছু হটতে হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থাও একই। ফলে নির্বাচনের আগে আর নতুন কোনো বৈশ্বিক চাপে পড়ছে না সরকার।

এবার আসি আবার বিএনপি প্রসঙ্গে। বিএনপির সামনে এখন নির্বাচন ছাড়া কোনো অপশন নেই। এমনিতেই দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে তারা কোনো চাপ বা আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েও কিছুই করতে পারেনি। খালেদা জিয়ার জন্য যতটুকু করেছে তা তার বাবার বাড়ির আত্মীয়-স্বজন এবং সরকার করেছে। এটা সাধারণের কাছে স্পষ্ট। আসলে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। এই বলা শুরু হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে। পেরিয়ে গেছে এক যুগ। সেই বলা এখনো থামেনি। এখন তারা দিবাস্বপ্ন দেখছেন। ভাবছেন, চলতি মাসেই কিছু একটা হবে! মজার বিষয় হচ্ছে,  কী হবে তা কেউই  নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। অথবা এমনও হতে পারে, তারা বলছেন না। এমন জল্পনা-কল্পনা করতে করতেই চলে এসেছে নির্বাচন। পরিস্থিতি বলছে, সবকিছু স্বাভাবিকই থাকবে। যা হবে, তা কেবলই কিছুদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা। তবে রাজনীতি নিয়ে এমন পরিস্থিতি, কেউ কোনোদিন আশা করেনি। সবাই চেয়েছিল, একটা সমাধান হবে। সে আশায় গুড়েবালি। এখন চেয়ে চেয়ে  দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নির্বাচন হবে এবং তা সুষ্ঠুভাবেই হবে। দেশ-বিদেশেও এটি সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর?

আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার মেয়াদ পূর্ণ করে ফেলেছে। সাংবিধানিকভাবে অক্টোবর মাসই তাদের শেষ মাস। এরপর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগ রুটিন কাজ করবে পরবর্তী তিন মাস। ফলে সরকার পতনের আন্দোলন পুরোপুরি ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

অতএব এই অক্টোবরে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হবে না। গণঅভ্যুত্থান, এসপার-ওসপার কিছুই হবে না। যা হবে বা হতে যাচ্ছে তা হলো সাংবিধানিক রাজনীতির জয়। তবে একটা কাজ হয়েছে, মানুষের মধ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতিসহ সরকারের কিছু পদক্ষেপে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার ফল আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিক বা না নিক তার প্রতিফলন ভোগ করবে লীগের প্রার্থীরা আগামী নির্বাচনে। লেখাটি শেষ করছি তরুণতম কবি (সম্ভবত এবারের প্রথম ভোটার) নাদিয়া জান্নাতের কবিতার দুটি পঙ্ক্তি দিয়েই কেন যে চিল অযথা নৈকট্যের আশায় তছনছ করতে থাকলো সোনায় ভরা আকাশ/দুধ সাদা দুপুর চকচক করছে তার বিরহে।

লেখক: বার্তা প্রধান বাংলা টিভি